সুরা মুজ্জাম্মিল: আল্লাহ যেভাবে নবীজিকে নেতৃত্বের শিক্ষা দিয়েছেন

ছবি: পেক্সেলস

সফল মানুষদের দৈনন্দিন রুটিন নিয়ে আজকাল কত আলোচনা হয়। কারও সফলতার মূলমন্ত্র রাতে দ্রুত ঘুম। কারও নিয়মিত জার্নাল লেখা। কারও বড় বড় স্বপ্ন দেখা। কিন্তু ইতিহাসের সবচেয়ে প্রভাবশালী মানুষটির সফল জীবনের রহস্য কী ছিল, তা কি কখনো ভেবে দেখেছেন?

নবুয়তের শুরুর দিনগুলোতে নবীজির কাছে আল্লাহর পক্ষ থেকে যে নির্দেশ বারবার আসত, তা ছিল রাতের ইবাদত বা কিয়ামুল লাইল।

যিনি সারা দিন মানুষের জন্য কাজ করেন, ইসলামের দাওয়াত দেন, যুদ্ধে নেতৃত্ব দেন, অন্য সব ইবাদত বাদ দিয়ে তাঁকে কেন রাতের ইবাদত করতে গুরুত্বের সঙ্গে বলা হলো? কারণ, যে শক্তি দিয়ে দিনের বিশাল দায়িত্ব পালন করতে হয়, সেই শক্তি তৈরি হয় রাতের ইবাদতে।

কোরআনের নির্দেশনা

রাতে দাঁড়িয়ে ইবাদত করাই ছিল আল্লাহর প্রথম নির্দেশগুলোর একটি। আল্লাহ–তাআলা বলেন, ‘হে বস্ত্রাবৃত, রাতে দাঁড়াও, তবে অল্প সময় বাদে। অর্ধরাত অথবা তার চেয়ে একটু কম অথবা তার চেয়ে একটু বেশি। আর কোরআন পাঠ করো ধীরে ধীরে স্পষ্টভাবে।’ (সুরা মুজ্জাম্মিল, আয়াত: ১-৪)

এই আয়াতে আল্লাহ নবীজিকে ডেকেছেন মুজ্জাম্মিল বলে; যার অর্থ যিনি কাপড়ে নিজেকে জড়িয়ে নেন। ওহির প্রথম অভিজ্ঞতার পর মহানবী (সা.) যখন চাদর মুড়ি দিয়ে ঘুমিয়ে ছিলেন, ঠিক সেই মুহূর্তে আল্লাহ–তাআলা তাঁকে ঘুম থেকে ডেকে নামাজে দাঁড়াতে বললেন।

লক্ষণীয় বিষয় হলো, আল্লাহ তাঁকে প্রথমেই জনসমাবেশে ভাষণ দিতে বলেননি, যুদ্ধে যেতে বলেননি, রাষ্ট্র পরিচালনার নির্দেশও দেননি। শুধু বলেছেন, রাতের ইবাদতে দাঁড়াও।

এরপর আল্লাহ বলেন, ‘আর কোরআন ধীরে ধীরে, স্পষ্টভাবে পাঠ করো।’ এখানে তারতিল শব্দটি শুধু সুন্দর সুরে পড়ার কথা বলে না, বরং থেমে থেমে, অর্থ উপলব্ধি করে, হৃদয়ে অনুধাবন করে পড়ার শিক্ষা দেয়।

আরও পড়ুন

এরপর আল্লাহ সেই কারণটি জানিয়ে দেন, কেন রাতের সময়কে বেছে নেওয়া হয়েছে। ‘নিশ্চয়ই রাতের ইবাদত মনকে অধিক দৃঢ় করে এবং কথা ও উপলব্ধিকে অধিক সুদৃঢ় করে।’

মুফাসসিররা বলেন, দিনের বেলায় নানা ব্যস্ততায় মানুষের মন বিক্ষিপ্ত থাকে। কিন্তু রাতের নীরবতায় সেই মন একাগ্র হয়। তখন দোয়া গভীর হয়, পাঠ হৃদয়ে পৌঁছে যায়, আত্মা সহজে আল্লাহর দিকে ফিরে আসে।

আধুনিক ভাষায় বললে, দিনের অসংখ্য নোটিফিকেশন, ব্যস্ততা আর আলোচনার ভিড়ে যে মন ক্লান্ত হয়ে পড়ে, রাত তাকে আবার জাগিয়ে তোলে।

হাদিসে রাতের নামাজ

মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘ফরজ নামাজের পর সর্বোত্তম নামাজ হলো রাতের নামাজ।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১১৬৩)

অন্য এক হাদিসে নবীজি (সা.) বলেন, ‘আমাদের প্রতিপালক প্রতি রাতের শেষ তৃতীয়াংশে নিকটতম আসমানে অবতরণ করেন এবং বলেন, কে আমাকে ডাকবে, আমি তার ডাকে সাড়া দেব? কে আমার কাছে চাইবে, আমি তাকে দান করব? কে আমার কাছে ক্ষমা চাইবে, আমি তাকে ক্ষমা করব?’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১১৪৫)

এ এমন এক আমন্ত্রণ, যা পৃথিবীর কোনো রাজা তাঁর প্রজাদের কখনো দেননি।

সুরার শেষে স্বস্তির বার্তা

শেষের দিকে বলেন, ‘নিশ্চয়ই দিনের বেলায় তোমার রয়েছে দীর্ঘ ব্যস্ততা।’ দিন হলো কাজের জন্য, আর রাত হলো আত্মার পুনর্গঠনের জন্য। যিনি রাতের এই শক্তি অর্জন করতে পারেন, দিনের ঝড় তাঁকে সহজে ভেঙে দিতে পারে না।

এরপর আসে জীবনের আরেকটা মৌলিক শিক্ষা। আল্লাহ–তাআলা বলেন, ‘তোমার প্রতিপালকের নাম স্মরণ করো এবং সম্পূর্ণভাবে তাঁরই দিকে মনোনিবেশ করো।’

এর অর্থ সংসার ছেড়ে দেওয়া নয়, বরং সব কাজের মাঝেও আল্লাহকে স্মরণ রাখা। যখন আল্লাহকে কেন্দ্র করে জীবন চলতে থাকে, জাগতিক চাপ ও ক্লান্তি কমে যায়।

আরও পড়ুন

তবে সুরা মুজ্জাম্মিলের শেষাংশ আমাদের জন্য স্বস্তির বার্তাও নিয়ে আসে। শুরুতে যে দীর্ঘ রাতের ইবাদতের নির্দেশ ছিল, পরে আল্লাহ বান্দাদের সামর্থ্যের কথা বিবেচনা করে বলেন, ‘অতএব কোরআন থেকে যতটুকু তোমাদের জন্য সহজ, ততটুকুই পড়ো।’

এটা আল্লাহর অসীম দয়ার প্রকাশ। তিনি কষ্ট দিতে চান না, তিনি চান ধারাবাহিকতা। তাই নবীজির মতো দীর্ঘ সময় নিয়ে নামাজে পাঠ করা সম্ভব না হলে অল্প সময়ও যথেষ্ট, যদি তা আন্তরিক হয়।

একই আয়াতে আল্লাহ স্মরণ করিয়ে দেন, ‘তোমরা নামাজ আদায় করো এবং জাকাত প্রদান করো।’ অর্থাৎ নফল ইবাদত কম করলেও ফরজ নামাজ, জাকাত এবং অন্যান্য মৌলিক দায়িত্বে কোনো অবহেলা চলবে না।

শেষে আল্লাহ এমন একটা প্রতিশ্রুতি দেন, যা প্রতিটি মুমিনের জন্য আশার আলো, ‘তোমরা নিজেদের জন্য যে কল্যাণই আগে পাঠাবে, তা আল্লাহর কাছে আরও উত্তম ও আরও বড় প্রতিদান হিসেবে পাবে।’

ফজরের আধা ঘণ্টা আগে উঠে মাত্র দুই রাকাত নামাজ, কয়েকটি আয়াত পাঠ, কিছু ইস্তিগফার, আর মন খুলে আল্লাহর সঙ্গে কিছু কথা বিনিময়। কিছু আবেদন, কিছু নিবেদন।

আমরা অনেকেই মনে করি, রাতের কিছু ঘুম কমে গেলে হয়তো শরীরের ক্ষতি হবে। অথচ কোরআন শেখায়, আল্লাহর জন্য যে সময় ব্যয় করা হয়, তা কখনো হারিয়ে যায় না। তা দুনিয়ায় প্রশান্তি হয়ে ফিরে আসে, আর পরকালে অসীম পুরস্কার হয়ে অপেক্ষা করে।

আজ রাত থেকেই শুরু করুন

আল্লাহর নেতৃত্বের আলোয় আলোকিত হতে চাইলে কিয়ামুল লাইল, অর্থাৎ রাতের নামাজ বা তাহাজ্জুদের নামাজ আজ রাত থেকেই শুরু করতে পারেন। পুরো রাত নয়। দীর্ঘ তাহাজ্জুদও নয়।

ফজরের আধা ঘণ্টা আগে উঠে মাত্র দুই রাকাত নামাজ, কয়েকটি আয়াত পাঠ, কিছু ইস্তিগফার, আর মন খুলে আল্লাহর সঙ্গে কিছু কথা বিনিময়। কিছু আবেদন, কিছু নিবেদন।

নিশ্চয় সেই কয়েক মিনিটই আপনার জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান বিনিয়োগ হয়ে থাকবে। যেদিন পৃথিবীর সব হিসাব শেষ হবে, সেদিন এই সামান্য বিনিয়োগ আপনার জন্য অকল্পনীয় লাভ ও আনন্দ বয়ে আনবে।

  • মুহাম্মাদ মুহসিন মাশকুর : খণ্ডকালীন শিক্ষক, আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

আরও পড়ুন