স্বাধীনতা মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে মানবজাতির জন্য একটি নেয়ামত। ইসলাম কেবল পারলৌকিক মুক্তির কথা বলে না, বরং একটি স্বাধীন ও ইনসাফভিত্তিক সমাজ ও রাষ্ট্র গঠনের পথনির্দেশ দেয়।
মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জীবনচরিত পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, তিনি নবুয়তি মিশনের পাশাপাশি একটি স্বাধীন ভূখণ্ড প্রতিষ্ঠা এবং এর সার্বভৌমত্ব রক্ষায় অত্যন্ত বৈজ্ঞানিক ও দূরদর্শী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিলেন।
মদিনা ছিল সেই আদর্শের বাস্তব রূপ।
১. স্বাধীনতার আইনগত ভিত্তি ও স্বীকৃতি
মদিনায় হিজরতের পর তাঁর প্রথম কাজ ছিল একটি লিখিত সংবিধান প্রণয়ন করা, যা ইতিহাসে ‘মদিনার সনদ’ নামে পরিচিত। একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্য আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ স্বীকৃতি অত্যন্ত জরুরি।
এই সনদের মাধ্যমে মদিনাকে একটি ‘হারাম’ বা পবিত্র নিরাপদ অঞ্চল হিসেবে ঘোষণা করা হয়।
সনদের অন্যতম ধারা ছিল, “মদিনার ওপর কোনো বহিঃশত্রু আক্রমণ করলে মুসলিম, ইহুদি ও অন্যান্য সম্প্রদায় ঐক্যবদ্ধভাবে তা প্রতিহত করবে।” (ইবনে হিশাম, আস-সিরাতুন নাবাবিয়্যাহ, ২/১৪৭-১৫০, বৈরুত: দারুল কিতাব আল-আরাবি, ১৯৯০)
এর মাধ্যমে তিনি কেবল মুসলিমদের নয়, বরং মদিনার সকল নাগরিককে দেশরক্ষার এই মহান দায়িত্বে অন্তর্ভুক্ত করেন। এটি প্রমাণ করে যে, স্বাধীনতার রক্ষাকবচ হলো জাতীয় ঐক্য। (ড. মুহাম্মদ হামিদুল্লাহ, দ্য ফার্স্ট রিটেন কনস্টিটিউশন ইন দ্য ওয়ার্ল্ড, পৃষ্ঠা: ৪৩-৪৫, লাহোর: আশরাফ পাবলিকেশন্স, ১৯৭৫)
স্বাধীনতা ধরে রাখার জন্য তিনি অত্যন্ত নিপুণ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলেন। তিনি কেবল আক্রান্ত হওয়ার অপেক্ষায় থাকতেন না, বরং শত্রুর গতিবিধি পর্যবেক্ষণের জন্য নিয়মিত ‘সারিয়া’ বা ছোট ছোট পর্যবেক্ষণ দল পাঠাতেন।
২. ভূ-রাজনৈতিক প্রতিরক্ষা ও গোয়েন্দা তৎপরতা
স্বাধীনতা ধরে রাখার জন্য তিনি অত্যন্ত নিপুণ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলেন। তিনি কেবল আক্রান্ত হওয়ার অপেক্ষায় থাকতেন না, বরং শত্রুর গতিবিধি পর্যবেক্ষণের জন্য নিয়মিত ‘সারিয়া’ বা ছোট ছোট পর্যবেক্ষণ দল পাঠাতেন।
এটি ছিল আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ‘প্রি-এম্পটিভ ডিফেন্স’ বা অগ্রিম প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার প্রাথমিক রূপ। বদর, ওহুদ ও খন্দকের যুদ্ধে তাঁর রণকৌশল ধর্ম রক্ষার সঙ্গে সঙ্গে ছিল একটি স্বাধীন ভূখণ্ডের অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই।
বিশেষ করে খন্দকের যুদ্ধে পরিখা খনন ছিল আরবের ইতিহাসে এক নতুন ও আধুনিক প্রতিরক্ষা কৌশল। (ইবনে হিশাম, আস-সিরাতুন নাবাবিয়্যাহ, ২/২১৯-২২৪, বৈরুত: দারুল কিতাব আল-আরাবি, ১৯৯০)
৩. কূটনৈতিক দূরদর্শিতা ও হোদাইবিয়ার সন্ধি
স্বাধীনতা রক্ষার অন্যতম অনুষঙ্গ হলো সফল কূটনীতি। ৬ষ্ঠ হিজরিতে সম্পাদিত ‘হোদাইবিয়ার সন্ধি’ আপাতদৃষ্টিতে মুসলিমদের জন্য অবমাননাকর মনে হলেও দীর্ঘমেয়াদে এটি ছিল মদিনা রাষ্ট্রের স্বাধীনতার এক মহা-বিজয়।
এই চুক্তির মাধ্যমে মক্কার কোরাইশরা মদিনাকে একটি স্বাধীন রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে আইনগত স্বীকৃতি দেয়।
এর ফলে মহানবী (সা.) বহির্বিশ্বের সম্রাটদের কাছে ইসলামের দাওয়াত ও কূটনৈতিক পত্র পাঠানোর সুযোগ পান, যা মদিনা রাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক মর্যাদা বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। (সফিউর রহমান মোবারকপুরি, আর-রাহিকুল মাখতুম, পৃষ্ঠা: ৩৩৮-৩৪০, রিয়াদ: দারুস সালাম পাবলিকেশন্স, ২০০২)
হে আল্লাহ, আমাদের কাছে মদিনাকে প্রিয় করে দিন, যেমন আমরা মক্কাকে ভালোবাসি, অথবা তার চেয়েও বেশি।
৪. অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ও ফিতনা দমন
একটি রাষ্ট্রের স্বাধীনতা কেবল বহিঃশত্রু নয়, বরং অভ্যন্তরীণ ষড়যন্ত্রের কারণেও বিপন্ন হতে পারে। মদিনার ভেতরে মোনাফেক ও কতিপয় গোষ্ঠীর ষড়যন্ত্র নস্যাৎ করার জন্য মহানবী (সা.) ছিলেন কঠোর।
তিনি মদিনার শান্তি ও সংহতি বিনষ্টকারীদের ব্যাপারে শূন্য সহনশীলতা প্রদর্শন করতেন। (ইবনে কাসির, আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৪/১৫৮-১৬০, কায়রো: দারু হাজার, ১৯৯৭)
এটি শিক্ষা দেয় যে, রাষ্ট্রের স্বাধীনতা রক্ষায় অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখা অপরিহার্য।
৫. দেশপ্রেম ও নাগরিকের দায়বদ্ধতা
মহানবী (সা.) শিখিয়েছেন যে, মাতৃভূমির প্রতি ভালোবাসা ইমানের অংশ। তিনি যখনই কোনো সফর থেকে মদিনায় ফিরতেন, মদিনার দেয়াল বা ওহুদ পাহাড় দেখে ভালোবাসায় নিজের সওয়ারির গতি বাড়িয়ে দিতেন।
তিনি দোয়া করতেন, “হে আল্লাহ, আমাদের কাছে মদিনাকে প্রিয় করে দিন, যেমন আমরা মক্কাকে ভালোবাসি, অথবা তার চেয়েও বেশি।” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১৮০২)
দেশের স্বাধীনতা রক্ষায় নাগরিকদের মানসিকভাবে প্রস্তুত করার জন্য তিনি এই দেশপ্রেমের চর্চা করতেন।
মদিনা রাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা ও স্বাধীনতা রক্ষার ইতিহাস আমাদের শেখায়, স্বাধীনতা আল্লাহর দান এবং এর সুরক্ষায় ত্যাগ, প্রজ্ঞা ও নাগরিক দায়িত্ববোধ অপরিহার্য।
বাংলাদেশের স্বাধীনতা দিবসে আমাদের জাতীয় সংহতি সুদৃঢ় করা এবং ইনসাফ কায়েমের মাধ্যমে সার্বভৌমত্ব রক্ষা করাই হোক মদিনা রাষ্ট্রের সেই মহান আদর্শের অনুসারী হওয়ার প্রধান উপায়।