হাঁচির দোয়া পাঠে নবীজির শেখানো ৭ আদব

হাঁচির সময় নিজের হাত অথবা পরিধেয় কাপড় দিয়ে মুখ ঢেকে রাখা এবং হাঁচির শব্দ নিচু ও সংযত রাখা নবীজির শেখানো আদবছবি: পেক্সেলস

হাঁচি মানবদেহের একটি স্বাভাবিক ও স্বতঃস্ফূর্ত শারীরবৃত্তীয় প্রতিক্রিয়া। চিকিৎসাবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে হাঁচির মাধ্যমে শ্বাসনালির ক্ষতিকর ধূলিকণা ও জীবাণু দ্রুত বাইরে নিষ্ক্রান্ত হয়, যা মানবদেহের জন্য এক বিরাট স্বস্তির বিষয়।

হাঁচি অনিচ্ছাকৃতভাবে এলেও তার প্রকাশভঙ্গিকে শালীন ও নিয়ন্ত্রিত রাখা ইসলামের সুন্নত। হাঁচির সময় মুখ খোলা রাখলে জীবাণু ও লালার কণা অন্যের গায়ে ছিটকে পড়তে পারে এবং বিকট শব্দ আশপাশের মানুষের অস্বস্তির কারণ হতে পারে।

নবীজি (সা.) যখন হাঁচি দিতেন, তখন তিনি নিজের হাত অথবা পরিধেয় কাপড় দিয়ে মুখ ঢেকে নিতেন এবং হাঁচির শব্দ নিচু ও সংযত রাখতেন।’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ২৭৪৫)

ইসলামে হাঁচিকে আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহ ও ভালোবাসার প্রকাশ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে; বিপরীতে অলসতাপ্রসূত হাই তোলাকে শয়তানের প্রভাব বলে সতর্ক করা হয়েছে। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬২২৩)

হাঁচির পরে নবীজি দোয়া পাঠ করতেন এবং কেউ দোয়া বললে তার উত্তরেও তিনি বলতেন। সাহাবিদের এই দোয়া পড়ার কয়েকটি আদব তিনি শিখিয়েছেন। আলোচনা করা হলো।

১. আল্লাহর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ

হাঁচি আসার প্রক্রিয়াটি মানুষের ইচ্ছাধীন নয়, কিন্তু হাঁচির পর আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করা সম্পূর্ণ মানুষের ইচ্ছাধীন আমল।

রাসুল (সা.) নির্দেশ দিয়েছেন, ‘তোমাদের কেউ যখন হাঁচি দেয়, সে যেন বলে, আলহামদুলিল্লাহ (সব প্রশংসা আল্লাহর জন্য)।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬২২৪)

হাঁচি দেওয়ার মাধ্যমে মস্তিষ্ক ও স্নায়ুতন্ত্র যে ক্ষতিকর চাপমুক্ত হয় এবং ফুসফুস স্বস্তি পায়, মুমিন সেই পার্থিব নিয়ামতের তাৎক্ষণিক শুকরিয়াস্বরূপ ‘আলহামদুলিল্লাহ’ উচ্চারণ করে নিজের এই অজান্তিক ক্রিয়াটিকেও এক অনন্য ইবাদতে রূপান্তর করে।

২. উপস্থিত জবাব বলা

হাঁচিদাতা ‘আলহামদুলিল্লাহ’ বললে তা শুনে উপস্থিত ভাই বা সঙ্গীর ওপর তার জবাব দেওয়া ওয়াজিব বা সুন্নাতে মুয়াক্কাদা। হাদিস শরিফে বলা হয়েছে, ‘অতঃপর তার ভাই বা সঙ্গী যেন তার জবাবে বলে, ইয়ারহামুকাল্লাহ (আল্লাহ তোমার ওপর রহম করুন)।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬২২৪)

ইসলামে এই জবাবকে কোনো সাধারণ সামাজিক সৌজন্য হিসেবে রাখা হয়নি; বরং একে মুসলিম ভ্রাতৃত্বের এক অবিচ্ছেদ্য অধিকার ঘোষণা করা হয়েছে।

রাসুল (সা.) বলেন, ‘এক মুসলমানের ওপর অপর মুসলমানের পাঁচটি সুনির্দিষ্ট হক বা অধিকার রয়েছে; তার মধ্যে একটি হলো, হাঁচির জবাব দেওয়া (তাশমিতুল আতিস)।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১২৪০)

নবীজি (সা.) একজনের হাঁচির জবাবে ‘ইয়ারহামুকাল্লাহ’ বললেন, কিন্তু অপরজনের কোনো জবাব দিলেন না। বাদ পড়া ব্যক্তি জানতে চাইলেন, কেন তার হাঁচির জবাব দিলেন না।
আরও পড়ুন

৩. উত্তরে কল্যাণের দোয়া করা

ইসলামি শিষ্টাচারের সৌন্দর্য হলো, দোয়ার জবাবেও আবার কল্যাণের প্রত্যুত্তর দিতে হয়। শ্রোতা যখন হাঁচিদাতাকে ‘ইয়ারহামুকাল্লাহ’ বলে রহমতের দোয়া করবে, তখন হাঁচিদাতা এর জবাবে বলবে, ‘ইয়াহদিকুমুল্লাহু ওয়া ইউসলিহু বালাকুম’। (অর্থ: ‘আল্লাহ তোমাদের হেদায়েত দান করুন এবং তোমাদের সার্বিক অবস্থা সংশোধন করে দিন।’ সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬২২৪)

এভাবে হাঁচি থেকে শুরু হওয়া একটি জৈবিক প্রক্রিয়া পারস্পরিক তিনটি দোয়ার এক অনন্য শৃঙ্খলে রূপ নেয়—প্রথমে আল্লাহর প্রশংসা (হামদ), এরপর রহমতের দোয়া এবং শেষে হেদায়েত ও সংশোধন কামনার দোয়া।

৪. শুধু শুধু জবাব না দেওয়া

হাঁচি শুনলেই অন্ধভাবে ‘ইয়ারহামুকাল্লাহ’ বলা শ্রোতার দায়িত্ব নয়; বরং হাঁচিদাতা যদি মুখে আল্লাহর প্রশংসা উচ্চারণ করে, তবেই শুধু তার জবাব দিতে হবে।

একবার রাসুলের মজলিসে উপস্থিত দুজনের একজন হাঁচি দিলেন, অতঃপর অপরজনও হাঁচি দিলেন। নবীজি (সা.) একজনের হাঁচির জবাবে ‘ইয়ারহামুকাল্লাহ’ বললেন, কিন্তু অপরজনের কোনো জবাব দিলেন না।

বাদ পড়া ব্যক্তি জানতে চাইলেন, কেন তার হাঁচির জবাব দিলেন না। তখন নবীজি বললেন, ‘এই ব্যক্তি হাঁচি দিয়ে আলহামদুলিল্লাহ বলেছে, কিন্তু তুমি বলোনি।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬২২১)

অর্থাৎ যে ব্যক্তি নিজেই আল্লাহর দেওয়া স্বস্তির শুকরিয়া আদায় করতে গাফেল থাকে, সে অন্যের রহমতের দোয়ারও হকদার হয় না।

৫. ক্রমাগত হাঁচি হলে

কারও যদি ঠান্ডা বা অ্যালার্জির কারণে উপর্যুপরি হাঁচি আসতে থাকে, তবে প্রতিবারই কি জবাব দেওয়া আবশ্যক? হাদিস শরিফে এ বিষয়ে একটি ভারসাম্যপূর্ণ সীমারেখা দেওয়া হয়েছে।

নবীজি বললেন, ‘হাঁচিদাতাকে তিনবার পর্যন্ত জবাব দেওয়া হবে। যদি সে এর চেয়ে বেশি হাঁচি দেয়, তবে তা সাধারণ সর্দি; সুতরাং এরপর তুমি চাইলে জবাব দিতে পারো, চাইলে বিরতও থাকতে পারো।’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ২৭৪৪)

তিনবারের পর নিয়মিত জবাব দেওয়া আবশ্যক নয়; বরং তাকে অসুস্থ বিবেচনা করে তার আরোগ্যের দোয়া করা যেতে পারে।
আরও পড়ুন

অর্থাৎ তিনবারের পর নিয়মিত জবাব দেওয়া আবশ্যক নয়; বরং তাকে অসুস্থ বিবেচনা করে তার আরোগ্যের দোয়া করা যেতে পারে।

৬. অমুসলিম ব্যক্তি হাঁচি দিলে

ইসলাম অমুসলিমদের সঙ্গে মানবিক সদাচরণ ও তাদের হেদায়েত কামনার এক অনুপম শিক্ষা দেয়। মদিনার ইহুদিরা নবীজির সামনে এসে ইচ্ছা করে হাঁচি দিত, যেন তিনি তাদের জবাবে ‘ইয়ারহামুকাল্লাহ’ বলেন। কিন্তু নবীজি তাদের জবাবে বলতেন, ‘ইয়াহদিকুমুল্লাহু ওয়া ইউসলিহু বালাকুম’ (আল্লাহ তোমাদের সুপথ দেখান এবং তোমাদের অন্তরের অবস্থা শুধরে দিন)। (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ৫০৩৮)

এই হাদিস প্রমাণ করে যে অমুসলিমদের প্রতি কোনো বিদ্বেষ নয়; বরং তাদের আন্তরিকভাবে হেদায়েতের পথে ডাকার দোয়াই হলো ইসলামের শিক্ষা।

৭. নামাজ অবস্থায় হাঁচি দিলে

নামাজের বাইরের আদব এবং নামাজের ভেতরের বিধান সম্পূর্ণ ভিন্ন। নামাজ হলো রবের সঙ্গে একান্তে কথোপকথন। তাই নামাজরত অবস্থায় কোনো মুসল্লি অন্য কোনো হাঁচিদাতার জবাবে ‘ইয়ারহামুকাল্লাহ’ বলতে পারবে না।

হাদিসে এসেছে, সাহাবি মুয়াবিয়া ইবনুল হাকাম আস–সুলামি (রা.) একবার নামাজের মধ্যে এক ব্যক্তির হাঁচির জবাবে ‘ইয়ারহামুকাল্লাহ’ বলে ফেলেছিলেন। নামাজ শেষে নবীজি অত্যন্ত স্নেহশীল ভাষায় তাঁকে বুঝিয়ে বললেন, ‘এই নামাজে মানুষের স্বাভাবিক কোনো কথাবার্তা বলা বৈধ নয়; নামাজ তো শুধু তাসবিহ, তাকবির এবং কোরআন পাঠ।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৫৩৭)

ফিকহের মূলনীতি অনুযায়ী, নামাজের ভেতর কোনো মুসল্লির হাঁচির জবাবে ‘ইয়ারহামুকাল্লাহ’ বললে নামাজ ভেঙে যাবে। (ইবনে আবিদিন শামি, রদ্দুল মুহতার আলাদ–দুররিল মুখতার, ২/৩৭৮, দারু আলামিল কুতুব, রিয়াদ, ১৪২৩ হি.)

তবে নামাজরত অবস্থায় নিজের হাঁচি এলে স্বাভাবিকভাবে হাত বা কাপড় দিয়ে মুখ ঢেকে নেবে। মুখ দিয়ে যদি অনিচ্ছাকৃতভাবে ‘আলহামদুলিল্লাহ’ শব্দ বের হয়েও যায়, তবে শুধু এর কারণে নামাজ নষ্ট হবে না।

  • নাহিদা সুলতানা: আলেমা ও প্রাবন্ধিক

    [email protected]

আরও পড়ুন