নাহাওয়ান্দের বীর নুমান ইবনে মুকররিন

ছবি: ফ্রিপিক

সাহাবি নুমান ইবনে মুকররিনের উপনাম ছিল আবু আমর আল-মুজানি। তিনি ছিলেন ইসলামের একজন বিশিষ্ট সেনাপতি। যুদ্ধের ময়দানে তাঁর বিশেষ খ্যাতি ছিল। খন্দকের যুদ্ধ ছিল তাঁর জীবনের প্রথম যুদ্ধ।

হোদাইবিয়ার সন্ধির পূর্বে সংঘটিত ‘বাইয়াতে রিদওয়ানে’ও তিনি অংশগ্রহণ করেছিলেন। এ ছাড়া মক্কা বিজয়ের দিন মুজায়না গোত্রের পতাকা তাঁর হাতেই শোভা পাচ্ছিল।

নুমান ইবনে মুকররিন (রা.) নবীজির পতাকাতলে থেকে প্রতিটি যুদ্ধে অংশ নেন। প্রথম খলিফা হজরত আবু বকর (রা.)-এর আমলে তিনি মুরতাদ দমনে বীরত্ব দেখান। হজরত ওমরের আমলে যখন মুসলিম বাহিনী পারস্যের মুখোমুখি, তখন খলিফা ওমর (রা.) তাঁর বীরত্বের প্রশংসায় ছিলেন পঞ্চমুখ।

ইসলাম গ্রহণ ও মুজায়না গোত্র

তাঁর গোত্র ‘মুজায়না’ মক্কা ও মদিনার সংযোগস্থলের কাছাকাছি বসবাস করত। মহানবী (সা.) মদিনায় হিজরত করার পর সেই পথ দিয়ে যাতায়াতকারী কাফেলাগুলোর মাধ্যমে নুমান ও তাঁর গোত্র নিয়মিত ইসলামের খবর পেত।

তিনি ঘোষণা করলেন যে তিনি পরদিন সকালে নবীজির কাছে যাবেন। সকাল হতেই দেখা গেল তাঁর ১০ ভাই এবং ৪০০ অশ্বারোহী যোদ্ধা তাঁর সঙ্গে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত।

মুজায়না গোত্র ছিল অত্যন্ত ন্যায়নিষ্ঠ ও ইনসাফপছন্দ। একদিন সন্ধ্যায় নুমান (রা.) তাঁর ভাই ও গোত্রের বড়দের নিয়ে বৈঠকে বসলেন।

তিনি বললেন, ‘হে আমার কওম, আল্লাহর শপথ, আমরা মুহাম্মদ সম্পর্কে কেবল ভালোই জেনেছি। তাঁর দাওয়াত কেবল রহমত, ইহসান ও ন্যায়ের কথা বলে। তবে কেন আমরা পিছিয়ে আছি, যেখানে অন্য মানুষ তাঁর দিকে দ্রুত ধাবিত হচ্ছে?’

তিনি ঘোষণা করলেন যে তিনি পরদিন সকালে নবীজির কাছে যাবেন। সকাল হতেই দেখা গেল তাঁর ১০ ভাই এবং ৪০০ অশ্বারোহী যোদ্ধা তাঁর সঙ্গে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত।

নুমান (রা.) এত বড় একটি দল নিয়ে খালি হাতে যেতে লজ্জিত বোধ করছিলেন। তখন প্রচণ্ড খরা চলায় তাঁদের কাছে সম্পদ বলতে বিশেষ কিছু ছিল না। তিনি নিজের ও ভাইদের ঘরের অবশিষ্ট কিছু বকরি জোগাড় করে সেগুলো নিয়ে মদিনায় হাজির হয়ে ইসলাম গ্রহণ করলেন।

তাঁদের এই গণ-ইসলাম গ্রহণে মদিনায় আনন্দের জোয়ার বয়ে যায়। (ড. আবদুর রহমান রাফাত পাশা, সুওয়ারুম মিন হায়াতিস সাহাবাহ, পৃষ্ঠা ১৪৫-১৫৩, দারুন নাফায়েস, বৈরুত)

আরও পড়ুন

আল্লাহ-তাআলা তাঁদের এই দানকে মহিমান্বিত করে পবিত্র কোরআনের আয়াত নাজিল করেন, ‘আর মরুচারীদের (আরবদের) মধ্যে কেউ কেউ আল্লাহ ও পরকালের ওপর ঈমান আনে এবং যা ব্যয় করে তাকে আল্লাহর নৈকট্য ও রাসুলের দোয়ার মাধ্যম মনে করে। জেনে রেখো, তা অবশ্যই তাদের জন্য নৈকট্য লাভের উপায়...।’ (সুরা তওবা, আয়াত: ৯৯)

ইসলাম গ্রহণের পর নুমান (রা.) সকল যুদ্ধে সক্রিয় অংশ নেন। তিনি বলেছেন, ‘আমি নবীজিকে দেখেছি, তিনি যদি দিনের শুরুতে যুদ্ধ শুরু না করতেন, তবে সূর্য ঢলে পড়া (জোহর) পর্যন্ত অপেক্ষা করতেন।’ (সূর্য ঢলে পড়ার পর আল্লাহর রহমত নাজিল হয় এবং বাতাস প্রবাহিত হয়, যা যুদ্ধের অনুকূল)। (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ১৬১৩)

ওমরের খেলাফতকালে নুমানের ভূমিকা

কাদিসিয়ার যুদ্ধের প্রাক্কালে সিপাহসালার সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস (রা.) পারস্য সম্রাটের কাছে এক প্রতিনিধিদল পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেন। এই দলের নেতৃত্ব দেওয়া হয় নুমান ইবনে মুকররিনকে।

সম্রাট জিজ্ঞেস করলেন, ‘তোমরা আমাদের দেশে কেন এসেছ?’

আমি নবীজিকে দেখেছি, তিনি যদি দিনের শুরুতে যুদ্ধ শুরু না করতেন, তবে সূর্য ঢলে পড়া (জোহর) পর্যন্ত অপেক্ষা করতেন।
নুমান ইবনে মুকররিন (রা.), সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ১৬১৩

নুমান তাঁর সঙ্গীদের থেকে উত্তর দেওয়ার অনুমতি নিয়ে বললেন, ‘আল্লাহ আমাদের প্রতি দয়া করেছেন, একজন রাসুল পাঠিয়েছেন যিনি আমাদের কল্যাণের পথ দেখান এবং মন্দ থেকে নিষেধ করেন। আগে আমরা সংকীর্ণতা, লাঞ্ছনা ও শত্রুতার মধ্যে ছিলাম; ইসলাম আমাদের স্বচ্ছলতা ও মর্যাদা দিয়েছে। আমরা আপনাকেও দাওয়াত দিচ্ছি। ইসলাম গ্রহণ করলে আপনার দেশে আল্লাহর কিতাব রেখে আমরা চলে যাব। না হলে জিজিয়া দেবেন, অন্যথায় যুদ্ধ হবে।’

সম্রাট ইয়াজদাগির্দ তাঁদের অবজ্ঞা করে বললেন, ‘তোমাদের মতো হতভাগা, সংখ্যায় নগণ্য এবং বিশৃঙ্খল জাতি পৃথিবীতে আর আছে বলে আমি জানি না!’

সম্রাট ক্রুদ্ধ হয়ে তাঁদের অপমান করার জন্য এক ঝুড়ি মাটি আনিয়ে বললেন, ‘এটি এই দলের যে সবচেয়ে সম্মানিত ব্যক্তি, তার মাথায় তুলে দিয়ে রাজধানী থেকে বের করে দাও।’

তখন আসেম ইবনে ওমর (রা.) স্বেচ্ছায় সেই মাটির বোঝা মাথায় তুলে নিলেন। তিনি এই মাটি নিয়ে সেনাপতি সাদের কাছে গিয়ে খুশির সংবাদ দিলেন, ‘হে আমির, আল্লাহ আমাদের পারস্যের মাটি দান করেছেন। আমরা তাদের মাটির মালিকানা নিয়ে এসেছি!’

এরপরই সংঘটিত হয় ঐতিহাসিক কাদিসিয়ার যুদ্ধ, যেখানে কিসরার দম্ভ চূর্ণ হয়। (তারিখে তাবারি, ৪/১৬১-১৬৫, দারুল মাআরিফ, বৈরুত)

আরও পড়ুন

নাহাওয়ান্দের যুদ্ধ ও শাহাদত

কাদিসিয়ার পরাজয়ের পর পারসিকরা পুনরায় ১ লক্ষ ৫০ হাজার সেনার বিশাল বাহিনী গঠন করে। এই যুদ্ধ ‘নাহাওয়ান্দের যুদ্ধ’ নামে পরিচিত। খলিফা ওমর (রা.) এই কঠিন মুহূর্তে সেনাপতি হিসেবে নুমান ইবনে মুকররিনকে নিযুক্ত করে পত্র লিখলেন।

যুদ্ধের ময়দানে পারসিকরা রাস্তায় লোহার কাঁটা বিছিয়ে দিয়েছিল। সেনাপতি নুমান (রা.) সুকৌশলে সৈন্যদের পিছিয়ে যাওয়ার ভান করতে বললেন। পারসিকরা মনে করল মুসলিমরা পালাচ্ছে, তাই তারা কাঁটা সরিয়ে পিছু নিল।

অমনি মুসলিম বাহিনী অতর্কিত পাল্টা আক্রমণ শুরু করে। যুদ্ধ শুরু হলে তিনি দোয়া করলেন, ‘হে আল্লাহ, আপনি নুমানকে মুসলিমদের বিজয়ের মাধ্যমে শাহাদত নসিব করুন এবং তাদের বিজয় দান করুন।’

তিনি সিংহের মতো ক্ষিপ্রতায় পারসিক ব্যূহ ভেদ করে ভেতরে ঢুকে পড়লেন। রক্তের পিচ্ছিলতায় নুমানের ঘোড়া পা পিছলে পড়ে গেল এবং তিনি মারাত্মক আহত হন।

যুদ্ধের শেষ পর্যায়ে মাকিল (রা.) যখন নুমানের কাছে পৌঁছালেন, তখন তাঁর শেষ নিঃশ্বাস বইছিল। মাকিল বললেন, ‘আল্লাহ বিজয় দান করেছেন।’

আমার আজও মনে পড়ে সেই দিনের কথা, যেদিন খলিফা ওমর মিম্বরে দাঁড়িয়ে কাঁদতে কাঁদতে নুমান ইবনে মুকররিনের মৃত্যুসংবাদ দিচ্ছিলেন।
সাহাবি সাঈদ ইবনুল মুসাইয়িব (রহ.)

নুমান বললেন, ‘আলহামদুলিল্লাহ। ওমরকে এই সংবাদ লিখে পাঠাও।’ এই কথা বলেই তিনি শাহাদত বরণ করেন। (ইবনে কাসির, আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৭/১০৬-১০৮)

সংবাদ শুনে খলিফা ওমর (রা.) শোকাভিভূত হয়ে অঝোরে কাঁদতে থাকেন। সাঈদ ইবনুল মুসাইয়িব (রহ.) বলেন, ‘আমার আজও মনে পড়ে সেই দিনের কথা, যেদিন খলিফা ওমর মিম্বরে দাঁড়িয়ে কাঁদতে কাঁদতে নুমান ইবনে মুকররিনের মৃত্যুসংবাদ দিচ্ছিলেন।’

অশ্রু বিসর্জনকারী পরিবার

মুজাহিদ (রহ.) বর্ণনা করেন, পবিত্র কোরআনে যাদের ‘বাক্কায়ুন’ (অশ্রু বিসর্জনকারী) বলা হয়েছে, তাঁরা ছিলেন মুকররিনের সাত ছেলে। নুমান (রা.)-এর ভাই সুওয়াইদ, সিনান, মাকিল, আকিল এবং আবদুর রহমানও ছিলেন প্রখ্যাত সাহাবি। মুকররিন পরিবারের এই সাত ভাই-ই খন্দকের যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন। (ইমাম জাহাবি, সিয়ারু আলামিন নুবালা, ২/৪০৪)

নুমান ইবনে মুকররিন (রা.) হিজরি ২১ সালে নাহাওয়ান্দের যুদ্ধে প্রধান সেনাপতি থাকা অবস্থায় শাহাদত বরণ করেন। নবীজির ইন্তেকালের পর তিনি কুফায় বসবাস করতেন এবং খলিফা ওমর (রা.) তাঁকে কাসকার অঞ্চলের শাসনকর্তা নিয়োগ করেছিলেন।

আরও পড়ুন