মানুষ কেন গিবত করে

ছবি: পেক্সেলস

সামাজিক জীবনে যে পাপগুলো সবচেয়ে সহজে ও নিঃশব্দে বাসা বাঁধে, তার মধ্যে অন্যতম হলো ‘গিবত’ বা পরনিন্দা। বন্ধুদের আড্ডা, চায়ের টেবিল কিংবা সোশ্যাল মিডিয়ার পাতায় হাসির ছলে আমরা প্রায়ই অন্যের অনুপস্থিতিতে তার দোষত্রুটি আলোচনা করি।

এই আলোচনা সমাজে এতটাই সাধারণ হয়ে উঠেছে যে একে পাপ মনে করার মানসিকতাই যেন আমরা হারিয়ে ফেলছি।

আপাতদৃষ্টিতে নির্দোষ বিনোদন মনে করলেও ইসলামি জীবনদর্শনে একে একটি জঘন্য অপরাধ ও আত্মিক ব্যাধি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

পবিত্র কোরআনে গিবত বা পরনিন্দাকে নিজের মৃত ভাইয়ের কাঁচা গোশত খাওয়ার মতো বীভৎস অপরাধের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। (সুরা হুজুরাত, আয়াত: ১২)

মহানবী (সা.) বলেছেন, হে ওই সকল লোক, যারা শুধু মুখেই ইমান এনেছো কিন্তু অন্তর পর্যন্ত বিশ্বাস পৌঁছায়নি, তোমরা মুসলমানদের গিবত কোরো না এবং তাদের গোপন দোষ খুঁজে বের কোরো না; কারণ যে ব্যক্তি তার ভাইয়ের দোষ খোঁজে, আল্লাহ তার দোষ খুঁজে বের করেন, আর আল্লাহ যার দোষ খোঁজেন, তাকে তার ঘরের ভেতরেও অপমানিত করে ছাড়েন। (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ৪৮৮০)

ইসলামি চিন্তাবিদ ইবনে কুদামা আল-মাকদিসির গবেষণার আলোকে গিবতের রূপ, এর নেপথ্য কারণ, ইসলামে এর ব্যতিক্রমী বিধান এবং এই সামাজিক ব্যাধি থেকে বেঁচে থাকার বাস্তবসম্মত উপায়সমূহ এখানে সহজভাবে আলোচনা করা হলো।

গিবত আসলে কী

অনেকেই মনে করেন সত্য কথা বললে বুঝি গিবত হয় না। কিন্তু সাহাবিরা যখন নবীজিকে জিজ্ঞাসা করলেন, গিবত কী? তিনি জবাবে বললেন, তোমার ভাই সম্পর্কে এমন কোনো কথা বলা, যা সে অপছন্দ করে। (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৫৮৯)

এরপর সাহাবিরা আবার প্রশ্ন করলেন, আমি যা বলছি তা যদি সত্যিই আমার ভাইয়ের মধ্যে থাকে? মহানবী (সা.) বললেন, তুমি যা বলছ তা যদি তার মধ্যে থাকে, তবেই তুমি তার গিবত করলে; আর তা যদি তার মধ্যে না থাকে, তবে তো তুমি তার ওপর মিথ্যা অপবাদ দিলে। (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৫৮৯)

ইবনে কুদামা ব্যাখ্যা করেছেন, গিবত শুধু মুখের কথায় সীমাবদ্ধ নয়। কারো অনুপস্থিতিতে তার শারীরিক গঠন (যেমন: খোঁড়া, খাটো, বা ট্যারা বলা), বংশ পরিচয়, নৈতিক চরিত্র বা পোশাকের খামতি নিয়ে কটূক্তি করা যেমন গিবত; ঠিক তেমনি ইশারা-ইঙ্গিত, অভিনয়ের মাধ্যমে ব্যঙ্গ করা কিংবা লিখে কারো চরিত্রহনন করাও গিবতের অন্তর্ভুক্ত। 

এমনকি কেউ যখন অন্য কারো গিবত করে, তখন পাশে বসে তা উপভোগ করা বা নীরব সমর্থন দেওয়াও গিবতে শরিক হওয়ার শামিল। তাফসিরবিদরা বলেছেন যে গিবত শোনার সময় মুখে প্রতিবাদ করতে হবে, আর তা সম্ভব না হলে অন্তত অন্তরে ঘৃণা প্রকাশ করে সেই স্থান ত্যাগ করতে হবে।

কেউ যখন অন্য কারো গিবত করে, তখন পাশে বসে তা উপভোগ করা বা নীরব সমর্থন দেওয়াও গিবতে শরিক হওয়ার শামিল।
আরও পড়ুন

মানুষ কেন গিবত করে?

গিবতের পেছনে কয়েকটি মৌলিক প্রবৃত্তি ও দুর্বলতা কাজ করে। এই কারণগুলো চিহ্নিত করা গেলে তা থেকে বেঁচে থাকা সহজ হয়:

১. রাগ ও ক্ষোভ মিটানো: কারো ওপর রাগ বা প্রতিশোধের আগুন জ্বললে মানুষ তার পেছনে অপপ্রচার চালিয়ে মনের ঝাল মেটাতে চায়।

২. বন্ধুদের সস্তা সমর্থন লাভ: আড্ডায় বন্ধুদের সঙ্গে তাল মেলাতে বা সবাইকে হাসাতে অনেকে অন্যের চরিত্র নিয়ে রসিকতা করে।

৩. নিজেকে বড় প্রমাণ করা: অমুক ব্যক্তি বোকা, সংকীর্ণমনা বা অজ্ঞ—এ কথা বলে পরোক্ষভাবে নিজেকে জ্ঞানী ও শ্রেষ্ঠ হিসেবে জাহির করার অসুস্থ প্রবণতা।

৪. অহংকার ও হিংসা: অন্যের সফলতা বা সম্মান দেখে হিংসাগ্রস্ত হয়ে তার ভুলত্রুটি সবার সামনে ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করা।

গিবতের আত্মিক চিকিৎসা

গিবত থেকে নিজেকে মুক্ত করার কার্যকরী উপায় হলো পরকালে এর ভয়ংকর পরিণাম মনে রাখা। কেয়ামতের দিন কোনো বান্দা যখন ইবাদত নিয়ে উঠবে, তখন গিবতের কাফফারা হিসেবে তার ভালো কাজগুলো ওই নির্যাতিত ব্যক্তিকে দিয়ে দেওয়া হবে।

আর যদি ভালো কাজ শেষ হয়ে যায়, তবে ওই ব্যক্তির পাপের বোঝা গিবতকারীর ঘাড়ে চাপিয়ে দিয়ে তাকে দোজখে ফেলা হবে। মহানবী (সা.) এই ব্যক্তিকে পরকালের প্রকৃত ‘নিঃস্ব বা দেউলিয়া’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন, যে দুনিয়ায় নামাজ-রোজা করেও অন্যের সম্মানহানি করার কারণে পরকালে সব সওয়াব হারিয়ে বসে। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ২৪৪৯)

এছাড়াও যখনই কারো গিবত করার ইচ্ছা জাগবে, তখন নিজের ভেতরের অজস্র দোষত্রুটির কথা চিন্তা করা উচিত। যে মানুষ নিজের ভুল শুধরাতে ব্যস্ত থাকে, অন্যের পেছনে সময় দেওয়ার সুযোগ তার থাকে না।

আর যদি কেউ মনে করে তার কোনো দোষ নেই, তবে তার উচিত মহান আল্লাহর দরবারে শুকরিয়া আদায় করা—যাতে তিনি তাকে পবিত্র রেখেছেন, এবং গিবতের মতো নিকৃষ্টতম পাপে নিজের হাত-মুখ ময়লা না করা।

আরও পড়ুন
ইসলামে কিছু বিশেষ জনকল্যাণমূলক ও আইনি পরিস্থিতিতে কারো সত্য দোষ বা অন্যায়ের কথা প্রকাশ করা গিবত হিসেবে গণ্য হয় না।

কখন গিবত করা অন্যায় নয়

ইসলামে কিছু বিশেষ জনকল্যাণমূলক ও আইনি পরিস্থিতিতে কারো সত্য দোষ বা অন্যায়ের কথা প্রকাশ করা গিবত হিসেবে গণ্য হয় না, বরং তা অনুমোদিত। সেই স্থানগুলো হলো—

১. জুলুমের বিচার চাওয়া: কোনো অত্যাচারিত বা মজলুম ব্যক্তি বিচারক বা কর্তৃপক্ষের কাছে অত্যাচারীর অন্যায়ের বর্ণনা দেওয়া।

২. অন্যায় রোধে সাহায্য চাওয়া: সমাজে ছড়িয়ে পড়া কোনো অপরাধ বা অপরাধীকে থামাতে প্রভাবশালী কারও কাছে সত্য ঘটনা তুলে ধরা।

৩. ফতোয়া ও আইনি পরামর্শ লাভ: মুফতি বা বিচারকের কাছে অধিকার আদায়ের প্রয়োজনে নির্দিষ্ট ঘটনার বিবরণ দেওয়া।

৪. মুসলিমদের ক্ষতি থেকে সতর্ক করা: বিবাহ, ব্যবসায়িক চুক্তি, আমানত রাখা কিংবা কোনো পাপিষ্ঠ বা প্রতারক ব্যক্তির সান্নিধ্য থেকে কোনো সাধারণ মানুষকে রক্ষা করতে সত্য তথ্য প্রকাশ করা।

৫. সুনির্দিষ্ট পরিচিতির জন্য নাম উচ্চারণ: কারো যদি এমন কোনো নাম বা উপাধি থাকে যা ছাড়া তাকে চেনাই যায় না (যেমন: ‘খোঁড়া’ বা ‘অন্ধ’ নামে সুপরিচিত কেউ), তবে হেয় করার নিয়ত ছাড়া শুধু পরিচয় স্পষ্ট করার জন্য তা বলা।

৬. প্রকাশ্যে পাপাচারকারী ব্যক্তি: যে ব্যক্তি প্রকাশ্যে নির্লজ্জভাবে মদ পান, জুলুম বা বেহায়াপনা করে এবং তা নিয়ে লজ্জা বোধ করে না, তার সেই অন্যায়ের কথা আলোচনা করা অপরাধ নয়।

তওবা ও গিবতের কাফফারা

গিবত হলো একটি দ্বিমুখী পাপ। এতে একই সঙ্গে মহান আল্লাহর বিধান অমান্য করার অপরাধ হয় এবং বান্দার হকের (মানব অধিকার) ওপর আঘাত হানা হয়। তাই শুধু আল্লাহর কাছে আস্তাগফিরুল্লাহ পড়লেই গিবতের গুনাহ মাফ হয় না।

যদি যে ব্যক্তির গিবত করা হয়েছে সে বিষয়টি জেনে গিয়ে থাকে, তবে তার কাছে গিয়ে সরাসরি ক্ষমা চেয়ে মন পরিষ্কার করে নিতে হবে। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ২৪৪৯)

আর যদি সেই ব্যক্তি বিষয়টি একেবারেই না জেনে থাকে, তবে তাকে জানিয়ে নতুন করে সম্পর্ক নষ্ট বা আঘাত না দিয়ে, তার জন্য বেশি বেশি আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করতে হবে, গোপনে তার প্রশংসা করতে হবে এবং তার কল্যাণ কামনা করে দোয়া করতে হবে। (ইবনে কুদামা আল-মাকদিসি, মুখতাসার মিনহাজুল কাসিদিন, দারুল মানারাহ, আল-মানসুরা, ২০০২, পৃষ্ঠা ১৮৬-১৯১)

আরও পড়ুন