পরিবারে সুখ ধরে রাখতে ইসলামের সহজ ১০ সূত্র

ছবি: পেক্সেলস

শান্তিময় পরিবার একটি সুন্দর সমাজ গড়ার প্রথম ভিত্তি। কিন্তু অসহিষ্ণুতা, ইগো এবং একে অপরের অধিকার সম্পর্কে অসচেতনতা আমাদের পারিবারিক কাঠামোগুলো নড়বড়ে করে দিচ্ছে। বিচ্ছেদ ও বিচ্ছিন্নতা আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে।

সম্পর্কের ভারসাম্য বজায় রাখতে ইসলাম বেশ কিছু মনস্তাত্ত্বিক ও নৈতিক সমাধান দিয়েছে। পারিবারিক সুখ ধরে রাখার ১০টি সহজ সূত্র তুলে ধরা হলো:

১. পরস্পরকে সম্মান দেওয়ার মানসিকতা

দাম্পত্য জীবনে কলহ এড়ানোর প্রথম ধাপ হলো একে অপরের ভুলত্রুটিকে বড় করে না দেখা। পারফেক্ট মানুষ খোঁজার চেয়ে অপরিপক্বতাকে মানিয়ে নেওয়াই হলো প্রকৃত বুদ্ধিমানের কাজ।

রাসুল (সা.) বলেছেন, “কোনো মুমিন পুরুষ যেন কোনো মুমিন নারীকে (স্ত্রীকে) ঘৃণা না করে। কারণ তার একটি স্বভাব অপছন্দ হলে অন্যটি অবশ্যই পছন্দনীয় হবে।”
(সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১৪৬৭)

২. পরিবারের কাছে নিজেকে প্রিয় করে তোলা

বাইরের জগতের সাফল্যের চেয়ে ঘরের মানুষের কাছে আপনার গ্রহণযোগ্যতা কতটা, তা-ই হলো প্রকৃত চারিত্রিক শ্রেষ্ঠত্বের পরিচয়।

রাসুল (সা.) বলেছেন, “তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তিই শ্রেষ্ঠ, যে তার পরিবারের কাছে শ্রেষ্ঠ।” (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ৩৮৯৫)

আরও পড়ুন

৩. ক্রোধ নিয়ন্ত্রণ

পারিবারিক ঝগড়া চরমে পৌঁছানোর প্রধান কারণ হলো তাৎক্ষণিক রাগ। রাগ নিয়ন্ত্রণ করতে পারলে অনেক বড় বিপর্যয় এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব।

রাসুল (সা.) বলেছেন, “সেই ব্যক্তি বীর নয় যে কুস্তিতে অন্যকে হারিয়ে দেয়; বরং প্রকৃত বীর সে-ই, যে রাগের সময় নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে।” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬১১৪)

৪. পারিবারিক গোপনীয়তা রক্ষা করা

নিজেদের ব্যক্তিগত সমস্যা বা খুঁটিনাটি বিষয় অন্যের কাছে প্রকাশ করা সম্পর্কের দূরত্ব বাড়িয়ে দেয়। ঘরের কথা ঘরে রাখাই হলো নিরাপত্তার মূলমন্ত্র।

আল্লাহ বলেছেন, “তারা (স্ত্রীরা) তোমাদের জন্য আবরণ এবং তোমরা তাদের জন্য আবরণ।” (সুরা বাকারা, আয়াত: ১৮৭)

৫. গালমন্দ ও মন্দ নাম বর্জন

রাগের মাথায় পরস্পরকে গালি দেওয়া বা অবমাননাকর নামে ডাকা সম্পর্কের প্রতি শ্রদ্ধা কমিয়ে দেয়। ইসলামের শিক্ষা হলো সবসময় মার্জিত ভাষায় কথা বলা।

রাসুল (সা.) বলেছেন, “মুমিন কখনো গালিদাতা, অভিশাপকারী, অশালীন ও কটুভাষী হতে পারে না।” (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ১৯৭৭)

৬. সন্দেহপ্রবণতা পরিহার করা

ভিত্তিহীন সন্দেহ পারিবারিক অশান্তির বীজ বপন করে। একে অপরের ওপর বিশ্বাস বজায় রাখা এবং অহেতুক গোয়েন্দাগিরি না করার নির্দেশ দিয়েছে ইসলাম।

আল্লাহ বলেছেন, “হে মুমিনগণ! তোমরা অনেক ধারণা থেকে বেঁচে থাকো; কারণ কিছু ধারণা পাপের কাজ।” (সুরা হুজুরাত, আয়াত: ১২)

আরও পড়ুন

৭. কাজের স্বীকৃতি ও ধন্যবাদ জানানো

পরিবারের সদস্যরা একে অপরের জন্য যা করেন, তার জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করলে বন্ধন সুদৃঢ় হয়। কৃতজ্ঞতা কেবল আল্লাহর প্রতি নয়, মানুষের প্রতিও প্রকাশ করা জরুরি।

রাসুল (সা.) বলেছেন, “যে মানুষের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে না, সে আল্লাহর প্রতিও কৃতজ্ঞ হতে পারে না।” (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ১৯৫৫)

৮. আলোচনার মাধ্যমে সমাধান

ভুল বোঝাবুঝি হলে তা নিয়ে মুখোমুখি কথা বলা এবং যুক্তি দিয়ে সমাধান খোঁজা ইসলামের অন্যতম সৌন্দর্য। একে ‘শূরা’ বা পরামর্শ বলা হয়।

আল্লাহ বলেছেন, “আর তাদের কাজ পরিচালিত হয় নিজেদের মধ্যে পরামর্শের মাধ্যমে।” (সুরা শুরা, আয়াত: ৩৮)

৯. আত্মীয়তার বন্ধন অটুট রাখা

স্বামী-স্ত্রী কেবল একে অপরকে নয়, বরং পরস্পরের পরিবার ও আত্মীয়দের সঙ্গেও সুসম্পর্ক রাখা বাঞ্ছনীয়। এতে দাম্পত্য জীবনে ইতিবাচক প্রভাব পড়ে।

রাসুল (সা.) বলেছেন, “যে ব্যক্তি তার রিজিক বৃদ্ধি এবং দীর্ঘায়ু কামনা করে, সে যেন আত্মীয়তার বন্ধন অটুট রাখে।” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫৯৮৬)

১০. ঘরকে প্রশান্তির কেন্দ্র বানানো

পরিবার কেবল থাকার জায়গা নয়, এটি হোক একে অপরের জন্য মানসিক আশ্রয়ের স্থান। নবীজি (সা.) ঘরের কাজে স্ত্রীদের সহযোগিতা করে ভালোবাসার উদাহরণ রেখে গেছেন।

আয়েশা (রা.) বলেন, “নবীজি নিজের জুতো মেরামত করতেন, কাপড় সেলাই করতেন এবং তোমরা যেভাবে ঘরের কাজ করো সেভাবে কাজ করতেন।” (মুসনাদে আহমাদ, হাদিস: ২৪৯০৩)

পারিবারিক শান্তি কোনো অলৌকিক বিষয় নয়, বরং এটি হলো পরমতসহিষ্ণুতা ও দায়িত্ববোধের ফল। ইসলামের এই ১০টি ছোট ছোট শিক্ষা আমাদের দাম্পত্য ও পারিবারিক জীবনকে করে তুলতে পারে জান্নাতের মতো শান্তিময়।

আরও পড়ুন