দোয়ার ফল কখনো বৃথা যায় না

দোয়ার মাধ্যমে বান্দা তার মনের সকল বোঝা আল্লাহর কাছে সঁপে দেয়ছবি: এএফপি

মানুষের জীবন সীমাবদ্ধতায় ঘেরা। এই সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে পরম সত্তার সঙ্গে সংযোগ স্থাপনের নামই দোয়া। দোয়া কেবল কিছু শব্দের সমষ্টি নয়, বরং এটি বান্দার পক্ষ থেকে তার মহান স্রষ্টার প্রতি গভীর কাকুতি-মিনতি ও আত্মনিবেদনের অনন্য মাধ্যম।

ইসলামি জীবনদর্শনে দোয়ার গুরুত্ব অপরিসীম। এটি যেমন আধ্যাত্মিক প্রশান্তির উৎস, তেমনি জাগতিক বিপদ-আপদ থেকে মুক্তির শক্তিশালী ঢাল।

দোয়া কী

আভিধানিক অর্থে দোয়া হলো আল্লাহকে ডাকা বা তাঁর কাছে সাহায্য প্রার্থনা করা। ইমাম ইবনুল কাইয়িম (রহ.)-এর মতে, দোয়া হলো নিজের জন্য কল্যাণকর কোনো বিষয় হাসিলের আবেদন করা অথবা কোনো ক্ষতিকর বিষয় থেকে মুক্তি পাওয়ার প্রার্থনা। (আল-জাওয়াবুল কাফি, ১/১০, দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যাহ, বৈরুত, ১৯৮৫)

ইসলামি শরিয়তে দোয়াকে দুই ভাগে ভাগ করা হয়েছে:

১. ইবাদতমূলক দোয়া (দুআউল ইবাদাহ): এটি সকল প্রকার বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ নেক আমলকে অন্তর্ভুক্ত করে, যা আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য করা হয়।

২. প্রার্থনামূলক দোয়া (দুআউল মাসআলাহ): এটি হলো আল্লাহর কাছে সরাসরি নিজের কোনো প্রয়োজন বা হাজত পূরণের আবেদন করা।

আব্দুর রহমান আস-সাদী (রহ.) একটি মূল্যবান মূলনীতি উল্লেখ করেছেন যে পবিত্র কোরআনে যেখানেই দোয়ার আদেশ করা হয়েছে বা দোয়াকারীর প্রশংসা করা হয়েছে, সেখানে ইবাদত ও প্রার্থনা—উভয় প্রকার দোয়াই উদ্দেশ্য। (তাইসিরুল কারিমির রহমান, ১/৩২, মুয়াসসাসাতুর রিসালাহ, বৈরুত, ২০০২)

এই দুই প্রকার দোয়া একে অপরের পরিপূরক।

আরও পড়ুন

অন্তরের চিকিৎসায় দোয়া

দোয়া হলো মুমিনের অন্তরের প্রশান্তি ও সুখের চাবিকাঠি। আল্লাহ তাআলা পবিত্র কোরআনে ওইসব লোকদের নিন্দা করেছেন যারা বিপদে পড়ার পরও তাঁর কাছে দোয়া করে না।

বলেছেন, “অতঃপর আমার শাস্তি যখন তাদের ওপর এল, তখন কেন তারা বিনীত হলো না? বরং তাদের অন্তরসমূহ আরও কঠোর হয়ে গেল এবং শয়তান তাদের কাজগুলোকে তাদের সামনে সুশোভিত করে দিল।” (সুরা আনআম, আয়াত: ৪৩)

মনীষী আব্দুল্লাহ আল-আনতাকি (রহ.) বলেছেন, অন্তরের ব্যাধি নিরাময়ের পাঁচটি ওষুধের একটি হলো, খুব সকালে আল্লাহর কাছে দোয়া করা।

ইবনুল কাইয়িম (রহ.) দোয়াকে ‘সবচেয়ে উপকারী ওষুধ’ বলে অভিহিত করেছেন। তাঁর মতে, দোয়া হলো বালা-মুসিবতের চিরশত্রু; এটি বিপদকে প্রতিহত করে, দূর করে অথবা অন্তত তার তীব্রতা কমিয়ে দোয়। (আল-জাওয়াবুল কাফি, ১/১১, দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যাহ, বৈরুত, ১৯৮৫)

দোয়ার অতুলনীয় ফজিলত

মুমিনের জীবনে দোয়ার ফজিলত অপরিসীম। এর কিছু গুরুত্বপূর্ণ দিক নিচে তুলে ধরা হলো:

আল্লাহর আদেশ পালন: দোয়া করা কোনো ঐচ্ছিক বিষয় নয়, বরং এটি মহান প্রতিপালকের আদেশ। আল্লাহ তাআলা বলেন, “তোমাদের প্রতিপালক বলেন, তোমরা আমাকে ডাকো, আমি তোমাদের ডাকে সাড়া দেব।” (সুরা গাফির, আয়াত: ৬০)।

সর্বশ্রেষ্ঠ ইবাদত: দোয়া কেবল ইবাদতের অংশ নয়, বরং মহানবী (সা.) বলেছেন, “দোয়া-ই হলো ইবাদত।” (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ১৪৭৯)

অর্থাৎ ইবাদতের সারবস্তু হলো দোয়া।

আল্লাহর কাছে সর্বাধিক সম্মানিত বিষয়: দোয়ার মাধ্যমে বান্দা তার নিজের অক্ষমতা এবং আল্লাহর অসীম ক্ষমতা স্বীকার করে। মহানবী (সা.) বলেছেন, “আল্লাহর কাছে দোয়ার চেয়ে অধিক সম্মানিত আর কোনো কিছু নেই।” (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ৩৩৭০)

হৃদয়ের প্রশস্ততা: দোয়া মানুষের দুশ্চিন্তা ও মানসিক চাপ দূর করার অব্যর্থ মহৌষধ। দোয়ার মাধ্যমে বান্দা যখন তার মনের সব বোঝা আল্লাহর কাছে সঁপে দেয়, তখন সে অভাবনীয় মানসিক শান্তি লাভ করে।

আরও পড়ুন

দোয়ার সুনিশ্চিত ফলাফল

অনেকে মনে করেন দোয়া করলেই সঙ্গে সঙ্গে তা কবুল হতে হবে। কিন্তু হাদিসের ভাষ্য অনুযায়ী দোয়ার ফল কখনো বৃথা যায় না। আল্লাহর রাসুল (সা.) বলেছেন, একজন মুসলিম যখনই কোনো দোয়া করে (যদি তা গুনাহ বা আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করার জন্য না হয়), আল্লাহ তাকে তিনটির যেকোনো একটি দান করেন:

১. যা চাওয়া হয়েছে তা তক্ষুনি দান করা হয়।

২. অথবা তা পরকালের জন্য জমা রাখা হয়।

৩. অথবা তার বিনিময়ে তার সমপরিমাণ কোনো অমঙ্গল বা বিপদ থেকে তাকে রক্ষা করা হয়। (মুসনাদে আহমাদ, হাদিস: ১১১৩৩; আল-আদাবুল মুফরাদ, হাদিস: ৭১০)

বিপদ মুক্তি ও বিজয়ের হাতিয়ার

দোয়া কেবল আধ্যাত্মিক বিষয় নয়, বরং এটি যুদ্ধের ময়দানেও বিজয় ছিনিয়ে আনার অস্ত্র। জালুত ও তার শক্তিশালী বাহিনীর বিরুদ্ধে যখন তালুত ও তার স্বল্প সংখ্যক অনুসারী দাঁড়ালেন, তখন তাদের প্রধান হাতিয়ার ছিল দোয়া।

তাঁরা বলেছিলেন. “হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদের ধৈর্য দান করুন, আমাদের পদযুগল অবিচলিত রাখুন এবং কাফের সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে আমাদের সাহায্য করুন।” (সুরা বাকারা, আয়াত: ২৫০)

এর ফলশ্রুতিতে তাঁরা জয়লাভ করেছিলেন এবং দাউদ (আ.) জালুতকে বধ করেছিলেন।

এ ছাড়া দোয়া হলো মজলুমের শেষ আশ্রয়স্থল। মুয়াজ (রা.)-কে আল্লাহর রাসুল ইয়েমেনে পাঠানোর সময় উপদেশ দিয়েছিলেন, “মজলুমের বদদোয়াকে ভয় করো, কেননা তার দোয়া আর আল্লাহর মাঝখানে কোনো পর্দা নেই। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১৪৯৬)

দোয়া হলো আল্লাহর রহমতের দরজায় কড়া নাড়ার নাম। ইবনে তাইমিয়া (রহ.) সুন্দর করে বলেছেন, বান্দা যখন আল্লাহর কাছে দোয়া করে, তখন কাঙ্ক্ষিত বস্তু পাওয়ার চেয়েও বড় পাওয়া হলো তার অন্তরে আল্লাহর প্রতি ভালোবাসা, একত্ববাদ ও ইমানের যে নুর সৃষ্টি হয়, যা দুনিয়ার যেকোনো সম্পদের চেয়ে মূল্যবান। (মাজমুউল ফাতাওয়া, ১০/৩৩২, দারুল ওয়াফা, ২০০৫)

আরও পড়ুন