ক্লান্তি ও অবসাদে ‘তাসবিহে ফাতিমি’: এক অপার্থিব উপহার

ছবি: ফ্রিপিক

আমাদের অনেকের ঘরেই এখন স্থায়ী বা সার্বক্ষণিক কোনো গৃহকর্মী বা সাহায্যকারী নেই। অধিকাংশ গৃহকর্মী এখন নিজ নিজ প্রয়োজনে ছুটিতে থাকেন। যাঁরা সব সময় কারও না কারও সাহায্য নিয়ে ঘরের দৈনন্দিন কাজগুলো করতে অভ্যস্ত, তাঁদের জন্য এই সময়টা বেশ কঠিন হয়ে যায়।

আবার যাঁদের বাসায় আগে থেকেই কোনো সাহায্যকারী নেই, তাঁরাও প্রতিদিন একা হাতে সকাল থেকে রাত পর্যন্ত সব সামলাতে সামলাতে মাঝেমধ্যে চরম বিরক্ত ও ক্লান্ত হয়ে পড়েন।

সংসারের এমন ক্লান্তি আর অবিরাম পরিশ্রমের কথা মনে হলে অবলীলায় চলে আসে নবীকন্যা হজরত ফাতিমার কথা। তিনি ছিলেন নবীজির অতি আদরের কন্যা। অথচ তাঁর পার্থিব জীবন ছিল একেবারেই সাদামাটা ও সাধারণ।

বিয়ের পর নতুন পথ চলতে গিয়ে স্বামী-স্ত্রী পারস্পরিক সমঝোতা করে নিয়েছিলেন। আলী (রা.) ঘরের বাইরের কাজগুলো করতেন, আর ফাতিমা (রা.) দেখতেন ঘরের ভেতরের সমস্ত বিষয়। তাই সংসারের সব কাজ তিনি একাই করতেন এবং অত্যন্ত আগ্রহের সঙ্গেই করতেন।

তবে যেহেতু কাজগুলো ছিল কায়িক পরিশ্রমের, তাই তাঁর খুব কষ্ট হতো। সে যুগে তো আর এ যুগের মতো এত প্রাচুর্য, আধুনিক প্রযুক্তি ও নাগরিক সুযোগ-সুবিধা ছিল না। তিনি দূরবর্তী কূপ থেকে চামড়ার ব্যাগে (মশক) করে পানি এনে ঘরের প্রয়োজন মেটাতেন।

ফাতিমার আবদারের উত্তরে রাসুল (সা.) বলেছিলেন, ‘আমি কি তোমাদের এমন একটি বিষয় বলব না, যা তোমাদের জন্য একজন খাদেম বা সাহায্যকারীর চেয়েও অনেক উত্তম?’
আরও পড়ুন

বারবার ভারী মশক বহন করার ফলে তাঁর বুকে ও পিঠে দাগ পড়ে গিয়েছিল। এমনকি এত বেশি গম বা যবের ঘানি টানতেন যে হাত দিয়ে শক্ত করে সেই জাঁতার হাতল ধরার কারণে তাঁর হাতের তালুতে ফোসকা ও কালো দাগ পড়ে গিয়েছিল।

কাজের কষ্ট ও শারীরিক ক্লান্তি একসময় এতটাই বেড়ে গিয়েছিল যে আলী (রা.) তাঁকে নবীজির কাছে একজন খাদেম বা সাহায্যকারী চাওয়ার পরামর্শ দিয়ে বললেন, ‘তুমি যদি তোমার বাবার কাছে গিয়ে একজন খাদেম চেয়ে নাও, তবে ভালো হয়। এতে তোমার কাজকর্ম করতে সুবিধা হবে।’

বাবার প্রতি অসীম ভালোবাসা আর আবদার নিয়ে ফাতিমা (রা.) নবীজির দরবারে গেলেন। কিন্তু সেখানে অনেকের ভিড় থাকায় লজ্জায় কিছু না বলেই মুখ বুজে ফিরে চলে এসেছিলেন। পরদিন রাসুলুল্লাহ (সা.) নিজেই আদরের মেয়ের বাড়িতে এসে জিজ্ঞেস করলেন, ‘গতকাল তুমি কী প্রয়োজনে গিয়েছিলে?’

ফাতিমা (রা.) লজ্জায় চুপ করে রইলেন। তখন আলী (রা.) নিজেই সব খুলে বললেন, ‘হে আল্লাহর রাসুল, চাক্কি পিষতে পিষতে ফাতিমার হাতে দাগ পড়ে গেছে, পানির মশক বহন করতে করতে তার বুকে দাগ হয়ে গেছে। সংসারের কাজ করতে তার খুব কষ্ট হয়। তাই আমিই তাকে বলেছিলাম আপনার কাছ থেকে একজন সাহায্যকারী চেয়ে নিতে।’

আরও পড়ুন

ফাতিমার আবদারের উত্তরে রাসুল (সা.) বলেছিলেন, ‘আমি কি তোমাদের এমন একটি বিষয় বলব না, যা তোমাদের জন্য একজন খাদেম বা সাহায্যকারীর চেয়েও অনেক অনেক উত্তম?’ এরপর তিনি রাতে ঘুমানোর আগে ৩৩ বার ‘সুবহানাল্লাহ’, ৩৩ বার ‘আলহামদুলিল্লাহ’ এবং ৩৪ বার ‘আল্লাহু আকবার’ পড়তে বললেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫৩৬১; সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৭২৭)

এই জিকিরটিই ইসলামি ইতিহাসে ‘তাসবিহে ফাতিমি’ নামে সুপরিচিত।

যে ব্যক্তি ক্লান্তি ও অবসাদের সময়ে পূর্ণ বিশ্বাসের সঙ্গে এই তাসবিহ নিয়মিত পাঠ করবে, আল্লাহ তার অন্তরে প্রশান্তি, কাজে বরকত এবং দায়িত্ব পালনের অলৌকিক শক্তি দান করেন।

নবীজি প্রিয় কন্যা ফাতিমাকে কোনো পার্থিব সাহায্যকারী দেননি; বরং এমন এক অনন্য আমল দিয়েছিলেন, যা সরাসরি মানুষের আত্মায় এবং শরীরে ঐশ্বরিক শক্তি জোগাতে পারে।

আলেমগণ বলেন, যে ব্যক্তি ক্লান্তি ও অবসাদের সময়ে পূর্ণ বিশ্বাসের সঙ্গে এই তাসবিহ নিয়মিত পাঠ করবে, আল্লাহ তার অন্তরে প্রশান্তি, কাজে বরকত এবং দায়িত্ব পালনের অলৌকিক শক্তি দান করেন। (ইবনে হাজার আল-আসকালানি, ফাতহুল বারি শারহু সহিহিল বুখারি, ১১/১১৯, দারুল মারেফাহ, বৈরুত, ১৩৭৯ হিজরি)

কারণ, বিষয়টি শুধু কয়েকটি শব্দ পড়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এর মধ্যে রয়েছে আল্লাহর স্মরণ, তাঁর নিখাদ প্রশংসা এবং তাঁর সার্বভৌম মহত্ত্বের অকপট স্বীকৃতি। ক্লান্ত শরীর, অবসন্ন মন এবং দায়িত্বের ভারে বিধ্বস্ত একজন মানুষের জন্য এটি এক মহামূল্যবান প্রতিষেধক।

আজ যখন গৃহস্থালি কাজের চাপে আমরা হাঁপিয়ে উঠি এবং মনে হয় আর পারছি না, তখন ফাতিমার জীবনের এ ঘটনা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে সব সমস্যার সমাধান সব সময় বাহ্যিক বা পার্থিব সাহায্য দিয়ে হয় না।

কখনো কখনো আল্লাহর জিকিরই মানুষের হৃদয়ে এমন এক শক্তি, প্রশান্তি ও বারাকাহ এনে দিতে পারে, যা কোনো জাগতিক উপায় দিয়ে পাওয়া সম্ভব নয়। তাই সারা দিনের কাজ শেষে ক্লান্ত শরীর নিয়ে যখন বিছানায় যাবেন, এই ‘তাসবিহে ফাতিমি’ পড়ার অভ্যাস গড়ে তুলবেন। এ সুন্নাহটি নিয়মিত চর্চা করলে এর মাধ্যমেই আল্লাহ আমাদের কাজের মধ্যে বরকত, মনে অনাবিল প্রশান্তি আর শরীরে নতুন শক্তি দান করবেন।

  • ইসমত আরা : শিক্ষক ও লেখক

আরও পড়ুন