আল্লাহ–তাআলা তাঁর প্রিয় বান্দাদের জন্য ইবাদত ও ক্ষমা প্রার্থনার অসংখ্য পথ খুলে রেখেছেন। বান্দাদের মধ্যে উৎসাহ, উদ্দীপনা ও প্রতিযোগিতার মনোভাব সৃষ্টির জন্য তিনি নির্দিষ্ট কিছু বিশেষ সময় ও সুযোগ দান করেছেন। এর মাধ্যমে বান্দারা অল্প সময়ে ও পরিশ্রমে অধিক সওয়াব অর্জন করতে পারে।
রমজান মাস যেমন ইবাদতের মাস, লাইলাতুল কদর যেমন হাজার মাসের চেয়ে উত্তম রাত; তেমনি দিনের মধ্যে কিছু দিনকে আল্লাহ শ্রেষ্ঠত্বের মর্যাদা দিয়েছেন। রমজান ব্যতীত বছরের সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ দিনগুলোর অন্যতম হলো জিলহজ মাসের প্রথম ১০ দিন।
যদিও এই দিনগুলো অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ, তবুও রমজানের মতো এতে শয়তান শৃঙ্খলাবদ্ধ থাকে না। ফলে এই সময়ে ইবাদতের প্রতিযোগিতা তুলনামূলক কঠিন হয়। কিন্তু যে ব্যক্তি আন্তরিকভাবে ইবাদতে অগ্রসর হবে, সেই সফল হতে পারবে।
কোরআনে জিলহজের প্রথম ১০ দিনের গুরুত্ব
সম্মানিত জিলহজ মাসের প্রথম ১০ দিনের গুরুত্ব এত বেশি যে আল্লাহ নিজে পবিত্র কোরআনে এই দিনগুলোর শপথ করেছেন। তিনি বলেন—‘ওয়াল ফজর, ওয়াল লায়ালিন আশর।’ অর্থ: ‘কসম ফজরের, এবং কসম ১০ রাতের।’ (সুরা ফাজ্র, আয়াত: ১-২)
ইবনে কাসির (রহ.)-এর মতে, ‘১০ রাত’ বলতে জিলহজ মাসের প্রথম ১০ রাতকে বোঝানো হয়েছে।
জিলহজের প্রথম ১০ দিনের ইবাদত আল্লাহর নিকট অন্য দিনের ইবাদতের তুলনায় বেশি প্রিয়। প্রত্যেক দিনের রোজা এক বছরের রোজার ন্যায় আর প্রত্যেক রাতের ইবাদত লাইলাতুল কদরের ইবাদতের ন্যায়।সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ৭৫৮
হাদিসে জিলহজের প্রথম ১০ দিনের মর্যাদা
রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘জিলহজের প্রথম ১০ দিনের আমল আল্লাহর কাছে অন্য যেকোনো দিনের আমলের চেয়ে অধিক প্রিয়।’ সাহাবিরা জিজ্ঞেস করলেন, ‘জিহাদও কি নয়?’ তিনি বললেন, ‘জিহাদও নয়, তবে সেই ব্যক্তি ব্যতীত যে জান-মাল নিয়ে বের হলো এবং আর ফিরে আসেনি।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৯৬৯)
তিনি আরও বলেছেন, ‘জিলহজের প্রথম ১০ দিনের ইবাদত আল্লাহর নিকট অন্য দিনের ইবাদতের তুলনায় বেশি প্রিয়। প্রত্যেক দিনের রোজা এক বছরের রোজার ন্যায় আর প্রত্যেক রাতের ইবাদত লাইলাতুল কদরের ইবাদতের ন্যায়।’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ৭৫৮)
প্রস্তুতি ও স্বাগত জানানো
ইবাদতের এই বিশেষ মৌসুমকে স্বাগত জানানোর জন্য আমাদের কিছু প্রস্তুতি নেওয়া প্রয়োজন:
১. আত্মশুদ্ধি: জিলহজ মাসকে স্বাগত জানানোর প্রথম প্রস্তুতি হলো আত্মশুদ্ধি। ইবনুল কাইয়ুম (রহ.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি নিজেকে ভালোভাবে চিনতে পেরেছে, সে অন্যের দোষ না খুঁজে নিজের সংশোধনে ব্যস্ত হয়ে পড়ে।’
তাই নফসকে নিয়ন্ত্রণ করে সমস্ত কবিরা ও সগিরা পাপ থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখা জরুরি। মনে রাখতে হবে, বড় নেক আমল করতে না পারলেও অন্তত পাপ থেকে যেন বেঁচে থাকি।
ময়লাযুক্ত গ্লাসে পরিষ্কার পানি রাখলে যেমন তা খাওয়ার অযোগ্য হয়ে যায়, তেমনি তওবা ছাড়া পাপযুক্ত অন্তরে নেক আমল কতটা ফলপ্রসূ হবে, তা ভাববার বিষয়।
২. সময় সচেতনতা: সময় আল্লাহর দেওয়া বড় নেয়ামত। রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘দুটি নেয়ামত রয়েছে, যার ব্যাপারে অধিকাংশ মানুষ ধোকায় আছে: সুস্থতা ও অবসর।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬৪২২)
অপ্রয়োজনীয় অনলাইন ব্যবহার বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সময় নষ্ট করা ইবাদতের পথে বড় বাধা হতে পারে। আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) বলতেন, ‘আমি ওই দিনের চেয়ে অন্য কোনো বস্তুর ওপর অধিক অনুতপ্ত হই না, যে দিনটি আমার জীবন থেকে হ্রাস পেল অথচ তাতে কোনো নেক আমল হলো না।’
৩. তওবা: তওবা মানে হলো ফিরে আসা। ভুল বুঝতে পেরে অনুতপ্ত হয়ে পাপ আর না করার সংকল্প করাই হলো তওবা। জিলহজের প্রথম ১০ দিন তওবা কবুলের বিশেষ সময়। আন্তরিক তওবার তিনটি শর্ত রয়েছে:
পাপ সম্পূর্ণভাবে ছেড়ে দেওয়া।
পাপের জন্য আন্তরিক অনুশোচনা করা।
ভবিষ্যতে ওই পাপ আর না করার দৃঢ় সংকল্প করা।
ময়লাযুক্ত গ্লাসে পরিষ্কার পানি রাখলে যেমন তা খাওয়ার অযোগ্য হয়ে যায়, তেমনি তওবা ছাড়া পাপযুক্ত অন্তরে নেক আমল কতটা ফলপ্রসূ হবে, তা ভাববার বিষয়। আল্লাহ বলেন, ‘যে তওবা করে, ইমান আনে এবং সৎকর্ম করে, আশা করা যায় সে সফল হবে।’ (সুরা কাসাস, আয়াত: ৬৭)
শেষ কথা
জিলহজ মাসের প্রথম ১০ দিন অত্যন্ত বরকতময় সময়। এই দিনগুলোতে তওবা, আত্মশুদ্ধি ও নেক আমলের মাধ্যমে একজন মুমিন নিজের আখেরাতকে সুন্দর করতে পারেন। আল্লাহ আমাদের সবাইকে এই বিশেষ দিনগুলো যথাযথভাবে কাজে লাগানোর তাওফিক দিন।
ইসমত আরা: শিক্ষক ও লেখক