কিবলা নির্ণয়ের ৯টি বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি

কাবা, মুসলমানদের কিবলাছবি: ফ্রিপিক

বিশ্বের যেকোনো প্রান্ত থেকে সঠিক কিবলা (মক্কার কাবার দিক) নির্ধারণ করা প্রতিটি মুসলিমের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে দূরপ্রাচ্য বা আমেরিকার মতো দেশগুলোতে কিবলা উত্তর-পূর্ব না কি দক্ষিণ-পূর্ব দিকে হবে, তা নিয়ে অনেক সময় বিতর্কের সৃষ্টি হয়।

এই সমস্যার সমাধানে মিশরীয় গবেষক আবদেল-আজিজ সাল্লাম ত্রিকোণমিতি এবং গাণিতিক সারণী ব্যবহার করে ৯টি বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি উদ্ভাবন করেছেন, যা মিশরের জেনারেল সার্ভে অথরিটি কর্তৃক স্বীকৃত এবং আল-আযহারের ফতোয়া কমিটির মাধ্যমে যাচাইকৃত।

কোরআন মজিদে আল্লাহ তায়ালা নির্দেশ দিয়েছেন, “সুতরাং আপনি আপনার মুখ পবিত্র মসজিদের (কাবা) দিকে ফেরান; তোমরা যেখানেই থাকো না কেন, সেদিকেই মুখ করো।” (সুরা বাকারা, আয়াত: ১৪৪)

এই বিধান পালনে আধুনিক বিজ্ঞান আমাদের নির্ভুল দিকনির্দেশনা দেয়।

কিবলা নির্ণয়ের ৯টি বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি

১. গাণিতিক পদ্ধতি

এই পদ্ধতিতে ‘স্ফেরিক্যাল ট্রাইগোনোমেট্রি’ বা গোলীয় ত্রিকোণমিতির সূত্র এবং ‘হাফ সাইনাস’ আইন প্রয়োগ করা হয়। এই গাণিতিক হিসাব অনুযায়ী:

  • মিশরের আলেকজান্দ্রিয়ায় কিবলা হলো প্রকৃত উত্তর দিক থেকে ঘড়ির কাঁটার দিকে ১৩৫.৫ ডিগ্রি।

  • আমেরিকার সিয়াটলে এটি ১৭.৫ ডিগ্রি (উত্তর-পূর্ব)।

  • হংকংয়ে এটি ২৮৫.১ ডিগ্রি।

  • ঢাকা এটি ২৭৭.৫৭ ডিগ্রি (উত্তর–পশ্চিম)।

আরও পড়ুন

২ ও ৩. ত্রিকোণমিতি ও সারণী পদ্ধতি

প্রাচীন মিশরীয়দের আবিষ্কৃত ত্রিকোণমিতিক সারণী ব্যবহার করে কিবলার কোণ নির্ণয় করা হয়। এটি প্রথম পদ্ধতির ফলাফলকেই গাণিতিক চার্টের মাধ্যমে আরও নিশ্চিত করে।

৪. স্টার স্ফিয়ার বা নক্ষত্র গোলক পদ্ধতি

নাবিকরা সমুদ্রের মাঝখানে দ্রুত কিবলা নির্ণয়ে এটি ব্যবহার করেন। কাবার অক্ষাংশকে (Latitude) নক্ষত্র গোলকের ইনক্লিনেশন প্যারালালের সঙ্গে সামঞ্জস্য করে কাবার সঠিক অবস্থান বের করা হয়।

৫. স্টার ডিস্ক বা নক্ষত্র চাকতি পদ্ধতি

এটি নক্ষত্র গোলকের মতোই, তবে এখানে গোলকের বদলে সমতল নক্ষত্র চাকতি ব্যবহার করে কাবার অক্ষাংশ ও দ্রাঘিমাংশ (Longitude) মিলিয়ে দিক নির্ণয় করা হয়।

৬. ওয়েরিস কোণ

এই পদ্ধতিতে কাবার দ্রাঘিমাংশকে মহাজাগতিক বস্তুর ইনক্লিনেশনের বেস লাইনের সঙ্গে মিলিয়ে কিবলা নির্ধারণ করা হয়।

৭. নেভিগেশনাল ডিভাইস ও স্যাটেলাইট

আধুনিক জিপিএস এবং স্যাটেলাইট ডিভাইসে কাবার স্থানাঙ্ক (Coordinates) একটি 'রেফারেন্স পয়েন্ট' হিসেবে জমা রাখা হয়। ফলে বিশ্বের যেকোনো দুর্গম স্থানে থাকলেও ডিভাইসটি মুহূর্তের মধ্যে কাবার দূরত্ব ও সঠিক দিক জানিয়ে দেয়।

৮. কাবার ওপর সূর্যের অবস্থান 

এটি কিবলা নির্ণয়ের সবচেয়ে সহজ ও প্রাকৃতিক পদ্ধতি। বছরে দুইবার সূর্য সরাসরি কাবার ঠিক মাথার ওপর অবস্থান করে। ওই মুহূর্তে মক্কার বাসিন্দারা কোনো ছায়া দেখতে পান না। ওই নির্দিষ্ট সময়ে বিশ্বের অন্য প্রান্তের মানুষ সূর্যের দিকে মুখ করলে সেটিই হবে কিবলা।

  • ২৮ মে: সৌদি সময় দুপুর ১২টা ১৭ মিনিট ৫২ সেকেন্ডে।

  • ১৬ জুলাই: সৌদি সময় দুপুর ১২টা ২৬ মিনিট ৪০ সেকেন্ডে। (এই সময়ে আফ্রিকা, ইউরোপ এবং এশিয়ার অধিকাংশ মানুষ সূর্য দেখে কিবলা নিশ্চিত করতে পারেন।)

৯. বৈশ্বিক প্রার্থনা মানচিত্র

আমেরিকার ইসলামিক সেন্টার কর্তৃক তৈরি করা এই মানচিত্রে বিশ্বের প্রধান প্রধান শহরগুলোর কিবলা কোণ দেওয়া থাকে, যা সাধারণ মানুষের জন্য কিবলা বোঝা সহজ করে দেয়।

আরও পড়ুন

বাংলাদেশ থেকে কিবলার অবস্থান

বিজ্ঞানসম্মত পদ্ধতিতে (যেখানে সিয়াটলকে উত্তর-পূর্ব দিকে ১৭.৫ ডিগ্রি দেখানো হয়েছে), ঢাকা থেকে কিবলার অবস্থান হবে পশ্চিম-উত্তর-পশ্চিম দিকে। এর কারণগুলো হলো:

  • গাণিতিক মান: ২৭৭.৫৭ ডিগ্রি (প্রায় ২৭৮ ডিগ্রি)।

  • দিক: পশ্চিম দিক (২৭০ ডিগ্রি) থেকে আরও ৭.৫৭ ডিগ্রি উত্তর দিকে।

প্রচলিত অনেক মানচিত্রে মক্কাকে বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমে দেখা গেলেও, পৃথিবীর গোলকীয় আকৃতির কারণে ক্ষুদ্রতম দূরত্ব বা ‘গ্রেট সার্কেল’ পদ্ধতি ব্যবহার করলে এটি উত্তর-পশ্চিমমুখী হয়। ঠিক যেমন আপনার দেওয়া তথ্যে সিয়াটলের ক্ষেত্রে কিবলা ১৭.৫ ডিগ্রি বা উত্তর-পূর্ব দিকে দেখাচ্ছে।

সহজভাবে বুঝতে, আপনি যদি একটি কম্পাস নিয়ে উত্তর দিককে ০ ডিগ্রি ধরেন এবং ঘড়ির কাঁটার দিকে ঘুরে ২৭৭.৫৭ ডিগ্রিতে থামেন, তবে সেটিই হবে এই বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে নির্ধারিত কিবলার দিক।

কিবলা নির্ধারণের ফিকহি নীতিমালা

চার মাজহাবের ফিকহ অনুযায়ী কিবলা নির্ধারণের দুটি প্রধান স্তর রয়েছে:

  • মক্কাবাসীদের জন্য: যারা কাবার সামনে বা কাছে আছেন, তাদের জন্য কাবার মূল অবকাঠামো বা তার বরাবর সোজাসুজি (ওপর বা নিচে) মুখ করা বাধ্যতামূলক।

  • দূরবর্তীদের জন্য: যারা মক্কা থেকে দূরে আছেন, তাদের জন্য কাবার সঠিক ‘দিক’ বজায় রাখাই যথেষ্ট। ডানে বা বামে সামান্য বিচ্যুতি হলেও নামাজ নষ্ট হয় না, যতক্ষণ পর্যন্ত তারা কাবার সাধারণ অভিমুখে থাকেন।

প্রযুক্তি ও বিজ্ঞানের উৎকর্ষ আমাদের ইবাদতকে আরও নিখুঁত করার সুযোগ করে দিয়েছে। ৯টি পদ্ধতির যেকোনোটি ব্যবহার করে আমরা কিবলা সম্পর্কে নিশ্চিত হতে পারি। বিশেষ করে বছরে দুইবার সূর্যের মাধ্যমে কিবলা যাচাই করার সুযোগটি প্রতিটি মসজিদের জন্য দিক সংশোধনের একটি চমৎকার সুযোগ।

সূত্র: অ্যাবাউট ইসলাম ডট নেট

আরও পড়ুন