ইসলামের ইতিহাসে এমন কিছু নারী সাহাবি আছেন, যাঁদের জীবন ইমান, ত্যাগ, ধৈর্য ও আত্মনিবেদনের অনন্য দৃষ্টান্ত। তাঁদের মর্যাদার একটি বিশেষ দিক হলো, রাসুল (সা.) থেকে তাঁরা বেহেশতের সুসংবাদ পেয়েছেন। এমন সৌভাগ্যবতী ১০ নারী সাহাবি হলেন—
১. খাদিজা বিনতে খুয়াইলিদ
খাদিজা (রা.) ছিলেন প্রথম ইসলাম গ্রহণকারী নারী এবং রাসুলের নবুয়তি জীবনের প্রথম আশ্রয়। তিনি নিজের সম্পদ ও ভালোবাসা দিয়ে ধর্মের সূচনালগ্নে নবীজির পাশে দাঁড়িয়েছিলেন।
একবার ফেরেশতা জিবরাইল নবীজির কাছে এসে বললেন, ‘হে আল্লাহর রাসুল, এই যে খাদিজা আপনার কাছে আসছেন। তাঁর সঙ্গে একটি পাত্র আছে, যাতে তরকারি, খাবার অথবা পানীয় রয়েছে। তিনি যখন আপনার কাছে আসবেন, আল্লাহর পক্ষ থেকে এবং আমার পক্ষ থেকে তাঁকে সালাম জানাবেন এবং তাঁকে বেহেশতে একটি ঘরের সুসংবাদ দেবেন, যা মুক্তোর মতো মসৃণ উপাদানে নির্মিত হবে, সেখানে কোনো কোলাহল এবং ক্লান্তি থাকবে না।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস ৩৮২০)
২. আয়েশা সিদ্দিকা
আয়েশা (রা.) ছিলেন উম্মাহর অন্যতম শ্রেষ্ঠ জ্ঞানশিক্ষিকা। তাঁর কাছ থেকে বিপুলসংখ্যক হাদিস বর্ণিত হয়েছে। জ্ঞান ও মর্যাদায় তিনি মুসলিম উম্মাহর কাছে সুপ্রতিষ্ঠিত।
তিনি একদিন রাসুল (সা.)-কে জিজ্ঞেস করলেন, তাঁর সঙ্গে বেহেশতে কোন স্ত্রী থাকবে? নবীজি তাঁকে বললেন, ‘তুমিও তাদের অন্তর্ভুক্ত।’ (আল-মুস্তাদরাক আলাস-সহিহাইন, হাদিস: ৬৭৪৩)
এই নারী সাহাবি মৃগীরোগে আক্রান্ত ছিলেন। রোগের কারণে তাঁর শরীরের কিছু অংশ অনাবৃত হয়ে যেত। তিনি নবীজির কাছে রোগমুক্তির জন্য দোয়া চাইলে নবীজি তাঁকে দুটি পথের একটি বেছে নেওয়ার ইচ্ছাধিকার প্রদান করেন।
৩. নবীকন্যা ফাতেমা
নবীকন্যা ফাতেমার জীবন ছিল সরলতা, ইবাদত, লজ্জাশীলতা ও ধৈর্যে পরিপূর্ণ। তাঁর মর্যাদা সম্পর্কে রাসুল (সা.) বলেন, ‘আকাশ থেকে একজন ফেরেশতা অবতরণ করলেন। তিনি এর আগে কখনো অবতরণ করেননি। তিনি আমার কাছে এসে সালাম জানানোর জন্য আল্লাহর কাছে অনুমতি চাইলেন। অতঃপর তিনি আমাকে সুসংবাদ দিলেন যে ফাতেমা বেহেশতবাসী নারীদের নেত্রী।’ (আল-হাকেম, আল-মুসতাদরাক আলাস-সহিহাইন, হাদিস: ৪৭৮৩)
৪. হাফসা বিনতে ওমর
হাফসা (রা.) ছিলেন অধিক ইবাদতকারী ও রোজাদার নারী। তাঁকে একবার রাসুল (সা.) (এক) তালাক দিলে জিবরাইল (আ.) এসে তাঁকে ফিরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দেন এবং বলেন, ‘হাফসাকে ফিরিয়ে নিন। তিনি অধিক রোজাদার, অধিক ইবাদতকারী এবং বেহেশতে তিনি আপনার স্ত্রী।’ (সহিহুল জামে, হাদিস: ৪৩৫১)
৫. উম্মে সুলাইম রুমাইসা
উম্মে সুলাইম (রা.) ছিলেন নবীজির খাদেম আনাস ইবনে মালিকের মা এবং আবু তালহার স্ত্রী। ইমান, ধৈর্য ও আত্মমর্যাদায় তিনি ছিলেন অনন্য। রাসুল (সা.) তাঁকে বেহেশতে দেখেছেন, এটি তাঁর জন্য সরাসরি বেহেশতের সাক্ষ্য।
নবীজি (সা.) বলেছেন, ‘আমাকে বেহেশত দেখানো হলো, সেখানে আমি আবু তালহার স্ত্রীকে দেখলাম।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৪৫৬–২৪৫৭)
৬. উম্মে যুফার
এই নারী সাহাবি মৃগীরোগে আক্রান্ত ছিলেন। রোগের কারণে তাঁর শরীরের কিছু অংশ অনাবৃত হয়ে যেত। তিনি নবীজির কাছে রোগমুক্তির জন্য দোয়া চাইলে নবীজি তাঁকে দুটি পথের একটি বেছে নেওয়ার ইচ্ছাধিকার প্রদান করেন।
তিনি বলেন, ‘তুমি চাইলে ধৈর্য ধারণ করতে পার, আর এতে তোমার জন্য বেহেশত রয়েছে। আর চাইলে আমি আল্লাহর কাছে তোমার সুস্থতার জন্য দোয়া করতে পারি।’
তিনি ইহকালীন সুস্থতার পরিবর্তে ধৈর্যের পথ বেছে নেন। শুধু অনুরোধ করেন, অসুস্থতার সময় যেন তাঁর শরীর অনাবৃত না হয়। রাসুল (সা.) তাঁর জন্য সে দোয়া করেন। ইবনে আব্বাস (রা.) তাঁকে ‘বেহেশতি নারী’ হিসেবে পরিচয় করিয়েছেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫৬৫২)
৭. উম্মে আইমান বারাকাহ
উম্মে আইমান (রা.) ছিলেন নবীজির শৈশবের পরিচর্যাকারী এবং তাঁর অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ নারী সাহাবি। তাঁর প্রতি নবীজির বিশেষ স্নেহ ছিল।
তাঁর ব্যাপারে নবীজি (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি বেহেশতের কোনো নারীকে বিয়ে করে আনন্দিত হতে চায়, সে যেন উম্মে আইমানকে বিয়ে করে।’ (সুয়ুতি, আল-জামেউস সগির, হাদিস: ৮৭৩০)
শহীদ নারী সাহাবিদের অন্যতম সুমাইয়া (রা.)। মক্কার কাফিরদের নির্যাতনের মুখেও তিনি অটল ও অবিচল থাকেন এবং একপর্যায়ে আবু জাহেলের বর্শার আঘাতে শাহাদাত বরণ করেন।
৮. আসমা বিনতে আবু বকর
হিজরতের ইতিহাসের সঙ্গে সম্পৃক্ত একজন সাহসী নারী আসমা বিনতে আবু বকর। রাসুল (সা.) ও আবু বকর (রা.) যখন মক্কা থেকে মদিনার উদ্দেশে গোপনে রওনা হন, তখন তিনি তাঁদের জন্য সওর গুহায় খাবার প্রস্তুত করে নিয়ে যেতেন।
একবার খাবারের পোঁটলা বাঁধার মতো কিছু না পেয়ে নিজের কোমরবন্ধনী ছিঁড়ে দুই টুকরা করেন। এ কারণে তাঁর উপাধি হয় ‘জাতুন-নিতাকাইন’ তথা দুই কোমরবন্ধের অধিকারিণী।
নবীজি (সা.) তাঁকে বলেন, ‘আল্লাহ তোমাকে এর বিনিময়ে বেহেশতে দুটি কোমরবন্ধ দান করবেন।’ (ইমাম মিজ্জি, তাহজিবুল কামাল ফি আসমাইর রিজাল, ৩৫/১২৪, মুয়াসসাতুর-রিসালাহ, বৈরুত, ১৪১৩ হিজরি)
৯. উম্মে রুমান
উম্মে রুমান (রা.) ছিলেন আয়েশার মা এবং আবু বকর সিদ্দিকের স্ত্রী। ইন্তেকালের পর তাঁর দাফনের সময় নবীজি (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি কোনো বেহেশতি হুরের দিকে তাকিয়ে আনন্দিত হতে চায়, সে যেন উম্মে রুমানের দিকে তাকায়।’ (সুয়ুতি, আল-জামেউস সগির, হাদিস: ৮৭৩১)
১০. সুমাইয়া বিনতে খাইয়াত
ইসলামের প্রথম যুগের নির্যাতিত ও শহীদ নারী সাহাবিদের অন্যতম সুমাইয়া (রা.)। মক্কার কাফিরদের নির্যাতনের মুখেও তিনি অটল ও অবিচল থাকেন এবং একপর্যায়ে আবু জাহেলের বর্শার আঘাতে শাহাদাত বরণ করেন।
নবীজি (সা.) তাঁর পরিবারের লোকদের সান্ত্বনা দিয়ে বলেন, ‘হে আলে ইয়াসির, ধৈর্য ধারণ করো। তোমাদের প্রতিশ্রুত স্থান বেহেশত।’ (তাবারানি, আল-মুজামুল আওসাত, হাদিস: ১৫০৮)
এই দশজনের জীবনযাত্রা একরকম ছিল না। দুনিয়ার চোখে তাঁদের অনেকেই ছিলেন সাধারণ নারী। কিন্তু আসমানে তাঁদের মর্যাদা ছিল অসাধারণ।
নাহিদা সুলতানা : আলেমা ও প্রাবন্ধিক