আল্লাহর নৈকট্য পেতে মুমিন যে ১০ কাজ করেন

প্রথম আলোকে নির্ভরযোগ্য সূত্র হিসেবে পেতে হলেএখানে ক্লিক করুন

মানুষ যাকে ভালোবাসে, তার জন্য সময় বের করে। তার গুরুত্ব উপলব্ধি করে, তার কথা পালনে সচেষ্ট হয়। আল্লাহ–তাআলার নৈকট্য লাভের বিষয়টি এমনই।

আল্লাহর পরিচয়, তাঁর অসীম অনুগ্রহ জানা থাকলে অন্তরে তাঁর প্রতি আগ্রহ বাড়ে। ফলে বান্দার সঙ্গে তার রবের সম্পর্ক তৈরি হয়।

এই সম্পর্ক যত গভীর হয়, বান্দা ততই আল্লাহর নিকটবর্তী হওয়ার সুযোগ পায়। সুতরাং আল্লাহর নৈকট্য লাভের জন্য মুমিনের জীবনে এই ১০টি বিষয়ের চর্চা করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

১. আল্লাহর পরিচয় ও মহত্ত্ব উপলব্ধি করা

ইবাদতের প্রতি ভালোবাসা তৈরির অন্যতম উপায় হলো আল্লাহকে চেনা। তাঁর অসীম ক্ষমতা, দয়া, অনুগ্রহ ও মহত্ত্ব সম্পর্কে যত বেশি জানা যায়, অন্তরে তাঁর প্রতি ভালোবাসা ও আনুগত্য তত গভীর হয়।

মানুষ যখন উপলব্ধি করে, তার জীবন, জীবিকা, সুস্থতা ও প্রতিটি নিশ্বাস আল্লাহর দান, তখন তাঁর সামনে সিজদাবনত হতে মন আগ্রহী হয়।

সৃষ্টিজগতের নিদর্শন নিয়ে চিন্তা করা, আল্লাহর গুণাবলি সম্পর্কে জানা এবং তাঁর অনুগ্রহ স্মরণ করা অভ্যাসে পরিণত হলে ইবাদত কেবল আনুষ্ঠানিকতা না থেকে ভালোবাসা ও কৃতজ্ঞতার প্রকাশ হয়ে উঠবে।

সৃষ্টিজগতের নিদর্শন নিয়ে চিন্তা করা, আল্লাহর গুণাবলি সম্পর্কে জানা এবং তাঁর অনুগ্রহ স্মরণ করা অভ্যাসে পরিণত হলে ইবাদত কেবল আনুষ্ঠানিকতা না থেকে ভালোবাসা ও কৃতজ্ঞতার প্রকাশ হয়ে উঠবে।

আল্লাহ–তাআলা বলেন, ‘নিশ্চয়ই আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর সৃষ্টিতে এবং রাত ও দিনের পরিবর্তনে বোধশক্তিসম্পন্ন ব্যক্তিদের জন্য নিদর্শন রয়েছে।’ (সুরা আলে ইমরান, আয়াত: ১৯০)

২. ইবাদতের গুরুত্ব ও ফজিলত জানা

যে কাজের মর্যাদা ও প্রতিদান সম্পর্কে মানুষ জানে, সে কাজের প্রতি তার আগ্রহও বাড়ে। নামাজ, রোজা, কোরআন পাঠ, জিকির ও সদকার ফজিলত সম্পর্কে জানা থাকলে তা মুমিনকে ইবাদতে উৎসাহিত করবে এবং আমল করার ক্ষেত্রে নতুন উদ্যম তৈরি হবে।

রমজানের ফজিলত সম্পর্কে রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি ইমানের সঙ্গে এবং সওয়াবের আশায় রমজানের রোজা রাখে, তার পূর্ববর্তী পাপ ক্ষমা করে দেওয়া হয়।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৩৮)

আরও পড়ুন

৩. নামাজে যত্নবান হওয়া

মুমিনের জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত হলো নামাজ। এর মাধ্যমে বান্দা প্রতিদিন পাঁচবার আল্লাহর সামনে উপস্থিত হওয়ার সুযোগ পায়।

যে ব্যক্তি নামাজের প্রতি যত্নবান, তার ইবাদতজীবন সুশৃঙ্খল। তাই নামাজকে দিনের অন্যান্য কাজের ফাঁকে নয়, বরং দিনের কাজগুলোকে নামাজের সময়ের সঙ্গে মিলিয়ে সাজানোর অভ্যাস করতে হবে।

আল্লাহ–তাআলা বলেন, ‘নিশ্চয়ই মুমিনগণ সফলকাম, যারা তাদের নামাজে আন্তরিকভাবে বিনীত।’ (সুরা মুমিনুন, আয়াত: ১-২)

৪. কোরআনের সঙ্গে সম্পর্ক রাখা

কোরআন আল্লাহ–তাআলার কালাম। এটি মুমিনের জীবনে সর্বোত্তম পথনির্দেশক। এর তিলাওয়াতে ইমান বৃদ্ধি পায়, অন্তর প্রশান্ত হয়।

আল্লাহ–তাআলার নৈকট্য লাভের জন্য আমাদের উচিত নিয়মিত কোরআন পাঠ করা, যেন কোরআন থেকে আমাদের দূরত্ব তৈরি না হয়।

আল্লাহ বলেন, ‘মুমিন তো তারাই, (যাদের সামনে) আল্লাহকে স্মরণ করা হলে তাদের হৃদয় ভীত হয়, যখন তাদের সামনে তাঁর আয়াতসমূহ পড়া হয়, তখন তা তাদের ইমানের উন্নতি সাধন করে এবং তারা তাদের প্রতিপালকের ওপর ভরসা করে।’ (সুরা আনফাল, আয়াত: ২)

আতর বিক্রেতার কাছ থেকে সুগন্ধি পাওয়া যায়, আর কামারের হাপর কাপড় জ্বালিয়ে দেয় কিংবা তার কাছ থেকে শুধু দুর্গন্ধই পাওয়া যায়।
সহিহ বুখারি, হাদিস ৫৫৩৪

৫. জিকির ও দোয়ায় অভ্যস্ত হওয়া

আল্লাহর স্মরণ অন্তরকে জীবিত রাখে। দুনিয়ার নানা ব্যস্ততার মধ্যে মানুষ যখন আল্লাহকে স্মরণ করে, তখন তার অন্তরে প্রশান্তি আসে।

সকাল-সন্ধ্যার জিকির, নামাজের পর তাসবিহ-তাহলিল এবং বিভিন্ন সময়ে দোয়া করার অভ্যাস মুমিনের জীবনকে আল্লাহমুখী করে তোলে। 

তাই কাজের ফাঁকে, চলার পথে কিংবা অবসর সময়ে জিকিরের অভ্যাস করা, যাতে প্রতিদিনের জীবনে আল্লাহর স্মরণ অব্যাহত থাকে।

আল্লাহ–তাআলা বলেন, ‘জেনে রেখো, আল্লাহর স্মরণেই অন্তর প্রশান্ত হয়।’ (সুরা রাদ, আয়াত: ২৮)

রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি তার রবের জিকির করে আর যে ব্যক্তি জিকির করে না, তাদের দৃষ্টান্ত জীবিত ও মৃতের মতো।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬৪০৭)

৬. পুণ্যবান মানুষের সাহচর্য গ্রহণ করা

মানুষের চিন্তা, আচরণ ও অভ্যাস গঠনে সঙ্গের প্রভাব অনেক বেশি। ভালো মানুষের সাহচর্য ভালো কাজের প্রতি আগ্রহ তৈরি হয়। তাদের ইবাদত, আচার-আচরণ ও জীবনযাপন অন্যদেরও অনুপ্রাণিত করে।

তাই একজন মুমিনের উচিত এমন মানুষের সাহচর্য গ্রহণ করা, যার সঙ্গে থাকলে আল্লাহর কথা স্মরণ হয়, ইবাদতে উৎসাহ পাওয়া যায় এবং পাপ থেকে বেঁচে থাকার প্রেরণা তৈরি হয়।

রাসুল (সা.) সৎ সঙ্গী ও অসৎ সঙ্গীর দৃষ্টান্ত দিয়েছেন আতর বিক্রেতা ও কামারের হাপরের সঙ্গে। বলেছেন, ‘আতর বিক্রেতার কাছ থেকে সুগন্ধি পাওয়া যায়, আর কামারের হাপর কাপড় জ্বালিয়ে দেয় কিংবা তার কাছ থেকে শুধু দুর্গন্ধই পাওয়া যায়।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস ৫৫৩৪)

আরও পড়ুন

৭. পাপ থেকে দূরে থাকা

পাপ মানুষের অন্তরকে কলুষিত করে এবং ইবাদতের প্রতি অনীহা তৈরি করে। বারবার পাপের কাজে লিপ্ত হলে আস্তে আস্তে অন্তরের সংবেদনশীলতা কমে যায়। ফলে নেক আমলের প্রতি আগ্রহও হ্রাস পেতে থাকে।

তাই দৃষ্টিকে সংযত রাখা, মিথ্যা ও পরনিন্দা থেকে বেঁচে থাকা, হারাম উপার্জন পরিহার করা এবং যাবতীয় পাপাচার থেকে দূরে থাকার চেষ্টা করতে হবে।

কোনো ভুল হয়ে গেলে দ্রুত তওবা করতে হবে। কারণ, আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হওয়ার সুযোগ নেই। (সুরা জুমার, আয়াত: ৫৩)

৮. নফল ইবাদতের অভ্যাস করা

ফরজ ইবাদত মুমিনের প্রধান দায়িত্ব। এর পাশাপাশি নফল ইবাদত আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। তাহাজ্জুদ, চাশতের নামাজ, নফল রোজা, সদকা ও অন্যান্য নেক আমলের মাধ্যমে বান্দা আল্লাহর আরও কাছে পৌঁছাতে পারে।

তাই ফরজ ইবাদতের পাশাপাশি সামর্থ্য অনুযায়ী নফল ইবাদতের অভ্যাস গড়তে হবে।

হাদিসে কুদসিতে আল্লাহ–তাআলা বলেন, ‘আমার বান্দা নফল ইবাদতের মাধ্যমে আমার নৈকট্য অর্জন করতে থাকে, অবশেষে আমি তাকে ভালোবেসে ফেলি।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬৫০২)

প্রতিদিন নিজের আমল পর্যালোচনা করলে ভুলত্রুটি চিহ্নিত করা যায় এবং পরবর্তী দিনের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করা যায়। আজ কতটুকু ইবাদত হলো, কোন কাজে অবহেলা হয়েছে, কোন কাজটি করা উচিত হয়নি—এভাবে চিন্তা করা প্রয়োজন।

৯. মৃত্যু ও পরকালের  কথা স্মরণ করা

দুনিয়ার মোহ মানুষকে আখিরাতের কথা ভুলিয়ে দেয়। অথচ মৃত্যু জীবনের অবধারিত সত্য। একদিন সব ব্যস্ততা, আয়োজন ও অর্জন পেছনে ফেলে মানুষকে আল্লাহর কাছে ফিরে যেতে হবে।

এই উপলব্ধি মানুষকে ইবাদতের প্রতি সচেতন করে। ফলে আল্লাহ–তাআলার নৈকট্য লাভের পথ সুগম হয়।

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা স্বাদ বিনষ্টকারী বিষয়কে বেশি বেশি স্মরণ করো। অর্থাৎ মৃত্যুকে।’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ২৩০৭)

১০. আমলের হিসাব নেওয়া

আত্মসমালোচনা মানুষের জীবন সংশোধনের অন্যতম উপায়। প্রতিদিন নিজের আমল পর্যালোচনা করলে ভুলত্রুটি চিহ্নিত করা যায় এবং পরবর্তী দিনের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করা যায়। আজ কতটুকু ইবাদত হলো, কোন কাজে অবহেলা হয়েছে, কোন কাজটি করা উচিত হয়নি—এভাবে চিন্তা করা প্রয়োজন।

আল্লাহ–তাআলা বলেন, ‘হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহকে ভয় করো এবং প্রত্যেকেই ভেবে দেখুক আগামীকালের জন্য সে কী অগ্রিম পাঠিয়েছে এবং আল্লাহকে ভয় করো। নিশ্চয়ই তোমরা যা করো সে সম্পর্কে আল্লাহ পুরোপুরি অবগত।’ (সুরা হাশর, আয়াত: ১৮)

শেষ কথা

আল্লাহর নৈকট্য অর্জন করা খুবই সহজ। এর জন্য প্রয়োজন আল্লাহর প্রতি ভালোবাসা, তাঁর ভয়, আখিরাতের চিন্তা এবং নিয়মিত আমলের চর্চা।

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আল্লাহর কাছে সবচেয়ে প্রিয় আমল হচ্ছে, যা নিয়মিত করা হয়, যদিও তা অল্প হয়।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬৪৬৪, সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৭৮৩)

  • মাহমুদ হাসান ফাহিম : আলেম ও লেখক

আরও পড়ুন