এই রমজান কীভাবে জীবনের শ্রেষ্ঠ রমজান হয়ে উঠবে
রমজান কেবল ক্ষুধার্ত থাকার নাম নয়, বরং এটি স্রষ্টার সঙ্গে এক গভীর মিতালি এবং নিজের আত্মাকে নতুন করে চেনার এক অনন্য সুযোগ।
রমজান মাস আমাদের জন্য মহান আল্লাহর এক বিশেষ নেয়ামত। নবীজি (সা.) এই মাসের মাহাত্ম্য বর্ণনা করে বলেছেন, “যে ব্যক্তি ঈমানের সঙ্গে সওয়াবের আশায় রমজানের রোজা পালন করবে, তার পূর্ববর্তী সমস্ত গুনাহ ক্ষমা করে দেওয়া হবে।” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১৯০১)
তাই প্রথম রমজানকে কেবল একটি ধর্মীয় বিধান হিসেবে না দেখে একে আত্মিক পুনর্জাগরণের বসন্ত হিসেবে গ্রহণ করা উচিত।
১. কৃতজ্ঞতা ও আত্মিক শুদ্ধি
রমজানের মূল উদ্দেশ্য কেবল পানাহার বর্জন নয়, বরং হৃদয়ে আল্লাহর সচেতনতা বা ‘তাকওয়া’ জাগ্রত করা।
পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, “রমজান মাস, যাতে কোরআন অবতীর্ণ হয়েছে মানুষের হেদায়েতের জন্য এবং হেদায়েতের স্পষ্ট নিদর্শন ও সত্য-মিথ্যা পার্থক্যের মানদণ্ড হিসেবে... আর যাতে তোমরা আল্লাহর মহিমা ঘোষণা করো এজন্য যে, তিনি তোমাদের পথপ্রদর্শন করেছেন এবং যাতে তোমরা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করো।” (সুরা বাকারা, আয়াত: ১৮৫)
এই আয়াতে ‘কৃতজ্ঞতা‘ শব্দটির ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছে। মুসলমানের জন্য রমজান হলো সেই কৃতজ্ঞতা প্রকাশের শ্রেষ্ঠ সময়।
২. আত্মার খোরাক বনাম দেহের খোরাক
রমজান মাসে আমরা আমাদের দেহকে উপোস রাখি যাতে আত্মাকে পুষ্ট করা যায়। সারা বছর আমরা দেহের চাহিদা মেটাতে ব্যস্ত থাকি, কিন্তু এই এক মাস আমরা গুরুত্ব দেই রুহ বা আত্মার ওপর।
‘তারাবিহ’ ও ‘রুহ’ শব্দ দুটির মধ্যে এক গভীর সংযোগ রয়েছে। রুহ বা আত্মা যেমন পার্থিব কোনো উপাদান দিয়ে তৈরি নয়, এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে আসা এক স্বর্গীয় নূর; তেমনি এই আত্মার খোরাকও পার্থিব কোনো খাদ্য হতে পারে না। এর একমাত্র খোরাক হলো আল্লাহর কালাম বা কোরআন।
৩. সামাজিক সংহতি
অনেকের জন্য তারাবিহ নামাজ একটু দীর্ঘ মনে হতে পারে, কিন্তু এটিই হলো কোরআনের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ার শ্রেষ্ঠ সময়। মসজিদে জামাতের সঙ্গে নামাজ পড়লে অন্য মুসলিম ভাই বা বোনদের সঙ্গে একটি ভ্রাতৃত্বের বন্ধন তৈরি হয়, যা একাকী জীবনযাপনের একঘেয়েমি দূর করে।
নবীজি (সা.) বলেছেন, “রমজান হলো এমন এক মাস, যার শুরু হলো রহমত, মধ্যভাগ মাগফিরাত এবং শেষাংশ জাহান্নাম থেকে মুক্তি।” (মিশকাতুল মাসাবিহ, হাদিস: ১৯৬৩)
৪. রমজানের কিছু ব্যবহারিক টিপস
রমজানকে সহজ ও ফলপ্রসূ করতে নিচের বিষয়গুলো লক্ষ্য রাখা যেতে পারে:
ধীরে শুরু করা: প্রথম দিন থেকেই সব আমল নিখুঁতভাবে করার চাপ না নিয়ে ধীরে ধীরে নিজেকে মানিয়ে নিন। মনে রাখবেন, আল্লাহ আপনার নিয়ত দেখেন।
সাহরি ও ইফতারের গুরুত্ব: সাহরি খাওয়া সুন্নাত। রাসুল (সা.) বলেছেন, “তোমরা সাহরি খাও, কারণ সাহরিতে বরকত রয়েছে।” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১৯২৩)
কোরআনের সঙ্গে সময় কাটানো: প্রতিদিন অন্তত ১০-১৫ মিনিট অর্থসহ কোরআন পড়ুন।
অপ্রয়োজনীয় কথা ও কাজ ত্যাগ: রোজা রেখে মিথ্যা বলা বা গিবত করা থেকে বিরত থাকুন। নবীজি (সা.) সতর্ক করেছেন যে, যে ব্যক্তি মিথ্যা কথা ও কাজ ত্যাগ করল না, তার পানাহার বর্জনে আল্লাহর কোনো প্রয়োজন নেই। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১৯০৩)
৫. লাইলাতুল কদর ও শেষ দশ দিন
রমজানের শেষ দশ দিন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এই দশ দিনের বিজোড় রাতগুলোর মধ্যেই লুকিয়ে আছে ‘লাইলাতুল কদর’ বা মহিমান্বিত রাত। কোরআন বলছে, “কদরের রাত হাজার মাসের চেয়েও শ্রেষ্ঠ।” (সুরা কদর, আয়াত: ৩)
এই রাতে ইবাদত করা মানে ৮৩ বছর ৪ মাস ইবাদত করার সমান সওয়াব পাওয়া। একজন নতুন মুসলিমের জন্য এটি তার জীবনের শ্রেষ্ঠ সুযোগ হতে পারে নিজের জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার।
রমজান কেবল একটি উপবাসের মাস নয়, এটি ধৈর্যের মাস। নবীজি (সা.) রমজানকে ‘ধৈর্যের মাস’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। (সুনানে নাসায়ি, হাদিস: ২৪০৮)