সাহাবি খুজায়মার একটি সাক্ষ্যের মূল্য

ছবি: পেক্সেলস

ইসলামি শরিয়তের বিধান অনুযায়ী অনেক ক্ষেত্রেই কোনো আইনি বা সামাজিক বিষয়ে সত্যতা প্রমাণের জন্য দুজন পুরুষের সাক্ষ্য আবশ্যক করা হয়েছে। কিন্তু ইসলামের ইতিহাসে এমন একজন মহান সাহাবি আছেন, যাঁর একার সাক্ষ্যকেই স্বয়ং মহানবী (সা.) দুজন পুরুষের সাক্ষ্যের সমতুল্য ঘোষণা করেছিলেন।

তিনি হলেন খুজায়মা ইবনে সাবিত (রা.)। ইতিহাসে তিনি ‘জুশ-শাহাদাতাইন’ বা ‘দুই সাক্ষ্যের অধিকারী’ হিসেবে বিশেষভাবে পরিচিত।

এক অনন্য উপাধির প্রেক্ষাপট

হজরত খুজায়মার এই অনন্য মর্যাদা ও উপাধি লাভের পেছনে একটি চমৎকার ঘটনা রয়েছে। একবার মহানবী (সা.) এক বেদুইনের কাছ থেকে একটি ঘোড়া কেনেন। ঘোড়ার মূল্য পরিশোধের জন্য তিনি বেদুইনকে তাঁর সঙ্গে আসতে বলেন। মহানবী (সা.) কিছুটা দ্রুত হেঁটে পথ চলছিলেন, আর বেদুইনটি ঘোড়া নিয়ে তাঁর পিছু পিছু কিছুটা ধীরগতিতে আসছিল।

অতিরিক্ত মুনাফার লোভে বেদুইন নবীজিকে ডেকে বলল, ‘আপনি কি ঘোড়াটি কিনবেন? না কিনলে আমি এদের কাছে বিক্রি করে দেব।’

এমন সময় কিছু লোক ঘোড়াটির বেচাকেনার খবর না জেনেই বেদুইনের কাছে সেটির দাম বাড়াতে শুরু করে। অতিরিক্ত মুনাফার লোভে বেদুইন নবীজিকে ডেকে বলল, ‘আপনি কি ঘোড়াটি কিনবেন? না কিনলে আমি এদের কাছে বিক্রি করে দেব।’

নবীজি বিস্মিত হয়ে বললেন, ‘ঘোড়া তো আমি তোমার কাছ থেকে কিনেই নিয়েছি, এখন শুধু মূল্য পরিশোধ বাকি।’ কিন্তু বেদুইন চতুরতার আশ্রয় নিয়ে বেচাকেনার বিষয়টি সম্পূর্ণ অস্বীকার করল এবং বলল, ‘আপনার দাবির সপক্ষে কোনো সাক্ষী থাকলে নিয়ে আসুন।’

সেখানে উপস্থিত মুসলমানরা বেদুইনের এমন আচরণের প্রতিবাদ করে বললেন, ‘আল্লাহর রাসুল কখনো মিথ্যা বলতে পারেন না।’ এমন সময় সাহাবি খুজায়মা (রা.) সেখানে এগিয়ে আসেন এবং দৃঢ়কণ্ঠে বললেন, ‘আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, তুমি আল্লাহর রাসুলের কাছে ঘোড়াটি বিক্রি করেছ।’

মহানবী (সা.) তখন খুজায়মাকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘তুমি তো আমাদের বেচাকেনার সময় উপস্থিত ছিলে না, তবে কিসের ভিত্তিতে সাক্ষ্য দিলে?’

আরও পড়ুন

খুজায়মা উত্তরে বললেন, ‘হে আল্লাহর রাসুল, আপনি আল্লাহর পক্ষ থেকে যে ওহি ও আসমানি বার্তা নিয়ে এসেছেন, আমরা তা না দেখেই বিশ্বাস করেছি। আপনার মুখনিঃসৃত প্রতিটি বাণী আমাদের চোখের দেখার চেয়েও বেশি সত্য। তাই আপনার বক্তব্যের ওপর পূর্ণ আস্থা রেখেই আমি এই সাক্ষ্য দিয়েছি।’

খুজায়মার এমন গভীর ইমান ও সূক্ষ্ম বুদ্ধিমত্তা দেখে নবীজি অত্যন্ত আনন্দিত হন। তিনি তখন ঘোষণা করেন, ‘আজ থেকে খুজায়মার একার সাক্ষ্যই দুজন পুরুষের সাক্ষ্যের সমান বিবেচিত হবে।’ (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ৩৬০৭)

কোরআন সংকলনে খুজায়মার সাক্ষ্য

খুজায়মার এই বিশেষ আইনি মর্যাদার কারণে ইসলামের ইতিহাসে এক বিশাল সংকট থেকে উম্মাহ রক্ষা পেয়েছিল। খলিফা আবু বকরের আমলে যখন পবিত্র কোরআন সংকলনের কাজ চলছিল, তখন প্রধান সংকলক জায়েদ ইবনে সাবিত (রা.) একটি কঠোর নীতি অবলম্বন করেছিলেন—লিপিবদ্ধ কোনো আয়াত কোরআনের অংশ হিসেবে গ্রহণ করার জন্য অন্তত দুজন সাহাবির লিখিত প্রমাণ ও সাক্ষ্য লাগত।

সুরা আহজাবের একটি আয়াত শুধু খুজায়মা ইবনে সাবিত আনসারির কাছে লিখিত অবস্থায় পাওয়া যায়। যেহেতু নবীজি তাঁর সাক্ষ্যকে দুজন পুরুষের সাক্ষ্যের সমান ঘোষণা করেছিলেন, তাই আমরা একক উৎস হওয়া সত্ত্বেও তাঁর কাছে থাকা আয়াতটি মূল মাসহাফে অন্তর্ভুক্ত করি।
কোরআনের প্রধান সংকলক জায়েদ ইবনে সাবিত (রা.)

সুরা আহজাবের একটি আয়াত (২৩ নম্বর আয়াত) সংকলনের সময় জায়েদ ইবনে সাবিত বলেন, ‘আমরা যখন মাসহাফ সংকলন করছিলাম, তখন সুরা আহজাবের একটি আয়াত লিখিতরূপে পাচ্ছিলাম না, যা আমি নবীজির মুখে নিয়মিত শুনতাম।

অনুসন্ধান করতে করতে আয়াতটি শুধু খুজায়মা ইবনে সাবিত আনসারির কাছে লিখিত অবস্থায় পাওয়া যায়। যেহেতু নবীজি তাঁর সাক্ষ্যকে দুজন পুরুষের সাক্ষ্যের সমান ঘোষণা করেছিলেন, তাই আমরা একক উৎস হওয়া সত্ত্বেও তাঁর কাছে থাকা আয়াতটি মূল মাসহাফে অন্তর্ভুক্ত করি।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৪৯৮৬; শামসুদ্দিন জাহাবি, সিয়ারু আলামিন নুবালা, ২/৪৮৬, মুআসসাসাতুর রিসালাহ, বৈরুত, ১৯৮৫)

আরও পড়ুন

পরিচয় ও বীরত্বগাথা

সাহাবি খুজায়মা ছিলেন মদিনার আনসারদের আওস গোত্রের বনু খাতমাহ শাখার সন্তান। তাঁর ডাকনাম আবু আম্মারা। তাঁর মা কুবশাহ বিনতে আউসও ছিলেন প্রাচীন ও সমৃদ্ধ বংশের নারী। নবীজি মদিনায় হিজরত করার আগেই খুজায়মা (রা.) ইসলাম গ্রহণ করেন।

ইসলাম গ্রহণের পর তিনি ওমাইর ইবনে আদিকে সঙ্গে নিয়ে নিজ গোত্রের প্রাচীন মূর্তিগুলো ভেঙে ফেলেন। তিনি নবীজির সঙ্গে ওহুদ, মুতাসহ বহু ঐতিহাসিক যুদ্ধে বীরত্বের সঙ্গে অংশগ্রহণ করেন। মক্কা বিজয়ের দিন বনু খাতমাহ গোত্রের ইসলামের পতাকা বহন করার গৌরব অর্জন করেছিলেন তিনি।

হজরত খুজায়মা শুধু একজন বীর যোদ্ধা ছিলেন না, বরং তিনি ছিলেন অত্যন্ত উঁচু মানের ফকিহ ও কবি। তিনি ৩৮টি হাদিস বর্ণনা করেছেন। তাঁর কাছ থেকে তাঁর ছেলে আম্মারা, আবু আবদুল্লাহ আল-জাদালি, আমর বিন ময়মুন আল-আওদি এবং ইব্রাহিম বিন সাদ বিন আবি ওয়াক্কাসের মতো বিখ্যাত ব্যক্তিরা হাদিস বর্ণনা করেছেন (জাহাবি, সিয়ারু আলামিন নুবালা, ২/৪৮৪)

তাঁর মৃত্যুতে খলিফা আলি (রা.) গভীরভাবে শোকাহত হয়ে বলেছিলেন, ‘কোথায় আমার সেই ভাইয়েরা? কোথায় আম্মার? আর কোথায় সেই জুশ-শাহাদাতাইন খুজায়মা?’

মদিনার আওস গোত্র যে চারজন শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিকে নিয়ে সর্বদা গর্ব করত, খুজায়মা ছিলেন তাঁদের অন্যতম।

আনাস (রা.) বলেন, আনসারদের আওস ও খাযরাজ গোত্র যখন নিজেদের মর্যাদা নিয়ে আলোচনা করছিল, তখন আওস গোত্র গর্ব করে বলেছিল, ‘আমাদের মধ্যে এমন ব্যক্তি আছেন যাঁকে ফেরেশতারা গোসল করিয়েছেন (হানজালা ইবনে আবু আমের), যাঁর মৃত্যুতে আল্লাহর আরশ কেঁপে উঠেছিল (সাদ ইবনে মুআজ), যাঁকে শাহাদতের পর ভিমরুল পাহারা দিয়েছিল (আসিম ইবনে সাবিত) এবং যাঁর সাক্ষ্যকে নবীজি দুজন পুরুষের সাক্ষ্যের সমান মর্যাদা দিয়েছেন (খুজায়মা ইবনে সাবিত)। (হাকিম নিশাপুরি, আল-মুস্তাদরাক আলাস সাহিহাইন, হাদিস: ৭১৭২, দারুল কুতুবিল ইলমিয়াহ, বৈরুত, ১৯৯০)

জীবনাবসান

নবীজির ওফাতের পরও খুজায়মা (রা.) ইসলামের সেবায় নিয়োজিত ছিলেন। ৩৭ হিজরিতে সংঘটিত সিফফিনের যুদ্ধে তিনি খলিফা আলির শিবিরের অন্যতম প্রধান সেনাপতি ও নীতিবান নেতা ছিলেন। এই যুদ্ধেই তিনি বীরত্বের সঙ্গে লড়াই করে শহীদ হন।

তাঁর মৃত্যুতে খলিফা আলি (রা.) গভীরভাবে শোকাহত হয়ে বলেছিলেন, ‘কোথায় আমার সেই ভাইয়েরা? কোথায় আম্মার? কোথায় ইবনুত তাইয়িহান? আর কোথায় সেই জুশ-শাহাদাতাইন খুজায়মা?’ (ইবনে আসাকির, তারিখু দিমাশক, ১৬/৩৭১, দারুল ফিকর, বৈরুত, ১৯৯৫)

সাহাবি খুজায়মার জীবন আমাদের শেখায় যে নবীজির প্রতি নিঃশর্ত ভালোবাসা ও অন্ধ বিশ্বাসই একজন মুমিনকে ইতিহাসের পাতায় অমর ও অনন্য মর্যাদার আসনে আসীন করতে পারে।

  • ইলিয়াস মশহুদ : প্রাবন্ধিক ও গবেষক

আরও পড়ুন