ইতিহাসের পাতায় ৯ রমজান দিনটি বিভিন্ন মহাদেশে মুসলিম সার্বভৌমত্ব ও স্বাধীনতার এক সন্ধিক্ষণ।
এই দিনে একদিকে যেমন সিসিলির উপকূলে মুসলিম নৌবাহিনীর নোঙর ফেলার মাধ্যমে ভূমধ্যসাগরে এক নতুন যুগের সূচনা হয়, অন্যদিকে আধুনিক যুগে বিশ্বের বৃহত্তম মুসলিম প্রধান দেশ ইন্দোনেশিয়া অর্জন করেছিল দীর্ঘ প্রতীক্ষিত স্বাধীনতা।
সিসিলি জয়ে এক ফকিহ্র নেতৃত্ব
২১২ হিজরির ৯ রমজান (৮২৭ খ্রিষ্টাব্দ) ইসলামি সামরিক ইতিহাসের এক অবিস্মরণীয় মুহূর্ত। এই দিনে উত্তর আফ্রিকার আগলাবি শাসনামলে সেনাপতি আসাদ ইবনে আল-ফুরাতের নেতৃত্বে মুসলিম নৌবাহিনী সিসিলি দ্বীপের ‘মাজারা’ উপকূলে অবতরণ করে। (ইবনে আসির, আল-কামিল ফিত তারিখ, ৫/২০২, ১৯৮৭)
১০ হাজার পদাতিক এবং ৭০০ অশ্বারোহী নিয়ে পরিচালিত তার এই অভিযান প্রমাণ করে যে মুসলিম সভ্যতায় একজন আলেমও রণক্ষেত্রে দক্ষতার সঙ্গে নেতৃত্ব দিতে পারেন।
সেনাপতি আসাদ ইবনে আল-ফুরাত একই সঙ্গে ছিলেন একজন প্রখ্যাত ফকিহ্ ও বিচারক। ১০ হাজার পদাতিক এবং ৭০০ অশ্বারোহী নিয়ে পরিচালিত তার এই অভিযান প্রমাণ করে যে মুসলিম সভ্যতায় একজন আলেমও রণক্ষেত্রে দক্ষতার সঙ্গে নেতৃত্ব দিতে পারেন।
এই বিজয়ের মাধ্যমে সিসিলিতে পরবর্তী আড়াইশ বছরের মুসলিম শাসনের ভিত্তি স্থাপিত হয়। (ইবনে কাসির, আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ১০/২৬৫, ১৯৮৮)
মিসরের ক্ষমতার দ্বন্দ্ব ও আইয়ুবিদের উত্থান
৫৫৯ হিজরির ৯ রমজান (১১৬৪ খ্রিষ্টাব্দ) কায়রোর রাজনৈতিক ইতিহাসে এক নাটকীয় মোড় পরিবর্তন ঘটে। ফাতেমি উজির শাওয়ার ও দিরগামের মধ্যকার রক্তক্ষয়ী সংঘাতের পর এই দিনে কায়রো শহর অবরোধ মুক্ত হয়। (ইমাম জাহাবি, সিয়ারু আলামিন নুবালা, ২০/৫২০, ১৯৮৫)
নুরুদ্দিন জেনকির নির্দেশে সেনাপতি শিরকুহ এই সংকটে হস্তক্ষেপ করেন। ইতিহাসবিদরা মনে করেন, এই ঘটনাটিই মূলত মিসরে ফাতেমি শাসনের অবসান এবং সুলতান সালাহউদ্দিন আইয়ুবির উত্থানের পথ প্রশস্ত করেছিল, যা পরবর্তীকালে ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে মুসলিমদের ঐক্যবদ্ধ করতে প্রধান ভূমিকা পালন করে (সুয়ুতি, তারিখুল খুলাফা, পৃষ্ঠা: ৪২০, ২০০৪)
সুলতানি আজান ও কায়রোর স্থিতিশীলতা
৮২৫ হিজরির ৯ রমজান (১৪২২ খ্রিষ্টাব্দ) কায়রোর সুলতান হাসান মাদরাসায় এক দীর্ঘ বিরতির পর আবারও আজান ধ্বনিত হয়। (ইবনে কাসির, আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ১৪/১১০, ১৯৮৮)
মামলুক সুলতান ‘জহির তাতার’-এর শাসনামলে এই পদক্ষেপটি কেবল একটি ধর্মীয় ঘোষণা ছিল না, বরং এটি ছিল মামলুকদের অভ্যন্তরীণ বিশৃঙ্খলার পর মিশরের রাজনৈতিক ও আধ্যাত্মিক স্থিতিশীলতা ফিরে আসার একটি প্রতীকী ঘোষণা।
সাড়ে তিনশ বছরের ডাচ ঔপনিবেশিক শাসনের পর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জাপানের আত্মসমর্পণের সুযোগে ইন্দোনেশীয় নেতারা এই ঐতিহাসিক ঘোষণা দেন। রমজানের এক পবিত্র জুমাবারে এই ঘোষণা দেওয়া হয়।
ইন্দোনেশিয়ার স্বাধীনতা
আধুনিক ইতিহাসের ৯ রমজান ১৩৬৪ হিজরি (১৭ আগস্ট ১৯৪৫) দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় এক নতুন ভোরের সূচনা হয়। এই দিনে নেতা সুকর্ন ও মোহাম্মদ হাতা ইন্দোনেশিয়ার স্বাধীনতা ঘোষণা করেন।
সাড়ে তিনশ বছরের ডাচ ঔপনিবেশিক শাসনের পর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জাপানের আত্মসমর্পণের সুযোগে ইন্দোনেশীয় নেতারা এই ঐতিহাসিক ঘোষণা দেন। রমজানের এক পবিত্র জুমাবারে এই স্বাধীনতার ঘোষণা বিশ্বের বৃহত্তম মুসলিম দেশটিকে একটি সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে বিশ্ব মানচিত্রে স্থান করে দেয়।
ফিলিস্তিন ও আন্তর্জাতিক ব্যর্থতা
১৩৬৭ হিজরির ৯ রমজান (১৫ জুলাই ১৯৪৮) ফিলিস্তিন ভূখণ্ডে এক বেদনাবিধুর স্মৃতির উদ্রেক করে। এই দিনে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ ফিলিস্তিনে যুদ্ধবিরতির জন্য ৫৪ নম্বর প্রস্তাব গ্রহণ করে।
প্রথম আরব-ইসরায়েল যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে এই প্রস্তাবটি গৃহীত হলেও এটি ফিলিস্তিনিদের উচ্ছেদ ও দখলদারিত্ব বন্ধে কোনো কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেনি। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের এই ব্যর্থতা ফিলিস্তিনি জনগণের জন্য এক দীর্ঘস্থায়ী নাকবা বা বিপর্যয়ের পথ তৈরি করে দেয়।