রমজান মাস ত্রিশ দিনে সংক্ষিপ্ত, কিন্তু আত্মশুদ্ধি, ক্ষমা ও জান্নাতের পথে নিজেকে এগিয়ে নেওয়ার জন্য বিশেষ সময়। রমজানের দিনগুলো অতি দ্রুত ফুরিয়ে যায়।
তাই এ মাসে জিহ্বাকে জিকিরে, অন্তরকে তওবায় এবং দোয়াগুলোকে জাহান্নাম থেকে মুক্তি ও জান্নাতের প্রত্যাশায় ব্যস্ত রাখা প্রয়োজন।
তাই কালিমা, ইস্তিগফার, জান্নাতের দোয়া ও জাহান্নাম থেকে মুক্তির প্রার্থনা—এই চারটি আমল রমজানে বান্দার আত্মাকে জীবন্ত রাখে। এ মাসে কোন আমলগুলো বেশি করা উচিত, সে বিষয়ে রাসুল (সা.) উম্মতকে স্পষ্ট দিকনির্দেশনা দিয়ে গেছেন।
তিনি তাঁর উম্মতকে রমজানে চারটি আমল বেশি বেশি করার কথা বলেছেন। এর মধ্যে দুটি হচ্ছে আল্লাহ-তাআলার সন্তুষ্টির জন্য, আর দুটি এমন আমল যা করা ছাড়া বান্দার কোনো উপায় নেই। (সহিহ ইবনে খুজাইমাহ, হাদিস: ১৮৮৭)
আল্লাহকে সন্তুষ্ট করার ২ আমল
১. কালিমা বেশি বেশি পড়া: “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ” হচ্ছে তাওহিদের মূল বাক্য এবং সর্বশ্রেষ্ঠ জিকির। বান্দা যখন আন্তরিকতার সঙ্গে এ কালিমা পড়ে, তখন সে তার রবের একত্ব স্বীকার করে এবং শিরক থেকে নিজেকে মুক্ত ঘোষণা করে।
আর এটি শুধু মুখে স্বীকার নয়, অন্তর থেকে মানাও জরুরি। রমজানে এই জিকির হৃদয়কে পরিশুদ্ধ করে এবং আমলকে দৃঢ় করে।
রাসুল (সা.) বলেছেন, “সর্বোত্তম জিকির হলো লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ।” (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ৩৩৮৩)।
রমজানে এ কালিমা বেশি বেশি পড়া ঈমানকে নবায়ন করে এবং অন্তরকে পরিশুদ্ধ করে।
২. ইস্তিগফার করা: রমজান মাস আল্লাহর ক্ষমার মাস। মানুষ প্রতিনিয়ত ভুল করে, গুনাহে জড়িয়ে পড়ে। রমজান বান্দার বেশি বেশি ক্ষমা প্রার্থনার মাসও। কারণ এ মাসে বেশি বেশি আন্তরিক ইস্তিগফার বান্দার অন্তরকে নরম করে এবং বান্দাকে আল্লাহর নৈকট্যে পৌঁছে দেয়।
ইস্তিগফার বান্দাকে গুনাহ থেকে মুক্ত করে এবং আল্লাহর রহমত ও রিজিকের দরজা খুলে দেয়। তাই বান্দার নিজের প্রয়োজনেই বেশি বেশি ইস্তিগফার করা জরুরি।
কয়েকটি ইস্তিগফার হলো:
সংক্ষিপ্ত ইস্তিগফার: আল্লাহুম্মাগফিরলী। অর্থ: হে আল্লাহ আমাকে ক্ষমা করুন। (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৬৯৭)
সাইয়িদুল ইস্তিগফার: “আল্লাহুম্মা আন্তা রব্বী, লা ইলাহা ইল্লা আন্তা…” অর্থ: হে আল্লাহ, আপনিই আমার প্রতিপালক, আপনি ছাড়া কোনো মাবুদ নাই।
এই ইস্তিগফারকে বলে সাইয়িদুল ইস্তিগফার বা সর্বশ্রেষ্ঠ ক্ষমাপ্রার্থনা।
পূর্ণাঙ্গ ইস্তিগফার: “আস্তাগফিরুল্লা-হাল্লাযী লা ইলা-হা ইল্লা হুওয়াল হাইয়ুল ক্বাইয়ূমু ওয়া আতূবু ইলাইহি।” অর্থ: আমি আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করছি। যিনি ব্যতীত কোন উপাস্য নেই। যিনি চিরঞ্জীব ও বিশ্বচরাচরের ধারক এবং আমি তাঁর দিকেই ফিরে যাচ্ছি (বা তওবা করছি)। (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ১৫১৭)
ইস্তিগফার গুরুত্বপূর্ণ একটি আমল। শুধু রমজানে নয়, সারা বছরই এর চর্চা থাকা উচিত।
যে ২ আমল ছাড়া বান্দার উপায় নেই
১. জান্নাত প্রার্থনা করা: জান্নাত কোনো অবাস্তব কল্পনা নয়; এটি মুমিনের চূড়ান্ত গন্তব্য। তাই রমজানে বারবার জান্নাত চেয়ে দোয়া করা প্রয়োজন। এক্ষেত্রে আমরা সবচেয়ে উত্তম জান্নাতই দয়াময় রবের কাছে চাইব। তাঁর সামর্থ্য তো আমাদের সামর্থ্য বা ধারণা অনুযায়ী নয়। তিনি অসীম দয়ালু, দোয়া কবুলকারী।
রাসুল (সা.) আমাদেরকে শিখিয়েছেন, তোমরা যখন আল্লাহর কাছে কিছু চাইবে, তখন জান্নাতুল ফিরদাউস চাইবে। কারণ তা জান্নাতের সর্বোচ্চ ও সর্বোত্তম স্থান। তার উপরে রয়েছে রহমানের আরশ এবং সেখান থেকেই জান্নাতের নহরসমূহ প্রবাহিত হয়েছে। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ২৭৯০)
তাই আমরা দোয়া করবো এভাবে: আল্লাহুম্মা ইন্নী আসআলুকা জান্নাতাল ফিরদাউস। অর্থ: হে আল্লাহ, আমি আপনার কাছে জান্নাতুল ফেরদাউস প্রার্থনা করছি।
২. জাহান্নাম থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করা: জাহান্নামের আগুন ও অন্যান্য শাস্তি ভয়াবহ ও কল্পনাতীত। যে বান্দা তা থেকে মুক্তি চায়, সে তার আখেরাতের ব্যাপারে সচেতন।
রমজান মাসে দয়ালু রব সবচেয়ে বেশিসংখ্যক বান্দাকে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দেন যা অন্য কোন মাসে দেন না। তাই জান্নাত চেয়ে দোয়া করার সময় জাহান্নাম থেকে বাঁচার দোয়া করাও আমাদের জন্য একান্ত জরুরি।
জাহান্নাম থেকে মুক্তির দোয়া: আল্লাহুম্মা আজিরনি মিনান নার। অর্থ: হে আল্লাহ! আমাকে জাহান্নামের আগুন থেকে মুক্তি দিন।
এ আমলগুলো শুধু রমজানের জন্য নয় জীবনের প্রতিটি দিন আমাদের জন্য আবশ্যক করে নেওয়া জরুরি। তবে রমজানে অন্যান্য আমল করার পাশাপাশি আমরা যেন গুরুত্বপূর্ণ এ আমলগুলো করতে ভুলে না যাই।
ইসমত আরা: শিক্ষক ও লেখক