কোরবানির গোশত আত্মীয়স্বজন, গরিব ও অসহায়দের হাতে তুলে দেওয়া অত্যন্ত সওয়াব ও ফজিলতের কাজ। সমাজে যে পদ্ধতিতে বণ্টন করলে প্রকৃত গরিব ও দুস্থ মানুষের অধিকার নিশ্চিত হবে, সেভাবেই সুষম বণ্টনের উদ্যোগ নেওয়া উচিত।
কোরবানির গোশত সম্পর্কে মহান আল্লাহ স্পষ্ট নির্দেশনা দিয়ে বলেছেন, ‘এরপর তোমরা তা থেকে আহার করো এবং দুস্থ-অভাবগ্রস্তকে আহার করাও।’ (সুরা হজ, আয়াত: ২৮)
আল্লাহ আরও বলেন, ‘এরপর তা থেকে তোমরা আহার করো এবং আহার করাও তাকে, যে অভাব থাকা সত্ত্বেও কারও কাছে হাত পাতে না এবং তাকেও, যে নিজের অভাবের কথা প্রকাশ করে হাত পাতে।’ (সুরা হজ, আয়াত: ৩৬)।
রাসুল (সা.) কোরবানির গোশতের ব্যবহার সম্পর্কে উম্মতকে নির্দেশনা দিয়ে বলেছেন, ‘তোমরা নিজেরা খাও, অন্যকে আহার করাও এবং সংরক্ষণ করো।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫৫৬৯)
গোশত বণ্টনের মুস্তাহাব পদ্ধতি
শরিয়তে কোরবানিদাতার জন্য গোশত বণ্টনের মুস্তাহাব পন্থা হলো, পুরো গোশতকে সমান তিন ভাগে ভাগ করা। এক ভাগ নিজের পরিবারের জন্য, এক ভাগ আত্মীয়স্বজন ও প্রতিবেশীদের জন্য এবং বাকি এক ভাগ গরিব-মিসকিনদের জন্য রাখা ইসলামের দৃষ্টিতে বাঞ্ছনীয়। (আল্লামা ইবনে আবেদিন শামি, রাদ্দুল মুহতার, ৬/৩২৮, দারুল ফিকর, বৈরুত, ১৯৯২)
মুস্তাহাব পন্থা হলো, পুরো গোশতকে সমান তিন ভাগে ভাগ করা। এক ভাগ নিজের পরিবারের জন্য, এক ভাগ আত্মীয়স্বজন ও প্রতিবেশীদের জন্য এবং বাকি এক ভাগ গরিব-মিসকিনদের জন্য রাখা।
উল্লেখ্য, ইসলামের প্রথম যুগে কোরবানির গোশত তিন দিনের বেশি জমা করে রাখার অনুমতি ছিল না। তৎকালীন মদিনায় তীব্র অভাব ও দুর্ভিক্ষ থাকার কারণে রাসুল (সা.) এই সাময়িক নিষেধাজ্ঞা দিয়েছিলেন। পরবর্তীকালে অর্থনৈতিক সংকট কেটে গেলে তিনি তিন দিনের বেশি সময় ধরে গোশত সংরক্ষণের অনুমতি দেন। (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১৯৭২)
তবে আলেমগণ মনে করেন, সমাজে যদি পুনরায় তেমন কোনো দুর্ভিক্ষ বা চরম সংকট দেখা দেয়, তবে গোশত বেশিদিন সঞ্চয় না করে দ্রুত অভাবী মানুষের মাঝে বিলিয়ে দেওয়া উচিত।
ভাগের কোরবানিতে গোশত বণ্টন
যারা শরিকে বা ভাগে কোরবানি করেন, তাঁদের জন্য গোশত বণ্টনের ক্ষেত্রে শরিয়তের অত্যন্ত কঠোর একটি বিধান রয়েছে। শরিকে কোরবানি করলে গোশত অবশ্যই নিখুঁতভাবে ওজন করে বণ্টন করতে হবে; কোনোভাবেই অনুমান বা চোখের আন্দাজে ভাগ করা জায়েজ নয়।
শরিকে কোরবানি করলে গোশত অবশ্যই নিখুঁতভাবে ওজন করে বণ্টন করতে হবে; কোনোভাবেই অনুমান বা চোখের আন্দাজে ভাগ করা জায়েজ নয়।
এমনকি শরিকরা যদি নিজেদের মধ্যে কম-বেশির ব্যাপারে সানন্দে রাজিও থাকেন, তবুও আন্দাজে ভাগ করা যাবে না। কারণ, অনুমানে বণ্টন করলে আবশ্যিকভাবেই কিছুটা কমবেশি হয়ে যায়।
আর গোশতের বিনিময়ে গোশতের পরিমাণে এই কমবেশি হওয়াটা শরিয়তের দৃষ্টিতে সুদের অন্তর্ভুক্ত হতে পারে, যা সম্পূর্ণ হারাম। ওজন না করে আন্দাজে বণ্টন করলে কোরবানি আদায় হয়ে গেলেও শরিকরা প্রত্যেকেই গুনাহগার হবেন।
ফিকহ শাস্ত্রের কিতাবে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, ‘গোশত ওজন করেই বণ্টন করতে হবে, অনুমান করে নয়।’ (আলাউদ্দিন হাসকাফি, আদ-দুররুল মুখতার, ৬/৩১৭, দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যাহ, বৈরুত, ২০০২)
তবে গোশতের বাইরে পশুর অন্যান্য অঙ্গ—যেমন মাথা, পা বা কলিজা বণ্টনের সময় নিখুঁতভাবে ওজন করা জরুরি নয়; এগুলো সংখ্যা বা আন্দাজে ভাগ করা যাবে (ফখরুদ্দিন হাসান ইবনে মনসুর, ফাতাওয়ায়ে কাজিখান, ৩/৩৫১, দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যাহ, বৈরুত, ২০০৯)
যদি একটি পরিবারের সদস্যরা সবাই মিলে বা একই ঘরের যৌথ খরচে কোরবানি করেন, তবে সেই ঘরের সদস্যদের নিজেদের মধ্যে গোশত ওজন করে বণ্টন করার প্রয়োজন নেই। (মুফতি মাহমুদ হাসান গাঙ্গুহি, ফতোয়ায়ে মাহমুদিয়া, ১৭/৪২৫, জামিয়া ফারুকিয়া, করাচি, ২০০৯)
মহান আল্লাহ আমাদের সবাইকে শরিয়তের নিয়ম মেনে সঠিক পদ্ধতিতে কোরবানির আমল করার তাওফিক দান করুন।
ইলিয়াস মশহুদ: আলেম ও ধর্মীয় গবেষক