ইসলামের ‘জুহ্‌দ’ নাকি আধুনিক ‘মিনিমালিজম’: কোনটা বেশি সুন্দর

ছবি: পেক্সেলস

আজকের দুনিয়ায় আমরা এমন এক সময় পার করছি, যেখানে চারপাশে শুধু অর্জনের দৌড়, কেনাকাটার চাপ আর ব্যস্ততার ভিড়। অনেক সময় মনে হয়, এত কিছুর মাঝেও আমাদের ভেতরে এক ধরনের শূন্যতা থেকেই যাচ্ছে। মাঝে মাঝে মনে হয় আমরা যত বেশি পাচ্ছি, তত বেশি যেন শান্তিটা হারাচ্ছি।

এই অবস্থা নিয়েই ‘মিনিমালিস্টিক জীবনযাপন’ ধারণাটি বিশ্বজুড়ে আলোচনায় এসেছে। তবে ইসলামের দৃষ্টিতে এই ধারণা নতুন নয়; বরং এটি বহু আগেই ‘জুহ্‌দ’, ‘কানাআত’ এবং ‘ইসরাফ’ (অপচয়) পরিহার নীতির মাধ্যমে ব্যাখ্যা করা হয়েছে।

মিনিমালিজম বলতে কী বুঝি

সহজভাবে বললে, এটি এমন একটি জীবনযাপন, যেখানে মানুষ অপ্রয়োজনীয় জিনিস, চিন্তা ও ভোগবিলাস কমিয়ে এনে প্রয়োজনীয় এবং অর্থবহ বিষয়গুলোর ওপর বেশি মনোযোগ দেয়। এর মূল দর্শন হলো কমের মধ্যে বেশি শান্তি ও সন্তুষ্টি খুঁজে পাওয়া।

তোমরা খাও ও পান করো, কিন্তু অপচয় করো না। নিশ্চয়ই তিনি অপচয়কারীদের পছন্দ করেন না।
সুরা আরাফ, আয়াত: ৩১

তবে ইসলাম এই ধারণাকে শুধু বস্তুগত সীমাবদ্ধতায় সীমিত রাখে না; বরং হৃদয়ের পরিশুদ্ধতা, নিয়তের বিশুদ্ধতা এবং আল্লাহর প্রতি নির্ভরশীলতার সঙ্গে যুক্ত করে।

ইসলামে ভারসাম্যের সৌন্দর্য

আল্লাহ-তাআলা বলেন, “...তোমরা খাও ও পান করো, কিন্তু অপচয় করো না। নিশ্চয়ই তিনি অপচয়কারীদের পছন্দ করেন না।” (সুরা আরাফ, আয়াত: ৩১)

আরও পড়ুন

এই আয়াত আমাদের জন্য শুধু একটি নিয়ম নয়, বরং একটি জীবনদর্শন। জীবন উপভোগ করা নিষেধ নয়, কিন্তু এর সীমারেখা ভুলে যাওয়া নিষেধ। আল্লাহ আরও বলেন, “নিশ্চয়ই অপচয়কারীরা শয়তানের ভাই। আর শয়তান তার রবের প্রতি খুবই অকৃতজ্ঞ।” (সুরা ইসরা, আয়াত: ২৭)

একজন মানুষ যখন অতিরিক্ত ভোগ-বিলাসে ডুবে যায়, তখন ধীরে ধীরে তার ভেতরের শান্তিটাও হারিয়ে যেতে শুরু করে। কারণ প্রাচুর্য আর বিলাসিতার চাকচিক্যে শয়তান তার অন্তর দখল করে নেয়।

ইসলামে ‘জুহ্‌দ’ বলতে দুনিয়াকে সম্পূর্ণ ত্যাগ করা বোঝায় না; বরং দুনিয়ার প্রতি অতিরিক্ত আসক্তি থেকে মুক্ত থাকা বোঝায়। একইভাবে ‘কানাআত’ হলো নিজের যা আছে তাতেই সন্তুষ্ট থাকা

প্রকৃত ধনী কে

ইসলাম দুনিয়াকে সম্পূর্ণভাবে ত্যাগ করতে বলেনি, আবার দুনিয়াকে জীবনের লক্ষ্য বানাতেও নিষেধ করেছে। রাসুল (সা.) দুনিয়ায় সহজ জীবনযাপন করতেন এবং সাহাবাদেরও অপ্রয়োজনীয় বিলাসিতা থেকে দূরে থাকতে উৎসাহিত করেছেন। তিনি বলেছেন, “প্রকৃত ধনী সেই ব্যক্তি, যার আত্মা সন্তুষ্ট।” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬৪৪৬)

ইসলামে জুহ্‌দ ও কানাআত

ইসলামে মিনিমালিস্টিক চিন্তার সবচেয়ে গভীর রূপ হলো ‘জুহ্‌দ’; মানে দুনিয়ার প্রতি অনাসক্তি। ইসলামে ‘জুহ্‌দ’ বলতে দুনিয়াকে সম্পূর্ণ ত্যাগ করা বোঝায় না; বরং দুনিয়ার প্রতি অতিরিক্ত আসক্তি থেকে মুক্ত থাকা বোঝায়।

একইভাবে ‘কানাআত’ হলো নিজের যা আছে তাতেই সন্তুষ্ট থাকা এবং অপ্রয়োজনীয় চাহিদা থেকে নিজেকে সংযত রাখা।

আরও পড়ুন

আলেমদের চোখে জুহ্‌দ

জুহ্‌দ সংক্রান্ত বিষয়ে সালাফগণের অনেক বক্তব্য ও ব্যাখ্যা পাওয়া যায়। এর সারমর্ম হলো—হারাম ত্যাগ করা, অপ্রয়োজনীয় জিনিসে আসক্ত না হওয়া এবং হৃদয়কে দুনিয়ার দাসত্ব থেকে মুক্ত রাখা।

  • হাসান বাসরি: “জুহ্‌দ দুনিয়া ত্যাগ করা নয়, বরং আল্লাহর কাছে যা আছে তার ওপর নির্ভর করা।” (আবু নুআইম আল-আসফাহানি, হিলইয়াতুল আউলিয়া, ২/১৩৪, দারুল কিতাবিল আরাবি, বৈরুত, ১৯৭৪)

  • সুফিয়ান সাওরি: “জুহ্‌দ হলো দুনিয়া তোমার হৃদয়ে প্রবেশ না করা।” (ইমাম জাহাবি, সিয়ারু আলামিন নুবালা, ৭/২৪৫, মুয়াসসাসাতুর রিসালাহ, বৈরুত, ১৯৮৫)

  • আহমাদ ইবনে হাম্বল: “জুহ্‌দ হলো আশা কমিয়ে দেওয়া এবং দুনিয়ার ওপর নির্ভরতা ত্যাগ করা।” (কিতাবুয জুহদ, ১/১৮, দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যাহ, বৈরুত, ১৯৯৯)

  • ইবনে তাইমিয়া: “জুহ্‌দ হলো দুনিয়াকে হৃদয়ের লক্ষ্য না বানানো।” (মাজমুউল ফাতাওয়া, ১০/৫১১, দারুল ওফা, কায়রো, ২০০৫)

সবকিছুর মাঝেও সুন্দর, সহজ ভারসাম্য ধরে রাখতে হবে। ইসলামের দৃষ্টিতে মিনিমালিস্টিক জীবন মানে কৃপণতা নয়, বরং একটি ভারসাম্যপূর্ণ ও সচেতন জীবনধারা।

ইসলামে মিনিমালিজমের ৪ মূল নীতি

১. প্রয়োজনকে অগ্রাধিকার দেওয়া: ইসলাম আমাদের শেখায় হালাল ও প্রয়োজনীয় বিষয়গুলো গ্রহণ করতে, অপ্রয়োজনীয় ভোগবিলাসিতাকে নয়।

২. অপচয় পরিহার করা: খাবার, সম্পদ, সময়—সবকিছুর অপচয়ই ইসলামে নিষিদ্ধ।

৩. অল্পেতুষ্টি: অল্প জিনিস থাকলেও সেই অল্পে সন্তুষ্ট থাকাও একটি বড় ইবাদতের অংশ।

৪. হৃদয়ের স্বাধীনতা: সম্পদের প্রতি অতিরিক্ত আসক্তি মানুষকে মানসিকভাবে সম্পদের দাস বানিয়ে ফেলে, যা ইসলাম সমর্থন করে না।

ইসলাম আমাদের বলে না যে সবকিছু ছেড়ে দিতে হবে। বরং শেখায় সবকিছুর মাঝেও সুন্দর, সহজ ভারসাম্য ধরে রাখতে হবে। ইসলামের দৃষ্টিতে মিনিমালিস্টিক জীবন মানে কৃপণতা নয়, বরং একটি ভারসাম্যপূর্ণ ও সচেতন জীবনধারা।

এটি মানুষকে শেখায় কীভাবে দুনিয়ার ভিড়ে হারিয়ে না গিয়ে নিজের হৃদয়, সময় এবং সম্পদকে সঠিকভাবে ব্যবহার করা যায়। কারণ শেষ পর্যন্ত, একগাদা বিলাসী জিনিসের ভিড় থেকে শান্তি আসে না, শান্তি আসে এমন এক হৃদয় থেকে; যেটা আল্লাহ-তাআলার স্মরণে ব্যস্ত থাকে।

[email protected] 

  • ইসমত আরা: শিক্ষক ও লেখক

আরও পড়ুন