ইসলামি স্থাপত্যে কেমন ছিল কুফা শহরের ‘নগর পরিকল্পনা’

কুফার জামে মসজিদ, ইরাকছবি: উইকিপিডিয়া

ইসলামের ইতিহাসে কুফা এক অনন্য নাম। মাদায়েন যুদ্ধে পারসিকদের বিরুদ্ধে মুসলিমদের বিজয়ের পর ইরাকের এই অঞ্চলটি হয়ে ওঠে মুসলিম বীরদের প্রধান সামরিক কেন্দ্র।

দ্বিতীয় খলিফা ওমর ইবনুল খাত্তাব (রা.)-এর নির্দেশনায় এবং সাহাবি সা’দ ইবনে আবি ওয়াক্কাস (রা.)-এর হাতে ১৭ হিজরির মুহাররম মাসে এই শহরের গোড়াপত্তন হয়।

পটভূমি

কাদেসিয়া ও মাদায়েন বিজয়ের পর সেখানকার জলবায়ু মুসলিম মুজাহিদদের স্বাস্থ্যের জন্য খুব একটা অনুকূল ছিল না। সা’দকে খলিফা ওমর এমন এক জায়গা খুঁজে বের করতে বলেন, যা হবে কাঁকরময় এবং আরবের মরু-আবহাওয়ার কাছাকাছি।

সালমান ফারসি ও হোজায়ফা (রা.)-এর মতো বিশেষজ্ঞ সাহাবিদের তৎপরতায় হিরা ও ফোরাতের মধ্যবর্তী কাঁকরময় এই ভূমিটি নির্বাচিত হয়। মূলত কাঁকরময় ভূমিকেই আরবিতে ‘কুফা’ বলা হয়। (নাজি, দিরাসাতু ফি তারিখিল মুদানিল আরাবিয়াতিল ইসলামিয়া, ১৮৩, দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যাহ, বৈরুত, ১৯৮৬)

শহরের নকশা তৈরির সময় প্রথমে মসজিদের স্থান নির্ধারণ করা হয়। মসজিদের ঠিক পাশেই বায়তুলমাল বা রাষ্ট্রীয় কোষাগার এবং প্রশাসনিক ভবন নির্মাণ করা হয়।
আরও পড়ুন

নগর পরিকল্পনা

কুফা শহরকে খলিফা ওমরের সুদূরপ্রসারী আবাসননীতির এক সফল বাস্তবায়ন বলা যায়। অগ্নিকাণ্ডের হাত থেকে বাঁচতে ইটের বাড়ি তৈরির অনুমতি থাকলেও খলিফার নির্দেশ ছিল, ঘরবাড়ি যেন তিন কামরার বেশি বা অতি উঁচু না হয়।

শহরটির নকশা ছিল আধুনিক স্থাপত্যবিদ্যার জন্য বিস্ময়কর। এর প্রধান রাস্তাগুলো ছিল ৪০ হাত চওড়া, ছোট রাস্তা ৩০ হাত এবং গলিপথগুলো কমপক্ষে ৭ হাত প্রশস্ত রাখা হয়েছিল।

এই প্রশস্ত রাস্তাগুলো শহরের মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য ‘ফুসফুস’ হিসেবে কাজ করত। (তাবারি, তারিখুত তাবারি, ৫/১৭, দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যাহ, বৈরুত, ১৯৮৭)

জামে মসজিদ

কুফার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল জামে মসজিদ। শহরের নকশা তৈরির সময় প্রথমে মসজিদের স্থান নির্ধারণ করা হয়। মসজিদের ঠিক পাশেই বায়তুলমাল বা রাষ্ট্রীয় কোষাগার এবং প্রশাসনিক ভবন নির্মাণ করা হয়।

এই নির্মাণকাজে রুজবা ফারিসি নামক একজন দক্ষ স্থপতি বিশেষ ভূমিকা রাখেন। (তাবারি, তারিখুত তাবারি, ৫/১৭)

আরও পড়ুন
প্রথমে শহরে শুধু মুজাহিদ ও সাধারণ মুসলিমরা বসবাস করতেন। পরে পারস্যের একটি সেনাদল জিজয়ার বিনিময়ে এখানে বসবাসের অনুমতি পায়। এদের ‘হামরায়ে দায়লাম’ বলা হতো।

সামাজিক বৈচিত্র্য

প্রথমে শহরে শুধু মুজাহিদ ও সাধারণ মুসলিমরা বসবাস করতেন। পরে পারস্যের একটি সেনাদল জিজয়ার বিনিময়ে এখানে বসবাসের অনুমতি পায়। এদের ‘হামরায়ে দায়লাম’ বলা হতো।

এছাড়া ওমর (রা.) আরব উপদ্বীপ থেকে নাজরানের ইহুদি ও খ্রিষ্টানদের পাঠালে তারাও এখানে ‘নাজরানিয়া’ মহল্লায় বসবাস শুরু করে। (সাল্লাবি, ফাসলুল খিতাব ফি সিরাতি আমিরিল মুমিনিন ওমর ইবনুল খাত্তাব, ২১৭-২১৮, দার ইবনে কাসির, বৈরুত, ২০০২)

রাজধানী হিসেবে কুফার উত্থান

৩৬ হিজরিতে ইসলামের চতুর্থ খলিফা আলি ইবনে আবু তালিব (রা.) রাজধানী মদিনা থেকে কুফায় স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত নেন। এর পেছনে মদিনার পবিত্রতা রক্ষা, সামরিক ও ভৌগোলিক সুবিধা এবং ইরাকের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির মতো কারণগুলো ছিল।

টানা পাঁচ বছর কুফা ছিল ইসলামি খেলাফতের প্রাণকেন্দ্র। তবে ৪০ হিজরির ২১ রমজান খলিফা আলি (রা.)-এর শাহাদতের পর খেলাফতের রাজধানী কুফা থেকে সিরিয়ার দামেশকে স্থানান্তরিত হয়। (নাজ্জার, আল-খুলাফাউর রাশিদুন, ১৮২, দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যাহ, বৈরুত, ১৯৯০)

কুফার প্রশস্ত সড়ক ও নির্মাণশৈলী প্রমাণ দেয় যে চিন্তা ও স্থাপত্যশিল্পের রুচিতে ওমর (রা.) ছিলেন অনন্য। তিনি কুফাকে এমন এক ভিত্তি দিয়েছিলেন, যেখানে একদিকে শহরের সুযোগ-সুবিধা ছিল, অন্যদিকে ছিল গ্রামাঞ্চলের খোলা বাতাস ও সবুজাভ প্রকৃতি।

  • ইলিয়াস মশহুদ: গবেষক ও প্রাবন্ধিক।

আরও পড়ুন