দোয়া কি শুধু আরবিতেই করতে হবে

ছবি: ফ্রিপিক

বহু সাধারণ মুসলিমের মনে প্রায়শই দ্বিধাদ্বন্দ্ব দেখা দেয় যে আল্লাহর কাছে নিভৃতে ফরিয়াদ করার জন্য কি আরবি জানা বাধ্যতামূলক? যে ব্যক্তি আরবি ভাষার অর্থ বোঝে না, সে যদি মুখস্থ কিছু আরবি শব্দ উচ্চারণ করে, তবে কি তার অন্তরের আসল আকুতি প্রকাশ পায়?

মাতৃভাষায় নিজের ব্যথা, অশ্রু ও অনুভূতি প্রকাশ করে আল্লাহর কাছে চাইলে কি সেই দোয়া কবুল হবে? আবার নামাজের ভেতর রুকু, সিজদা বা শেষ বৈঠকে মাতৃভাষায় দোয়া করার ফিকহি সীমারেখাই–বা কী?

মানুষের ভাষার বৈচিত্র্য স্বয়ং আল্লাহর অন্যতম বড় কুদরতি নিদর্শন। তিনি ঘোষণা করেন, “আর তাঁর নিদর্শনাবলির মধ্যে অন্যতম হলো আকাশমণ্ডল ও পৃথিবীর সৃষ্টি এবং তোমাদের ভাষা ও বর্ণের বৈচিত্র্য; নিশ্চয়ই এতে জ্ঞানীদের জন্য নিদর্শন রয়েছে।” (সুরা রুম, আয়াত: ২২)

নামাজ ও সাধারণ দোয়ার পার্থক্য

এই মাসআলাটি সঠিকভাবে বোঝার মূল চাবিকাঠি হলো ‘নামাজ’ এবং ‘সাধারণ দোয়া’র পার্থক্য স্পষ্ট করা। নামাজ হলো একটি সুনির্দিষ্ট ইবাদত।

মহানবী (সা.) নির্দেশ দিয়েছেন, ‘তোমরা সেভাবে নামাজ আদায় করো, যেভাবে আমাকে আদায় করতে দেখেছ।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬৩১)

নামাজের কিরাত, রুকু, সিজদা ও তাশাহুদে পঠিত শব্দাবলি আসমানিভাবে আরবি ভাষায় নির্ধারিত; এখানে ব্যক্তিগত পরিবর্তন চলে না।

তবে নামাজের বাইরে যে সাধারণ ‘দোয়া’ বা মোনাজাত মানুষ করে, তা হলো বান্দার পক্ষ থেকে তাঁর মালিকের কাছে একান্ত প্রার্থনা, কাকুতি-মিনতি ও অভাব প্রকাশ। এখানে বান্দা নিজের পাপের ক্ষমা চায়, জীবনের সুখ-দুঃখের কথা বলে।

তাই নামাজের বাইরের দোয়ায় ভাষা কোনো প্রতিবন্ধক নয়; বরং অন্তরের আকুতি ও উপস্থিত বুদ্ধিই হলো প্রধান শর্ত।

নামাজের বাইরে যেকোনো ভাষায়—বাংলা, ইংরেজি, উর্দু বা অন্য যেকোনো মাতৃভাষায়—দোয়া করার ক্ষেত্রে ফকিহ ও মুজতাহিদগণের মাঝে কোনো দ্বিমত নেই। এটি সর্বসম্মতভাবে সম্পূর্ণ জায়েজ ও প্রশংসনীয়।
আরও পড়ুন

যেকোনো ভাষায় দোয়ার বৈধতা

নামাজের বাইরে যেকোনো ভাষায়—বাংলা, ইংরেজি, উর্দু বা অন্য যেকোনো মাতৃভাষায়—দোয়া করার ক্ষেত্রে ফকিহ ও মুজতাহিদগণের মাঝে কোনো দ্বিমত নেই। এটি সর্বসম্মতভাবে সম্পূর্ণ জায়েজ ও প্রশংসনীয়।

ইবনে তাইমিয়া (রহ.) লিখেছেন, ‘বান্দার জন্য বৈধ রয়েছে সে যেন আরবিতে কিংবা আরবি ছাড়া নিজের মাতৃভাষায় যেকোনো ভাষায় আল্লাহর কাছে দোয়া করে। মহান আল্লাহ দোয়াকারীর মনের উদ্দেশ্য এবং তার অন্তরের গভীর আকুতি জানেন—সে যে ভাষাতেই প্রার্থনা করুক না কেন। আল্লাহ পৃথিবীর কোটি কোটি মানুষের বিচিত্র ভাষার বিচিত্র সব প্রয়োজন একসঙ্গে শোনেন ও বোঝেন।’ (ইমাম ইবনে তাইমিয়া, মাজমুউল ফাতাওয়া, দারুল ওফা, ২২/৪৮৮–৪৮৯)

ইমাম নববি (রহ.) বলেছেন, নামাজের বাইরে যেকোনো ভাষায় দোয়া করা মুস্তাহাব এবং এতে সওয়াবের কোনো ঘাটতি হয় না; কারণ, দোয়ার মূল প্রাণশক্তি হলো অন্তরের একাগ্রতা ও বিনয়। (ইমাম নববি, আল-আজকারুল মুন্তাখাবাাহ মিন কালামি সাইয়িদিল আবরার, পৃষ্ঠা: ৩৯৪), দারুল বাশায়ির, বৈরুত

নামাজে অনারবি ভাষায় দোয়া

নামাজের ভেতরে (বিশেষ করে নফল নামাজের সিজদায় বা শেষ তাশাহুদে দরুদ ও সালামের পর) মাতৃভাষায় দোয়া করা যাবে কি না—এ বিষয়ে ফিকহের চার মাজহাবের মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে।

আরও পড়ুন

হানাফি মাজহাব: হানাফি মাজহাব অনুযায়ী, নামাজের মধ্যে আরবি ছাড়া অন্য কোনো ভাষায় দোয়া করা ‘মাকরুহে তাহরিমি’ (হারামের কাছাকাছি অপছন্দনীয়)। ইবনে আবিদিন শামি (রহ.) উল্লেখ করেছেন, নামাজ পবিত্র একটি আনুষ্ঠানিক ইবাদত, সেখানে কোনো মানুষের সাধারণ ভাষার সংমিশ্রণ ঘটানো চরম অনুচিত।

এমনকি আরবিতেও শুধু সেই দোয়াই করা যাবে, যা কোরআন বা হাদিসে এসেছে, অথবা যা মানুষের সাধারণ কথাবার্তার সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ নয়। (আশ–শামি, রদ্দুল মুহতার আলাদ দুররিল মুখতার, ১/৫২১–৫২৩, দারুল ফিকর, বৈরুত)

শাফেয়ি মাজহাব: ইমাম নববি (রহ.) শাফেয়ি মাজহাবের মত তুলে ধরে লিখেছেন, যে ব্যক্তি আরবি পড়তে সক্ষম, সে যদি নামাজের ভেতর অনারবি ভাষায় নিজ থেকে বানিয়ে কোনো দোয়া করে, তবে তার নামাজ বাতিল বা ভেঙে যাবে।

তোমরা কবুল হওয়ার পূর্ণ বিশ্বাস নিয়ে আল্লাহর কাছে দোয়া করো; এবং জেনে রেখো, নিশ্চয়ই আল্লাহ এমন কোনো অন্তরের দোয়া কবুল করেন না, যা উদাসীন, অসচেতন ও অন্যমনস্ক।
সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ৩৪৭৯

তবে সে যদি আরবিতে একেবারেই অপারগ হয়, শুধু তখনই সে নিজের ভাষায় কোরআন-হাদিসের বর্ণিত মাসনুন দোয়ার অনুবাদ পড়ে নামাজ শেষ করতে পারবে। (ইমাম নববি, আল-মাজমু শারহুল মুহাজ্জাব, ৩/৪৬১–৪৬৫, দারুল ফিকর)

মালেকি ও হাম্বলি মাজহাব: এই দুই মাজহাবের মত একই। ফকিহ ইমাম ইবনে কুদামাহ আল-মাকদিসি (রহ.) উল্লেখ করেছেন, নামাজের ভেতর আরবিতে পারদর্শী ব্যক্তির জন্য অনারবি ভাষায় দোয়া করা নাজায়েজ।

কিন্তু কোনো নওমুসলিম বা অনারবি ব্যক্তি যদি আরবি দোয়া মুখস্থ করতে অপারগ হয়, তবে সে নিজের মাতৃভাষাতেই সিজদায় রবের কাছে প্রার্থনা করতে পারবে এবং তার নামাজ বিশুদ্ধ থাকবে। (ইবনে কুদামাহ, আল-মুগনি, ২/২৩৫–২৩৭, দারু আলমিল কুতুব, রিয়াদ)

শেষ কথা

দোয়ার মূল নির্যাস হলো অন্তরের কান্না ও ভাঙন। মহানবী (সা.) দোয়া কবুলের শর্ত শিখিয়ে বলেছেন, “তোমরা কবুল হওয়ার পূর্ণ বিশ্বাস নিয়ে আল্লাহর কাছে দোয়া করো; এবং জেনে রেখো, নিশ্চয়ই আল্লাহ এমন কোনো অন্তরের দোয়া কবুল করেন না, যা উদাসীন, অসচেতন ও অন্যমনস্ক।” (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ৩৪৭৯)

আরও পড়ুন