‘হিজরত’ কেন মদিনায় হলো

ছবি: ফ্রিপিক

ইসলামের ইতিহাসে হিজরত এক অনন্য অধ্যায়। এটা স্রেফ এক শহর থেকে আরেক শহরে সরে যাওয়া নয়, বরং একটা নিপীড়িত সম্প্রদায়ের সংগঠিত রাষ্ট্রশক্তিতে রূপান্তরের সূচনা।

নবুয়তের তেরোতম বছরে মক্কার কোরাইশ নেতারা দারুন-নাদওয়ায় বসে নবীজিকে হত্যার চূড়ান্ত পরিকল্পনা করে। ঠিক সেই মুহূর্তে মক্কা ছেড়ে মদিনায় (তৎকালীন ইয়াসরিব) হিজরতের নির্দেশ আসে।

প্রশ্ন হলো, আরবের এত অঞ্চল-গোত্র-শহর থাকতে কেন মদিনাই বেছে নেওয়া হলো? এর উত্তর কোনো একটিমাত্র কারণে নেই, একাধিক বাস্তব, যাচাইযোগ্য ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট একসঙ্গে মিলে মদিনাকে এই ভূমিকার জন্য প্রস্তুত করে তুলেছিল।

১. আগেই তৈরি থাকা একদল বিশ্বাসী

সবচেয়ে সরাসরি কারণ হলো, হিজরতের আগেই মদিনায় একটা উল্লেখযোগ্য মুসলিম জনগোষ্ঠী তৈরি হয়ে গিয়েছিল। নবুয়তের একাদশ বছরে ছয়জন মদিনাবাসীর সঙ্গে নবীজির প্রথম সাক্ষাৎ হয়, পরের বছর হজের সময় বারোজন মদিনাবাসী আকাবায় প্রথম শপথ (বাইয়াতুল আকাবা) গ্রহণ করেন।

নবীজি তাঁদের সঙ্গে মুসআব ইবনে উমাইর (রা.)-কে পাঠান দাওয়াতের জন্য। মুসআবের প্রচেষ্টায় এক বছরের মধ্যেই মদিনায় ইসলাম গ্রহণকারীর সংখ্যা এত বেড়ে যায় যে পরের হজ্জ মৌসুমে প্রায় পঁচাত্তরজন মদিনাবাসী দ্বিতীয় আকাবার শপথে অংশ নেন এবং নবীজিকে সশরীরে রক্ষার দায়িত্ব গ্রহণ করেন। (ইবনে হিশাম, আস-সিরাতুন নাবাবিয়্যাহ, মোস্তফা আল-বাবি আল-হালাবি, কায়রো, ১৯৫৫)

অর্থাৎ হিজরতের আগেই মদিনায় প্রস্তুত একটা সহায়ক জনগোষ্ঠী ছিল, অন্য কোনো শহরে এই প্রস্তুতি ছিল না।

মদিনা ছিল একটা উর্বর মরূদ্যান, যেখানে খেজুরবাগান ও কৃষিভিত্তিক অর্থনীতি একটা নতুন জনগোষ্ঠীকে খাদ্য-নিরাপত্তা দেওয়ার মতো সামর্থ্য রাখত। যা মক্কার শুষ্ক, বাণিজ্যনির্ভর অর্থনীতিতে সহজলভ্য ছিল না।
আরও পড়ুন

২. আওস-খাজরাজের নেতার প্রয়োজন

মদিনার দুই প্রধান আরব গোত্র আওস আর খাজরাজ শতাধিক বছর ধরে পরস্পরের সঙ্গে বিবাদে জড়িয়ে ছিল। এই বিবাদের চূড়ান্ত রূপ ছিল বুআসের যুদ্ধ, যা হিজরতের কিছুকাল আগে সংঘটিত হয় এবং উভয় গোত্রকেই ক্লান্ত ও বিধ্বস্ত করে ফেলে।

এই যুদ্ধ-ক্লান্ত পরিস্থিতিতে মদিনার মানুষ এমন একজন নিরপেক্ষ, বহিরাগত কিন্তু বিশ্বস্ত নেতা খুঁজছিল, যিনি তাদের পুরোনো শত্রুতা ভুলিয়ে দিতে পারবেন। নবীজির প্রতি মদিনাবাসীর দ্রুত সাড়া দেওয়ার পেছনে এই সামাজিক প্রয়োজনও একটা বড় কারণ ছিল।

৩. বহুত্ববাদী সমাজকাঠামো

মক্কা ছিল একক ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক কাঠামোর শহর, যেখানে কোরাইশদের পৌত্তলিক আকিদা ও বাণিজ্যিক আধিপত্য ছিল প্রশ্নাতীত—নতুন কোনো আদর্শের বিকাশ সেখানে ছিল কঠিন। এর বিপরীতে মদিনা ছিল তুলনামূলকভাবে বহুত্ববাদী একটি সমাজ, যেখানে বিভিন্ন গোত্র ও ধর্মের মানুষ পাশাপাশি বসবাস করত।

এই বৈচিত্র্যময় পরিবেশ একটা নতুন সামাজিক-রাজনৈতিক কাঠামোর ভিত্তি স্থাপনের জন্য তুলনামূলকভাবে বেশি উপযোগী ছিল।

৪. ভৌগোলিক ও কৃষিভিত্তিক সুবিধা

মদিনা ছিল একটা উর্বর মরূদ্যান, যেখানে খেজুরবাগান ও কৃষিভিত্তিক অর্থনীতি একটা নতুন জনগোষ্ঠীকে খাদ্য-নিরাপত্তা দেওয়ার মতো সামর্থ্য রাখত। যা মক্কার শুষ্ক, বাণিজ্যনির্ভর অর্থনীতিতে সহজলভ্য ছিল না।

পাশাপাশি মক্কা থেকে প্রায় চারশ কিলোমিটার দূরত্ব কোরাইশদের সরাসরি সামরিক নাগালের বাইরে একটা প্রাথমিক সুরক্ষা দিয়েছিল, যদিও পরবর্তীতে বদর-উহুদ-খন্দকের মতো যুদ্ধে কোরাইশরা মদিনা পর্যন্ত পৌঁছেছিল।

আরও পড়ুন
হিজরতের জন্য মদিনা নির্বাচন কোনো একটিমাত্র কারণে হয়নি। এটা ছিল একাধিক বাস্তব সামাজিক, ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক উপাদানের সমাবেশ।

৫. নতুন জাতির জন্য প্রশিক্ষণক্ষেত্র

মদিনায় বসবাসরত ইহুদি গোত্রগুলোর (বানু কাইনুকা, বানু নাজির, বানু কোরাইজা) সঙ্গে মুসলিমদের সম্পর্ক ছিল জটিল এবং সময়ের সঙ্গে তা বিভিন্ন পর্যায় পার হয়েছে। প্রথমদিকে মদিনা সনদের মাধ্যমে একটা পারস্পরিক সহাবস্থানের কাঠামো তৈরি হয়, যা পরবর্তীতে রাজনৈতিক টানাপোড়েনে রূপ নেয়।

এই সম্পর্ক পরিচালনার অভিজ্ঞতা থেকেই নতুন মুসলিম উম্মাহ শিখেছিল কীভাবে ভিন্নধর্মী প্রতিবেশীর সঙ্গে চুক্তিভিত্তিক সম্পর্ক গড়তে ও রক্ষা করতে হয়। এটি এমন এক দক্ষতা, যা পরবর্তী শতাব্দীগুলোতে বিস্তৃত ইসলামি সাম্রাজ্যে বহু-ধর্মীয় জনগোষ্ঠী শাসনের জন্য অপরিহার্য হয়ে ওঠে।

মদিনায় মুসলিমদের আরেকটা নতুন অভিজ্ঞতা হয় মোনাফেকদের মোকাবিলায়। মক্কায় শত্রু ছিল প্রকাশ্য, কিন্তু মদিনায় মুখে ইসলামের দাবিদার অথচ ভেতরে-ভেতরে বিরোধিতাকারী একদল মানুষের মুখোমুখি হতে হয়। এই অভিজ্ঞতা মুসলিম নেতৃত্বকে রাজনৈতিক দূরদর্শিতা ও ধৈর্যের এক নতুন পাঠ দিয়েছিল।

সবমিলিয়ে, হিজরতের জন্য মদিনা নির্বাচন কোনো একটিমাত্র কারণে হয়নি। এটা ছিল একাধিক বাস্তব সামাজিক, ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক উপাদানের সমাবেশ। আগে থেকে তৈরি হওয়া বিশ্বাসীদের দল, আওস-খাজরাজের নিরপেক্ষ নেতৃত্বের তাগিদ, বহুত্ববাদী সামাজিক কাঠামো আর কৃষিভিত্তিক ভৌগোলিক সুবিধা।

এই সবকিছু একসঙ্গে মিলেই মদিনাকে এক নতুন ইসলামি রাষ্ট্রের সূতিকাগার হয়ে ওঠার পথ তৈরি করে দিয়েছিল।

আরও পড়ুন