কোরআন আল্লাহ–তাআলার পবিত্র কালাম। এর শব্দ ও বাক্যে রয়েছে আসমানি নুরের দ্যুতি এবং হৃদয় স্পর্শকারী এক অপার্থিব মাধুর্য। একজন মুমিন যখন কোরআনের তিলাওয়াত শোনেন, তখন তাঁর অন্তর ইমানের আলোয় উজ্জ্বল হয়ে ওঠে।
মহান আল্লাহ বলেন, ‘মুমিন তো তারাই, যাদের সামনে আল্লাহর নাম উচ্চারিত হলে তাদের অন্তর কেঁপে ওঠে এবং যখন তাদের সামনে তাঁর আয়াতসমূহ তিলাওয়াত করা হয়, তখন তা তাদের ইমান বৃদ্ধি করে।’ (সুরা আনফাল, আয়াত: ২-৪)
কোরআন মুমিনের অন্তরকে আলোয় ভরিয়ে দেয়। তবে এর প্রভাব মুমিনের মাঝেই সীমাবদ্ধ নয়। এর ভাষার সৌন্দর্য, বাণীর গভীরতা এবং অলৌকিক আবেদন মুশরিক-কাফিরের হৃদয়েও নাড়া দিয়েছে।
মহানবী (সা.) যখন কোরআনের দাওয়াত দিতেন, তখন মক্কার কাফেররা এর বিরোধিতায় সর্বশক্তি নিয়োগ করত। আল্লাহ–তাআলা তাদের কথা উল্লেখ করেছেন, ‘কাফিররা বলে, এই কোরআন শুনো না এবং এর পাঠের সময় হট্টগোল সৃষ্টি করো, যাতে তোমরা বিজয়ী হতে পারো।’ (সুরা হা-মীম সাজদা, আয়াত: ২৬)
দিনের বেলায় তারা মানুষকে কোরআন থেকে দূরে রাখার চেষ্টা করত, অথচ রাতের অন্ধকারে নিজেরাই গোপনে কোরআন শুনতে আসত। মক্কার তিন প্রভাবশালী নেতা একাধিক রাত নবীজির (সা.) ঘরের বাইরে দাঁড়িয়ে কোরআন শুনেছে।
দিনের বেলায় তারা মানুষকে কোরআন থেকে দূরে রাখার চেষ্টা করত, অথচ রাতের অন্ধকারে নিজেরাই গোপনে কোরআন শুনতে আসত। আবু জেহেল, আবু সুফিয়ান ও আখনাস ইবনে শারিক—মক্কার তিন প্রভাবশালী নেতা একাধিক রাত নবীজির (সা.) ঘরের বাইরে দাঁড়িয়ে কোরআন শুনেছে।
প্রত্যেকে ভাবত, সে একাই এসেছে। ভোর হলে তারা একে অপরের মুখোমুখি হয়ে লজ্জিত হতো এবং আর না আসার প্রতিশ্রুতি দিত। কিন্তু কোরআনের আকর্ষণ তাদের সেই প্রতিশ্রুতি বারবার ভঙ্গ করতে বাধ্য করত। (সিরাতে ইবনে হিশাম ১/৩১৫; দালায়েলুন নুবুওয়াহ, বায়হাকি ২/২০৬)
এ ঘটনা প্রমাণ করে, কোরআনের মাধুর্য এমন এক শক্তি, যা বিরোধীর অন্তরেও আলোড়ন তোলে। উতবা ইবনে রাবিআর ঘটনাও এ সত্যের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
মক্কার নেতারা তাকে নবীজির কাছে পাঠিয়েছিল বিভিন্ন প্রলোভন দেখানোর জন্য। ধন-সম্পদ, নেতৃত্ব ও রাজত্ব—সবকিছুর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল।
নবীজি নিজের পক্ষ থেকে কোনো উত্তর না দিয়ে সুরা হা-মীম সাজদার আয়াত পাঠ করেন। আয়াতগুলো শুনে উতবার চেহারা বদলে যায়।
ফিরে গিয়ে সে স্বীকার করে, ‘আল্লাহর কসম, আমি এমন কথা কখনো শুনিনি। এটি কবিতা নয়, জাদু নয়, গণকের বাণীও নয়। এতে এক মহাসংবাদ রয়েছে।’ (সিরাতে ইবনে হিশাম ১/২৯৩)
তারা ইমান আনতে পারেনি। কারণ, কোরআনের সত্যতা বুঝে নেওয়া আর তা গ্রহণ করা এক বিষয় নয়। অহংকার, জেদ, জাত্যভিমান, ভোগ-লালসা এবং হঠকারিতা তাদের জন্য হিদায়াতের পথে অন্তরায় হয়েছিল।
ওয়ালিদ ইবনে মুগিরাও কোরআনের সৌন্দর্য অস্বীকার করতে পারেনি। কোরআন শুনে সে বলেছিল, ‘আল্লাহর কসম, এর কথায় রয়েছে মাধুর্য। এটি ফলভারে নত শাখাবিশিষ্ট বৃক্ষের মতো। এর ওপরের অংশ উঁচু এবং এর ওপর কিছুই প্রাধান্য লাভ করতে পারে না।’ (দালায়েলুন নুবুওয়াহ ২/১৯৮)
তবু তারা ইমান আনতে পারেনি। কারণ, কোরআনের সত্যতা বুঝে নেওয়া আর তা গ্রহণ করা এক বিষয় নয়। অহংকার, জেদ, জাত্যভিমান, ভোগ-লালসা এবং হঠকারিতা তাদের জন্য হিদায়াতের পথে অন্তরায় হয়েছিল।
এ কারণেই আল্লাহ–তাআলা বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই এতে উপদেশ রয়েছে তার জন্য, যার উন্মুক্ত হৃদয় আছে অথবা যে মনোযোগ দিয়ে শ্রবণ করে।’ (সুরা ক্বাফ, আয়াত: ৩৭)
কোরআনের মোজেজা এখানেই। এর শব্দ হৃদয়কে আন্দোলিত করে। এর বাণী বিবেককে জাগ্রত করে এবং এর আলো উন্মুক্ত অন্তরকে হেদায়াতের পথে নিয়ে যায়। যে ব্যক্তি অহংকারের আবরণ সরিয়ে কোরআনের কাছে আসে, কোরআন তাকে আলোর পথে পরিচালিত করে।