অহংকারের বিপদ থেকে বাঁচতে ইসলামের সহজ ১০ সূত্র

ছবি: প্রথম আলো

সাফল্যের চূড়ায় পৌঁছানোর পর মানুষের মধ্যে অনেক সময় ‘আমি’ বোধ বা অহংকার দানা বাঁধে। এই অহংকার শুধু মানুষের পতনই ডেকে আনে না, বরং সামাজিক ও মানসিক প্রশান্তিকেও ধ্বংস করে দেয়।

আত্মকেন্দ্রিক মানুষ কখনো প্রকৃত সুখী হতে পারে না, কারণ সে সবসময় অন্যের ওপর নিজের শ্রেষ্ঠত্ব জাহির করতে চায়। ইসলাম অহংকারকে অন্তরের ব্যাধি হিসেবে চিহ্নিত করে তা নিরাময়ের ১০টি সহজ সূত্র দিয়েছে:

১. অহংকারকে পতনের মূল মনে করা

অহংকার মানুষকে সত্য গ্রহণ থেকে দূরে রাখে এবং অন্যের অধিকার হরণ করতে উৎসাহিত করে। এটি ইবলিসের সেই বৈশিষ্ট্য, যার কারণে সে অভিশপ্ত হয়েছিল।

রাসুল (সা.) বলেছেন, “যার অন্তরে তিল পরিমাণ অহংকার থাকবে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে না।” (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৯১)

২. নিজের উৎস সম্পর্কে চিন্তা করা

মানুষ মাটির তৈরি এবং সে এক সময় নিঃস্ব ছিল—এই চিন্তা করলে অহংকার কমে যায়। সাফল্যের মালিক যে মহান আল্লাহ, এই উপলব্ধি বিনয় ফিরিয়ে আনে।

আল্লাহ বলেছেন, “আমি কি তোমাদের তুচ্ছ পানি থেকে সৃষ্টি করিনি?” (সুরা মাউন, আয়াত: ২০)

আরও পড়ুন

৩. শ্রেষ্ঠত্বের ভুল ধারণা বর্জন

বংশ, বর্ণ, সম্পদ বা পদের কারণে নিজেকে অন্যের চেয়ে বড় মনে করা মূর্খতা। ইসলামের দৃষ্টিতে শ্রেষ্ঠত্বের একমাত্র মাপকাঠি হলো চারিত্রিক শুদ্ধতা।

আল্লাহ বলেছেন, “নিশ্চয়ই আল্লাহর কাছে তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তিই বেশি সম্মানিত, যে তোমাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি পরহেজগার (সংযমী)।” (সুরা হুজুরাত, আয়াত: ১৩)

৪. আগে সালাম দেওয়ার অভ্যাস

সালাম বিনয়ের প্রতীক। আগে সালাম দেওয়ার মাধ্যমে মানুষের অহংকার চূর্ণ হয় এবং হৃদয়ে মহব্বত তৈরি হয়।

রাসুল (সা.) বলেছেন, “আগে সালাম দানকারী ব্যক্তি অহংকার থেকে মুক্ত।”
(শুয়াবুল ইমান, বাইহাকি, হাদিস: ৮৭৮৬)

৫. সাধারণ মানুষের সঙ্গে মেলামেশা

নিজেকে বিশেষ কেউ ভেবে সাধারণ মানুষের থেকে আলাদা রাখা অহংকারের লক্ষণ। নবীজি (সা.) মিসকিন ও সাধারণ মানুষের সঙ্গে বসে খাবার খেতেন।

তিনি বলেছেন, “আমি তো একজন বান্দা মাত্র, আমি সেভাবেই আহার করি যেভাবে একজন সাধারণ বান্দা আহার করে।” (শুয়াবুল ইমান, বাইহাকি, হাদিস: ৫৫০৭)

৬. নিজের ভুল স্বীকার করা

অহংকারী মানুষ কখনো নিজের ভুল মানতে চায় না। নিজের ভুল স্বীকার করার মানসিকতা হৃদয়ে বিনয় ও বিশালতা তৈরি করে।

আল্লাহ বলেছেন, “আর যারা তওবা (ক্ষমা প্রার্থনা) করে ও নিজেদের সংশোধন করে নেয়, আল্লাহ তাদের ক্ষমা করেন।” (সুরা বাকারা, আয়াত: ১৬০)

আরও পড়ুন

৭. দম্ভভরে চলাফেরা না করা

রাস্তায় চলাফেরা বা কথাবার্তায় বিনয় বজায় রাখা জরুরি। উদ্ধত আচরণ ব্যক্তিত্বের মান কমিয়ে দেয়।

আল্লাহ বলেছেন, “তুমি জমিনে দম্ভভরে বিচরণ করো না; নিশ্চয়ই তুমি তো জমিনকে বিদীর্ণ করতে পারবে না এবং উচ্চতায় পাহাড় সমান হতে পারবে না।” (সুরা বনি ইসরাইল, আয়াত: ৩৭)

৮. অন্যকে তুচ্ছজ্ঞান না করা

কাউকে ছোট মনে করা সরাসরি অহংকারের নামান্তর। আপনি যার সমালোচনা করছেন, হতে পারে আল্লাহর কাছে সে আপনার চেয়েও প্রিয়।

রাসুল (সা.) বলেছেন, “কোনো মানুষের মন্দ হওয়ার জন্য এটাই যথেষ্ট যে, সে তার ভাইকে তুচ্ছজ্ঞান করে।” (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৫৬৪)

৯. বিনয়ীদের জন্য উচ্চ মর্যাদার বিশ্বাস

বিনয় মানুষকে ছোট করে না, বরং আল্লাহর কাছে এবং মানুষের কাছে তার সম্মান বাড়িয়ে দেয়।

রাসুল (সা.) বলেছেন, “যে ব্যক্তি আল্লাহর জন্য বিনয়ী হয়, আল্লাহ তাকে উচ্চ মর্যাদা দান করেন।” (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৫৮৮)

১০. অন্তরের পরিচ্ছন্নতা বা তাজকিয়া

সাফল্য ও মেধার জন্য আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞ থাকা এবং নিয়মিত আত্মজিজ্ঞাসা করা অহংকারমুক্ত জীবনের মূলমন্ত্র।

আল্লাহ বলেছেন, “যে নিজের অন্তরকে পরিশুদ্ধ করেছে, সে-ই সফল হয়েছে।” (সুরা শামস, আয়াত: ৯)

অহংকারমুক্ত মানুষই প্রকৃত স্বাধীন, কারণ সে নিজের ইগোর দাসত্ব থেকে মুক্ত। বিনয় আমাদের ব্যক্তিত্বকে শুধু সুন্দরই করে না, বরং সমাজকে আরও বাসযোগ্য ও বন্ধুত্বপূর্ণ করে তোলে। ইসলামের এই শিক্ষাগুলো চর্চা করলে আমাদের জীবন ও সমাজ—উভয়ই শান্তিময় হবে।

আরও পড়ুন