তাড়াহুড়োর মনস্তত্ত্ব: কোরআন কী বলে

প্রজেক্ট জমা দিলেন, বসের রিভিউ আসছে না বলে অস্থির লাগছে। পরীক্ষা দিলেন, ফল প্রকাশে দেরি হওয়ায় ঘুম নেই। 

স্টার্টআপে বিনিয়োগ করলেন, ছয় মাসেও রিটার্ন নেই বলে মাথায় চাপ। মার্কেটিং ক্যাম্পেইন চালালেন, এক সপ্তাহেও বিক্রি বাড়েনি বলে হতাশা।

এই যে ‘এখনই ফলাফল চাই’—এমন মানসিকতা আমাদের সবার মধ্যেই আছে। প্রশ্ন হলো, এটি সামলাব কীভাবে? পবিত্র কোরআন এ প্রশ্নের চমৎকার সমাধান দিয়েছে।

‘মানুষ তাড়াহুড়োপ্রিয়’

সুরা আম্বিয়ায় আল্লাহ বলছেন, ‘মানুষকে সৃষ্টি করা হয়েছে তাড়াহুড়ো দিয়ে।’ (সুরা আম্বিয়া, আয়াত: ৩৭)

লক্ষ্য করুন, আল্লাহ বলছেন না যে তাড়াহুড়ো করা গুনাহের কাজ; বরং বলছেন—এটি মানুষের স্বভাব।

ইমাম ইবনে কাসির এই আয়াতের ব্যাখ্যায় লিখেছেন যে মানুষের সহজাত প্রকৃতিতেই তাড়াহুড়ো রয়েছে। সে দ্রুত ফলাফল চায়। এটি তার সৃষ্টিগত বৈশিষ্ট্য, দোষ নয়। (তাফসির আল-কুররআন আল-আজিম, বৈরুত: দারুল কুতুব আল-ইলমিয়্যাহ, ২০০০, ৩/১৭৪)

সুরা ইসরায় আল্লাহ আরও স্পষ্ট করে বলেছেন, ‘মানুষ তো তাড়াহুড়োকারী।’ (সুরা ইসরা, আয়াত: ১১)

সমস্যা তাড়াহুড়োয় নয়

তাড়াহুড়ো স্বাভাবিক, কিন্তু এটি যখন আমাদের নিয়ন্ত্রণ করে ফেলে—তখনই বিপদ।

ইমাম কুরতুবি বলেছেন, মানুষের তাড়াহুড়ো তখনই ক্ষতিকর হয়, যখন সে ধৈর্য হারিয়ে ফেলে এবং আল্লাহর ওপর ভরসা ছেড়ে দেয়। (আল-জামি লি আহকামিল কুরআন, বৈরুত: মুআসসাসাতুর রিসালাহ, ২০০৬, ১১/২৮৯)।

আরও পড়ুন

কোরআনের সমাধান: তিনটি ধাপ

প্রথম ধাপ: কাজটা ভালো করে করা। আল্লাহ সুরা মুলকে বলেছেন, ‘যিনি মৃত্যু ও জীবন সৃষ্টি করেছেন, যাতে পরীক্ষা করতে পারেন তোমাদের মধ্যে কে কাজে উত্তম।’ (সুরা মুলক, আয়াত: ২)

এখানে আল্লাহ কাজের পরিমাণের চেয়ে মানের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। আপনার দায়িত্ব হলো যথাযথভাবে কাজটা সম্পন্ন করা।

দ্বিতীয় ধাপ: আল্লাহর ওপর ভরসা করা। সুরা তলাকে আল্লাহ বলেছেন, ‘যে আল্লাহর ওপর ভরসা করে, তিনিই তার জন্য যথেষ্ট।’ (সুরা তালাক, আয়াত: ৩)

ইমাম ইবনুল কাইয়িম লিখেছেন, তাওয়াক্কুলের প্রকৃত অর্থ হলো কাজের আগে পরিকল্পনা করা, কাজের সময় সর্বোচ্চ চেষ্টা করা এবং কাজের পর ফলাফল আল্লাহর ওপর ন্যস্ত করা। (মাদারিজুস সালিকিন, বৈরুত: দারুল কিতাব আল-আরাবি, ১৯৯৬, ২/১১৮)।

তৃতীয় ধাপ: ধৈর্য ধরা। সুরা বাকারায় আল্লাহ বলেছেন, ‘ধৈর্য ও নামাজের মাধ্যমে সাহায্য চাও।’ (সুরা বাকারা, আয়াত: ৪৫)

ইমাম তাবারি এই আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেছেন, ধৈর্য হলো কঠিন সময়ে নিজেকে সংযত রাখা এবং আল্লাহর ফয়সালার অপেক্ষায় স্থির থাকা। (জামিউল বায়ান ফি তাফসিরিল কুরআন, কায়রো: দারুল মা'আরিফ, ১/২৫৪)

হাদিসের নির্দেশনা

মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘ধীরস্থিরতা আল্লাহর পক্ষ থেকে, আর তাড়াহুড়ো শয়তানের পক্ষ থেকে।’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ২০১২)

এছাড়া ইমাম বায়হাকি বর্ণনা করেছেন, যে ব্যক্তি কোনো কিছু সময়ের আগে পেতে তাড়াহুড়ো করে, সে তা থেকে বঞ্চিত হয়ে শাস্তি পায়। (শুআবুল ঈমান, বৈরুত: দারুল কুতুব আল-ইলমিয়্যাহ, ১৪১০ হি., ৪/১৯৬)

আরও পড়ুন

জাগতিক নিয়ম ও করণীয়

একটি স্টার্টআপে বিনিয়োগ করেই এক মাসে রিটার্ন পাওয়া কি সম্ভব? না। কারণ পৃথিবীর একটা নিয়ম আছে। “

ইমাম গাজ্জালি লিখেছেন যে আল্লাহ এই পৃথিবীতে সবকিছুর জন্য একটি নির্দিষ্ট সময় রেখেছেন। ফসল পাকতে সময় লাগে, দক্ষতা অর্জনে সময় লাগে, প্রতিষ্ঠান গড়তে সময় লাগে। যে এই নিয়ম মানতে রাজি নয়, সে হতাশায় ডুবে যায়। (ইহইয়াউ উলিমিদ দিন, বৈরুত: দারুল মা'রিফাহ, ৪/৬১)

করণীয় কী

  • কাজটা ভালো করে ও মনোযোগ দিয়ে করুন।

  • ফলাফল আল্লাহর হাতে ছেড়ে দিন (তাওয়াক্কুল)।

  • ধৈর্য ধরুন ও সক্রিয়ভাবে অপেক্ষা করুন।

  • অপেক্ষার সময়টাতে পরবর্তী কাজে মনোযোগ দিন।

শেষ কথা

আপনি তাড়াহুড়ো করেন? এটি স্বাভাবিক, আল্লাহ আপনাকে এভাবেই বানিয়েছেন। কিন্তু এই তাড়াহুড়ো যেন আপনাকে নিয়ন্ত্রণ না করে।

পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন শেষে আল্লাহর ওপর ভরসা করে ধৈর্য ধরুন। ফলাফল আসবেই, ইনশাআল্লাহ।

[email protected]

মুহাম্মাদ মুহসিন মাশকুর : খণ্ডকালীন শিক্ষক, আরবি বিভাগ আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

আরও পড়ুন