দুনিয়ায় থেকেও যেভাবে পরকালের পথিক হব

ছবি: পেক্সেলস

মানুষের পার্থিব জীবন যেন দুটি প্রবল স্রোতের মোহনায় দাঁড়িয়ে থাকা এক তরি। একদিকে জাগতিক জীবনের তীব্র আকর্ষণ—জীবিকা, পরিবার, শিক্ষা, পেশাগত সাফল্য ও ভবিষ্যৎ বিনির্মাণের অন্তহীন ব্যস্ততা।

অন্যদিকে পরকালের অবিরাম ডাক—ইবাদত, আত্মশুদ্ধি, নৈতিক দায়বদ্ধতা ও অনন্ত জীবনের পাথেয় সংগ্রহ। প্রশ্ন হলো, এই দুই বিপরীতমুখী স্রোতের টানাপোড়েনে একজন মুমিন কীভাবে ভারসাম্য বজায় রেখে নিজের সঠিক পথটি চিনে নেবে?

ইসলামে ভারসাম্যের দর্শন

ইসলাম বৈরাগ্যবাদকে সমর্থন করে না; আবার পার্থিব মোহে অন্ধ হয়ে পরকালকে বিসর্জন দিতেও নিষেধ করে। বরং ইসলাম শেখায় দুনিয়াকে পরকালের পাথেয় অর্জনের মাধ্যম বা ‘শস্যক্ষেত্র’ হিসেবে গ্রহণ করতে। এখানে মানুষ যেমন বীজ বপন করবে, অনন্ত জীবনে তেমনই ফসল ঘরে তুলবে।

পবিত্র কোরআনে আল্লাহ–তাআলা বলেছেন, ‘আর আল্লাহ তোমাকে যা দিয়েছেন, তা দিয়ে পরকালের আবাস অনুসন্ধান করো এবং দুনিয়া থেকে তোমার অংশ ভুলে যেয়ো না।’ (সুরা কাসাস, আয়াত: ৭৭)

পার্থিব জীবনের স্বরূপ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে ইমাম গাজালি লিখেছেন, ‘দুনিয়া পরকালের জন্য একটি মনজিল বা সরাইখানা মাত্র; শরীর একটি বাহন এবং মানুষের যাবতীয় পার্থিব কাজকর্ম সেই বাহনের রক্ষণাবেক্ষণের উপকরণ। তাই বাহন ও পথের পরিচর্যা করতে হবে শুধু মূল গন্তব্যে নির্বিঘ্নে পৌঁছার তাগিদে।’ (আল-গাজালি, ইহয়াউ উলুমিদ্দিন, ৩/২১৪, দারুল মা‘রিফাহ, বৈরুত, ১৯৮২)

পরকালের চিন্তা মানে দুনিয়া ত্যাগ নয়

সংসার বা সমাজজীবন থেকে পলায়নের নাম পরকালমুখী জীবন নয়। হালাল সম্পদ অর্জনকে পরিহার করা কিংবা জীবনের স্বাভাবিক বিকাশ ও উন্নতি বন্ধ করে দেওয়া কোনো ধার্মিকতা নয়। বরং পরকালের জবাবদিহির বোধ মানুষের জাগতিক জীবনকে আরও বেশি দায়িত্বশীল, মার্জিত ও অর্থবহ করে তোলে।

যে মানুষ বিশ্বাস করে যে তার প্রতিটি কাজের পুঙ্খানুপুঙ্খ হিসাব নেওয়া হবে, সে জনচক্ষুর অন্তরালে কিংবা নির্জনেও কোনো অন্যায় বা দুর্নীতি করতে পারে না। মানুষের চোখকে ফাঁকি দেওয়া গেলেও সর্বজ্ঞ আল্লাহর দৃষ্টি এড়িয়ে কিছু করা অসম্ভব।

পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, ‘যে অণু পরিমাণ সৎ কাজ করবে, সে তা দেখতে পাবে। আর যে অণু পরিমাণ অসৎ কাজ করবে, সে–ও তা দেখতে পাবে।’ (সুরা জিলজাল, আয়াত: ৭–৮)

আরও পড়ুন

কর্মবিমুখতা নয়, দায়িত্বশীল উদ্যোগ

কখনো কখনো ধর্মভিরুতাকে ভুলভাবে উপস্থাপন করে মনে করা হয়, জাগতিক কর্মকাণ্ড থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়াই পরম পুণ্য। অথচ পবিত্র কোরআনের স্পষ্ট নির্দেশ হলো ইবাদত শেষ করেই জীবিকার সন্ধানে তৎপর হওয়া।

আল্লাহ–তাআলা নির্দেশ দেন, ‘নামাজ সমাপ্ত হলে তোমরা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ো এবং আল্লাহর অনুগ্রহ অন্বেষণ করো।’ (সুরা জুমুআ, আয়াত: ১০)

সাহাবিদের জীবন পর্যালোচনা করলে এর উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্পষ্ট হয়। তাঁরা একদিকে মসজিদে নিবিষ্টচিত্তে ইবাদত ও জ্ঞানচর্চায় রত ছিলেন, অন্যদিকে বাজারে গিয়ে নিষ্ঠার সঙ্গে ব্যবসা করেছেন, কৃষিকাজ করেছেন, সমাজ ও রাষ্ট্রের গুরু দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়েছেন।

তাঁদের দৃষ্টিতে দুনিয়া ও পরকাল পরস্পরবিরোধী ছিল না; বরং সঠিক নিয়ত ও সৎ পন্থা অবলম্বন করে যেকোনো কল্যাণকর পার্থিব কর্মকেই তাঁরা পরকালের প্রস্তুতির অংশ বানিয়ে নিয়েছিলেন।

সম্পদ থাকবে মুঠোয়, অন্তরে নয়

সম্পদ থাকা কোনো অপরাধ নয়; কিন্তু অসদুপায়ে বা হারাম পথে তা উপার্জন করা মারাত্মক অপরাধ। ব্যবসায় নিমগ্ন থাকা দোষের নয়; কিন্তু ব্যবসার মোহে পড়ে নামাজ কিংবা অন্যান্য ফরজ দায়িত্ব ভুলে যাওয়া অন্যায়।

পরিবারের সচ্ছলতা ও ভবিষ্যৎ সুরক্ষার চেষ্টা প্রশংসনীয়; কিন্তু তাদের জন্য হারাম উপার্জনে লিপ্ত হয়ে নিজের পরকাল বিনষ্ট করা আত্মঘাতী।

একজন সচেতন মুমিনের প্রাত্যহিক জীবনের স্বাভাবিক অভ্যাস, খাদ্য গ্রহণ, বিশ্রাম ও জীবিকার অনুসন্ধানও তার সৎ সংকল্পের কারণে পরকালের সাওয়াবযোগ্য ইবাদতে পরিণত হয়।
ইবনুল কাইয়িম জাওজিয়্যা (রহ.)

আল্লাহ–তাআলা সতর্ক করে বলেন, ‘হে মুমিনগণ, তোমাদের ধনসম্পদ ও সন্তানসন্ততি যেন তোমাদের আল্লাহর স্মরণ থেকে উদাসীন না করে।’ (সুরা মুনাফিকুন, আয়াত: ৯)

অতএব, দুনিয়ার সঙ্গে মুমিনের সম্পর্ক হবে একজন সচেতন পথিকের মতো। রাসুলুল্লাহ (সা.) নির্দেশ দিয়েছেন, ‘দুনিয়ায় এমনভাবে জীবন যাপন করো, যেন তুমি একজন অপরিচিত প্রবাসী অথবা পথিক।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬৪১৬)

এই হাদিসের ব্যাখ্যায় ইবনে রজব আল-হাম্বলি উল্লেখ করেছেন, একজন পথিক যেমন চলার পথে সরাইখানাকে নিজের চিরস্থায়ী নিবাস মনে করে সেখানে স্থায়ীভাবে ঘর বাঁধার মোহে পড়ে থাকে না, বরং গন্তব্যে পৌঁছার জন্য প্রয়োজনীয় পাথেয় নিয়েই সন্তুষ্ট থাকে; ঠিক তেমনি মুমিনের অন্তরে থাকবে তার মূল আবাস—জান্নাতের গভীর টান। (আল-হাম্বলি, জামিউল উলুম ওয়াল হিকাম, ২/৭৭-৩৭৮, মুআসসাসাতুর রিসালাহ, বৈরুত, ২০০১)

হালাল উপার্জন পরকালের পাথেয়

একজন মানুষ সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত হাড়ভাঙা খাটুনি খাটেন—চাকরি, ব্যবসা, পড়াশোনা কিংবা শ্রমঘন কাজ করেন। বাহ্যত এগুলো নিতান্তই জাগতিক কাজকর্ম মনে হলেও নিয়তের বিশুদ্ধতা ও উপার্জনের বৈধতা এগুলোকে সর্বোত্তম ইবাদতে রূপান্তরিত করে।

পরিবারের ভরণপোষণ, সন্তানদের সুশিক্ষা, ঋণমুক্ত থাকা এবং আত্মসম্মান নিয়ে বেঁচে থাকার তাগিদে হালাল উপার্জনের পেছনে ব্যয়িত প্রতিটি ঘামের ফোঁটাও নেক আমল হিসেবে গণ্য হয়।

ইসলামে দায়িত্ব বণ্টনের ক্ষেত্রে ভারসাম্য রক্ষা করার সুনির্দিষ্ট তাগিদ রয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই তোমার ওপর তোমার রবের হক রয়েছে, তোমার ওপর তোমার নিজের দেহের হক রয়েছে এবং তোমার ওপর তোমার পরিবারেরও হক রয়েছে। অতএব, প্রত্যেক হকদারকে তার ন্যায্য অধিকার আদায় করে দাও।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১৯৬৮)

আরও পড়ুন

ভারসাম্য মানে ভাগ নয়, যথাযথ মূল্যায়ন

দুনিয়া ও পরকালের ভারসাম্য বলতে অনেকে সরলভাবে মনে করেন দিন বা রাতের অর্ধেক সময় দুনিয়ার আর বাকি অর্ধেক সময় ধর্মের। ইসলামের ভারসাম্য কোনো যান্ত্রিক সমীকরণ নয়; বরং ভারসাম্য হলো প্রতিটি অধিকারকে তার সঠিক স্থান দেওয়া।

কর্মক্ষেত্রে সততা বজায় রাখা, নামাজের সময় কর্মবিরতি নিয়ে রবের সামনে মস্তক অবনত করা, পরিবারের প্রয়োজন পূরণে বৈধ পথ অবলম্বন করা, অবসরে অলসতায় মত্ত না হয়ে ফলপ্রসূ কাজে সময় লাগানো—এসবই হলো ভারসাম্যের সঠিক প্রকাশ।

ইমাম ইবনুল কাইয়িম এ প্রসঙ্গে চমৎকার মন্তব্য করেছেন, একজন সচেতন মুমিনের প্রাত্যহিক জীবনের স্বাভাবিক অভ্যাস, খাদ্য গ্রহণ, বিশ্রাম ও জীবিকার অনুসন্ধানও তার সৎ সংকল্পের কারণে পরকালের সাওয়াবযোগ্য ইবাদতে পরিণত হয়। অসচেতন মানুষের নিছক উপরিউক্ত ইবাদতও লোকদেখানো মনোভাব থাকলে অর্থহীন হয়ে পড়ে। (ইবনুল কাইয়িম, মাদারিজুস সালিকিন, ১/১০৬, দারুল কিতাবিল আরাবি, বৈরুত, ১৯৯৬)

পার্থিব সাফল্য কখন অর্থবহ

বিপুল বিত্তবৈভব, অট্টালিকা, সামাজিক খ্যাতি বা উচ্চ পদমর্যাদা—পার্থিব মাপকাঠিতে এগুলো হয়তো মানুষের সাফল্যের প্রতীক। কিন্তু একজন মুমিনের ভাবনার পরিসর এখানেই থেমে থাকে না। সে সর্বদা আত্মজিজ্ঞাসায় লিপ্ত থাকে—এই সম্পদ কোন পথে অর্জিত হলো এবং কোন খাতে ব্যয়িত হচ্ছে?

ক্ষমতা ও পদের মাধ্যমে মানুষের কতটা কল্যাণ সাধিত হলো? অর্জিত জ্ঞান মানবতার কতটুকু উপকারে এল? কারণ, পার্থিব ভোগসামগ্রী নিতান্তই ক্ষণস্থায়ী, অথচ পরকালের জীবন অনন্ত ও চিরন্তন।

আল্লাহ–তাআলা বলেন, ‘তোমরা কি পরকালের পরিবর্তে দুনিয়ার জীবন নিয়ে সন্তুষ্ট হয়ে গেলে? অথচ পরকালের তুলনায় দুনিয়ার জীবনের ভোগসামগ্রী তো অতি সামান্য!’ (সুরা তাওবা, আয়াত: ৩৮)

দুনিয়া আমাদের হাতে, আর পরকাল আমাদের সামনে। হাতে যা রয়েছে তাকে সদ্ব্যবহার করতে হবে আর সামনে যে অন্তহীন মঞ্জিল অপেক্ষা করছে তার প্রস্তুতি নিতে হবে।

পরকালের লক্ষ্যেই জীবনের পূর্ণতা

পরকালের গভীর বোধ মানুষকে পৃথিবীবিমুখ বা কর্মহীন করে না; বরং সমাজকে সুন্দর ও নিরাপদ করার নৈতিক প্রেরণা জোগায়। যে মানুষ পরকালের প্রতি আস্থাশীল, সে কখনো অন্যের অধিকার খর্ব করে না, আমানতের খেয়ানত করে না, ঘুষ বা দুর্নীতির আশ্রয় নেয় না এবং দুর্বলকে শোষণ করে না।

সে জানে, দুনিয়ার বিচারালয়ের চোখ ফাঁকি দেওয়া সম্ভব হলেও মহাবিচারের দিবসে আল্লাহর ন্যায়দণ্ড থেকে নিষ্কৃতি পাওয়ার কোনো সুযোগ নেই।

প্রকৃতপক্ষে দুনিয়া ও পরকাল পরস্পরবিরোধী ভিন্ন কোনো পথ নয়। একজন মুমিনের পথ একটাই—আল্লাহর সন্তুষ্টির পথ। সেই পথের একটি অধ্যায়ে আছে নামাজ, রোজা, কোরআন পাঠ ও জিকির; অন্য অধ্যায়ে আছে হালাল জীবিকা, পরিবার পরিচালনা, জ্ঞানার্জন, মানবসেবা ও সামাজিক দায়বদ্ধতা। কাজের ক্ষেত্র আলাদা হলেও চূড়ান্ত লক্ষ্য অভিন্ন।

পবিত্র কোরআনে সেই সার্বিক সমর্পণের ঘোষণাই এসেছে, ‘বলুন, নিশ্চয়ই আমার নামাজ, আমার কোরবানি, আমার জীবন ও আমার মৃত্যু—সবই আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের জন্য।’ (সুরা আনআম, আয়াত: ১৬২)

দুনিয়া আমাদের হাতে, আর পরকাল আমাদের সামনে। হাতে যা রয়েছে তাকে সদ্ব্যবহার করতে হবে আর সামনে যে অন্তহীন মঞ্জিল অপেক্ষা করছে তার প্রস্তুতি নিতে হবে। জীবন একটিই, তাই প্রতিটি দিন নতুন করে পাথেয় সংগ্রহের এক অপার সুযোগ।

দুনিয়ার এই বহুমাত্রিক ভিড়ের মধ্যেই আমাদের হয়ে উঠতে হবে পরকালের সচেতন পথিক। দুনিয়া ছেড়ে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া প্রকৃত সফলতা নয়; বরং জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে দায়িত্ব পালন করে পরকালকে চূড়ান্ত লক্ষ্য হিসেবে ধারণ করাই মুমিনের সার্থকতা।

  • মাহমুদ হাসান ফাহিম: শিক্ষক, বাইতুল আকরাম মসজিদ ও মাদ্রাসা কমপ্লেক্স, গাজীপুর

আরও পড়ুন