ইসলামের ইতিহাসের আকাশ অসংখ্য উজ্জ্বল নক্ষত্রে সুশোভিত, সেই নক্ষত্ররাজির মাঝে এক অনন্য ব্যক্তিত্বের নাম আবু উবাইদা ইবনে জাররাহ (রা.)।
তিনি কেবল একজন রণকৌশলী বীর যোদ্ধাই ছিলেন না, বরং আল্লাহর রাসুল (সা.) নিজে তাঁকে ‘আমিনুল উম্মাহ’ বা এই উম্মতের সবচেয়ে বিশ্বস্ত ব্যক্তি হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। জান্নাতের সুসংবাদপ্রাপ্ত ১০ জন সাহাবির অন্যতম ছিলেন তিনি।
পরিচয় ও ইসলাম গ্রহণ
তাঁর প্রকৃত নাম আমির ইবনে আবদুল্লাহ ইবনে জাররাহ আল-ফিহরি আল-কুরাশি। তিনি ৫৮৪ খ্রিষ্টাব্দে (নবীজির জন্মের ১৩ বছর পরে এবং হিজরতের প্রায় ৪০ বছর আগে) মক্কার কুরাইশ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন।
তিনি ছিলেন দীর্ঘদেহী, পাতলা গড়ন এবং অত্যন্ত সুশ্রী চেহারার অধিকারী। ইসলামের একেবারে সূচনালগ্নে যে কজন ব্যক্তি ইমানের পথে পা বাড়িয়েছিলেন, আবু উবাইদা তাঁদের একজন।
আবু বকর (রা.)-এর ইসলাম গ্রহণের মাত্র একদিন পর তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন এবং ‘দারুল আরকাম’-এ আল্লাহর রাসুলের কাছে ধর্মীয় বিষয়–আশয় শিক্ষা শুরু করেন। (ইবনে সাদ, আত-তবাকাতুল কুবরা, ৩/২৯৭, দারু সাদির, বৈরুত, ১৯৬৮)
আমিনুল উম্মাহ: বিশ্বস্ততার উপাধি
তিনি কী ‘উম্মতের আমানতদার’ হিসেবে পরিচিতি পেলেন, তার পেছনে রয়েছে একটি বিশেষ ঘটনা।
একদিন নাজরান থেকে একটি প্রতিনিধি দল রাসুলের কাছে এসে আবেদন করল যেন তাদের সঙ্গে একজন নির্ভরযোগ্য ও আমানতদার ব্যক্তি পাঠানো হয়, যিনি তাদের ইসলামের শিক্ষা দেবেন এবং বিরোধের মীমাংসা করবেন। তখন আল্লাহর রাসুল (সা.) বললেন, “আমি তোমাদের সঙ্গে এমন একজন আমানতদার লোক পাঠাব, যে সত্যিকার অর্থেই আমানতদার।” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৪৩৮১)
সেদিন অনেক প্রবীণ সাহাবিও মনে মনে এই মহান উপাধি পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা করেছিলেন। কিন্তু আল্লাহর রাসুল তখন আবু উবাইদার হাত ধরে বললেন, “এই ব্যক্তিই এই উম্মতের আমানতদার।”
এই ঘটনা তাঁর চারিত্রিক দৃঢ়তা এবং বিশ্বস্ততাকে চিরস্থায়ী মর্যাদা দান করে।
ওহুদ যুদ্ধে আত্মত্যাগ
রাসুলের প্রতি আবু উবাইদার ভালোবাসা ছিল বর্ণনাতীত। ওহুদ যুদ্ধের কঠিন মুহূর্তে, যখন চারিদিকে বিশৃঙ্খলা এবং শত্রুপক্ষ আল্লাহর রাসুলকে লক্ষ্য করে আক্রমণ করছিল, তখন আবু উবাইদা ঢাল হয়ে দাঁড়ান। যুদ্ধের এক পর্যায়ে আল্লাহর রাসুলের চিবুকে শিরস্ত্রাণের দুটি লোহার আংটা ঢুকে যায়।
আবু উবাইদা তখন হাত দিয়ে টানলে রাসূলের কষ্ট হতে পারে ভেবে নিজের সামনের দাঁত দিয়ে সেই লোহার আংটাগুলো কামড়ে ধরেন এবং টেনে বের করেন। এই কাজে তাঁর নিজের সামনের দুটি দাঁত ভেঙে যায়, কিন্তু তিনি বিন্দুমাত্র বিচলিত হননি। (ইবনে হিশাম, আস-সিরাতুন নাবাবিয়্যাহ, ২/ ৮০, দারু ইহয়াইল তুরাসিল আরাবি, বৈরুত)
বদর যুদ্ধে বিশ্বাসের কঠিন পরীক্ষা
ইমানের পথে আবু উবাইদার নিষ্ঠা ছিল পাহাড়ের মতো অটল। বদর যুদ্ধে তিনি এক অভূতপূর্ব পরীক্ষার সম্মুখীন হন। যুদ্ধের ময়দানে তাঁর জন্মদাতা পিতা আবদুল্লাহ ইবনে জাররাহ মক্কার মুশরিক বাহিনীর হয়ে লড়ছিলেন এবং বারবার আবু উবাইদার সামনে এসে তাঁকে আক্রমণ করার চেষ্টা করছিলেন।
আবু উবাইদা (রা.) বরাবর পিতাকে এড়িয়ে যাচ্ছিলেন। কিন্তু যুদ্ধ তো যুদ্ধই। এক পর্যায়ে যখন পিতা সরাসরি তাঁর পথ রোধ করে আল্লাহর রাসুলের বাহিনীকে আক্রমণ করতে উদ্যত হলে তিনি রক্তের সম্পর্কের চেয়ে আল্লাহর প্রতি আনুগত্যকে অগ্রাধিকার দিলেন এবং দ্বৈরথে তাঁর পিতা নিহত হন।
এই প্রেক্ষাপটে পবিত্র কোরআনের আয়াত নাজিল হয়, “যারা আল্লাহ ও পরকালের প্রতি বিশ্বাস রাখে, আপনি এমন কোন সম্প্রদায় পাবেন না যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের বিরুদ্ধাচরণকারীদের সঙ্গে বন্ধুত্ব করে—চাই তারা তাদের পিতাই হোক কিংবা পুত্র অথবা ভাই কিংবা তাদের আত্মীয়স্বজন।” (সুরা মুজাদালা, আয়াত: ২২)
সিরিয়া বিজয় ও রণনৈপুণ্য
রাসুলের ইন্তেকালের পর প্রথম খলিফা আবু বকর এবং দ্বিতীয় খলিফা ওমরের আমলে আবু উবাইদা (রা.) অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ওমর (রা.) তাঁকে সিরিয়া ও ফিলিস্তিন অঞ্চলের প্রধান সেনাপতি নিযুক্ত করেন।
তাঁর নেতৃত্বে মুসলিম বাহিনী তৎকালীন বিশ্বের অন্যতম পরাশক্তি বাইজেন্টাইন (রোমান) সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে ঐতিহাসিক ইয়ারমুক যুদ্ধে জয়লাভ করে। (আত-তাবারি, তারিখুর রুসুল ওয়াল মুলুক, ৪/৫৪, দারুল মা’আরিফ, কায়রো, ১৯৬৭)
তিনি কেবল একজন কঠোর সেনানায়ক ছিলেন না, বরং বিজিত অঞ্চলের মানুষের প্রতি তাঁর ইনসাফ ও দয়া ছিল কিংবদন্তীতুল্য। তাঁর চারিত্রিক গুণাবলিতে মুগ্ধ হয়ে হাজারো মানুষ ইসলাম গ্রহণ করেছিল।
সিরিয়া বিজয় হওয়ার পর খলিফা ওমর তাঁর অনাড়ম্বর জীবন দেখে কেঁদে ফেলেছিলেন। কারণ, এত বড় অঞ্চলের শাসনকর্তা হওয়া সত্ত্বেও তাঁর ঘরে একটি তরবারি, একটি ঢাল আর সামান্য কিছু বিছানাপত্র ছাড়া আর কিছুই ছিল না।
প্লেগ রোগ ও শাহাদত
হিজরি ১৮ সালে সিরিয়ায় ‘আমওয়াস’ নামক স্থানে মহামারি আকারে প্লেগ (তউন) ছড়িয়ে পড়ে। আবু উবাইদার জীবন রক্ষার তাগিদে খলিফা ওমর (রা.) তাঁকে মদিনায় ফিরে আসতে বিশেষ পত্র পাঠান।
কিন্তু এই মহৎ সাহাবি নিজের সৈন্যবাহিনীকে বিপদে ফেলে নিজে পালিয়ে আসতে অস্বীকার করেন। তিনি খলিফাকে উত্তরে লিখেছিলেন, “আমিরুল মুমিনিন, আমি আমার সৈন্যদের ছেড়ে আসব না। আল্লাহর ফয়সালা যা আছে, তা-ই হবে।”
অবশেষে এই মহামারিতে আক্রান্ত হয়ে ৫৮ বছর বয়সে ইসলামের এই মহান বীর মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর কবর বর্তমান জর্দানের ‘বিসান’ নামক স্থানে অবস্থিত। (ইবনুল আসির, উসদুল গাবাহ ফি মারিফাতিস সাহাবাহ, ৩/২০, দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যাহ, বৈরুত, ১৯৯৪)
ওমরের আক্ষেপ
আবু উবাইদাকে খলিফা ওমর (রা.) কতটা শ্রদ্ধা করতেন তা বোঝা যায় তাঁর একটি উক্তি থেকে।
খলিফা যখন মৃত্যুর শয্যায় ছিলেন, তখন তিনি বলেছিলেন, “যদি আবু উবাইদা জীবিত থাকত, তবে আমি তাকে খলিফা মনোনীত করে যেতাম। যদি আমার প্রতিপালক আমাকে জিজ্ঞেস করতেন, কেন তাকে নেতা বানালে? তবে আমি বলতাম, আমি আল্লাহর রাসুলকে বলতে শুনেছি যে আবু উবাইদা হলো এই উম্মতের আমানতদার।” (ইবনে আসাকির, তারিখু দিমাশক, ২৫/ ৪৪৫, দারুল ফিকর, বৈরুত, ১৯৯৫)
সাহাবি আবু উবাইদার জীবন আমাদের শেখায় কীভাবে ক্ষমতার শীর্ষে থেকেও একজন মানুষ নির্মোহ ও বিনয়ী থাকতে পারেন। তাঁর বিশ্বস্ততা, সাহসিকতা এবং ইসলামের প্রতি নিবেদন আজও প্রতিটি মুসলিমের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস।