পবিত্র হজ পালনের উদ্দেশ্যে যাঁরা মক্কা ও মদিনার পুণ্যভূমিতে গমন করেন, তাঁদের কাছে দোয়া চাওয়া এবং সেই দোয়ার আশায় তাঁদের হজের খরচে আর্থিক সহায়তা বা উপহার প্রদান করা সমাজের একটি প্রচলিত চিত্র।
শরিয়তের আলোকে এই সহযোগিতার ধরণ ও উদ্দেশ্য নিয়ে ফকিহদের সুনির্দিষ্ট ব্যাখ্যা রয়েছে।
দোয়া চাওয়ার বৈধতা
কারো কাছে দোয়া চাওয়া একটি নেক কাজ, যা মহানবী (সা.) এবং তাঁর সাহাবিদের আমল দ্বারা প্রমাণিত। হজের সময় আরাফাতের ময়দান বা কাবা তাওয়াফের মতো পবিত্র স্থানে দোয়া কবুলের সম্ভাবনা বেশি থাকে।
কেউ যদি কোনো হাজিকে হজের খরচে সহায়তা করার জন্য অর্থ প্রদান করে এবং বিনিময়ে তার কাছে দোয়া চায়, তবে শরিয়তের দৃষ্টিতে এতে কোনো বাধা নেই।
হাদিয়া ও সদকা হিসেবে সহায়তা
কোনো হাজিকে অর্থ প্রদানের দুটি দিক হতে পারে।
প্রথমত, একে ‘হাদিয়া’ বা উপহার হিসেবে প্রদান করা। মহানবী (সা.) উপহার বিনিময় করতে উৎসাহিত করেছেন এবং বলেছেন, “তোমরা একে অপরকে উপহার দাও, তবে তোমাদের মধ্যে মহব্বত বা ভালোবাসা বৃদ্ধি পাবে।” (আল-আদাবুল মুফরাদ, হাদিস: ৫৯৪)
দ্বিতীয়ত, যদি হাজি অভাবগ্রস্ত হন, তবে তাকে ‘সদকা’ বা দান হিসেবেও সহায়তা করা যেতে পারে। উভয় ক্ষেত্রেই সাহায্যের পেছনে পবিত্র স্থানে আল্লাহর কাছে দোয়া চাওয়ার নিহিত উদ্দেশ্যটি জায়েজ।
হজের খরচ ও দোয়ার সম্পর্ক
ইসলামি ফিকহের একটি প্রতিষ্ঠিত নিয়ম হলো ‘প্রতিনিধিত্ব’ বা বদলি হজ। যদি কোনো ব্যক্তি অন্য কারো পক্ষ থেকে হজের যাবতীয় খরচ বহন করে তাকে হজে পাঠাতে পারে এবং সেই হাজি তার পক্ষ থেকে দোয়া করতে পারে, তবে হজের আংশিক খরচ বহন করার ক্ষেত্রেও একই নীতি প্রযোজ্য হবে।
অর্থাৎ, সামান্য সহযোগিতার বিনিময়ে পুণ্যভূমির দোয়া প্রাপ্তির আশা করা কোনোভাবেই শরিয়ত পরিপন্থী নয়। আল্লাহ–তাআলা কোনো হাজির আন্তরিক দোয়ার উসিলায় দাতার মনের বাসনা কবুল করতেই পারেন।
নৈতিক দায়বদ্ধতা
তবে এ ক্ষেত্রে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি যে অর্থ প্রদানটি যেন কোনোভাবেই ‘চুক্তিভিত্তিক ব্যবসা’ বা ‘পারিশ্রমিক’ হিসেবে না হয়। দোয়া একটি ইবাদত, যা টাকার বিনিময়ে কেনা যায় না।
বরং এটি হবে একজন মুসলিমের প্রতি অন্য মুসলিমের হৃদ্যতা ও সহযোগিতার বহিঃপ্রকাশ।
দাতা তার সামর্থ্য অনুযায়ী হাজিকে সম্মান করবেন বা খরচ লাঘবে সহায়তা করবেন এবং হাজি তার কৃতজ্ঞতাস্বরূপ ওই দাতার জন্য পবিত্র স্থানগুলোতে আল্লাহর দরবারে রোনাজারি করবেন।
সারকথা, দোয়া হলো ইবাদতের মগজ। মুমিন তার নিজের জন্য যেমন আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করে, তেমনি পুণ্যবান ও নেককার মানুষদের কাছেও দোয়ার দরখাস্ত করে থাকে।
হাজিকে আর্থিক সহায়তা করা কেবল দোয়ার প্রত্যাশাই নয়, বরং এটি একটি বড় ধরনের সমাজসেবা ও ধর্মীয় ভ্রাতৃত্বের নিদর্শন।