নাজমুলদের হারায়নি কেউ, হেরেছেন নিজেরাই

ম্যাচ শেষে দুই দলের খেলোয়াড়দের শুভেচ্ছা বিনিময়শামসুল হক

ধরুন, বাংলাদেশ ম্যাচটি হারেনি। সিলেট টেস্টে জিতে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ১–০ ব্যবধানে এগিয়ে গেছে। তাতে বাংলাদেশ ক্রিকেটের চেহারা কি বদলে যেত? নিশ্চয়ই নয়। তেমনি জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে হারটিও বাংলাদেশকে অতল গহ্বরে ফেলে দেয়নি। বাংলাদেশ ক্রিকেট সিলেট টেস্টের আগে যেখানে ছিল, শেষেও সেখানেই আছে। তবে একটি প্রশ্ন আসছে ঘুরেফিরে। কীভাবে টানা ১০টি টেস্ট আর ৪ বছর জয়হীন থাকা একটি দলের কাছে বাংলাদেশ ঘরের মাঠে ৩ উইকেটে হেরে গেল?

গত চার বছরে বাংলাদেশ টেস্ট জিতেছে ৮টি। এর মধ্যে নিউজিল্যান্ডের মতো দলকে হোম ও অ্যাওয়েতে দুবার হারিয়েছে বাংলাদেশ। সিলেটে ঠিক কোন কারণে ধুঁকতে থাকা জিম্বাবুয়ের কাছে হেরেছে নাজমুল হোসেনের দল? এ প্রশ্নের উত্তর বাংলাদেশ দলের ক্রিকেটারদের পারফরম্যান্স বিশ্লেষণ করলেই পাওয়া যাবে। জিম্বাবুয়ের ক্রিকেটারদের খুব বেশি টানার প্রয়োজনও নেই। কারণ, সিলেটে বাংলাদেশ হেরে গেছে নিজেদের কাছেই।

জিম্বাবুয়ের কাছে প্রথম টেস্টে হেরে যাওয়ার পুরো দায় নিজের কাঁধে নিয়েছেন বাংলাদেশের অধিনায়ক নাজমুল হোসেন
প্রথম আলো

নাজমুল, একই ভুলের পুনরাবৃত্তি
বাংলাদেশ অধিনায়ক নাজমুলের দুই ইনিংসের গল্পই অনেকটা একই রকম। ভালোই খেলছিলেন। হুট করেই মনোযোগ হারিয়ে উইকেট ছুড়ে এসেছেন। প্রথম ইনিংসে ৪০ রানে আর দ্বিতীয় ইনিংসে ৬০–এ। দুবারই ফিরেছেন ব্লেসিং মুজারাবানির শর্ট বলে। অথচ দুটি ইনিংসের একটিতেও তিন অঙ্কের ঘরে যেতে পারলে ম্যাচের চেহারা পাল্টে দিতে পারতেন নাজমুল। ভালো খেলে উইকেট দিয়ে আসার রোগটা অবশ্য তাঁর পুরোনো। ২০২৩ সালের নভেম্বরে সর্বশেষ টেস্ট সেঞ্চুরি পেয়েছেন। এরপর খেলা ১৯ ইনিংসের মধ্যে ১০ বারই ২০ বা এর চেয়ে বেশি রান করেছেন। অথচ ফিফটি মাত্র দুটিতে। সর্বোচ্চ ৮২।

ফিফটির পর ইনিংস লম্বা করতে পারেননি মুমিনুল হক।
প্রথম আলো

মুমিনুলের সুযোগ নষ্ট
মুমিনুলও পারতেন সিলেট টেস্টের ফল পাল্টে দিতে! প্রথম ইনিংসের কথাই ধরুন। শূন্য রানে জীবন পেলেন, এরপর অল্পের জন্য রক্ষা পেয়েছেন বেশ কয়েকবার। এত সুযোগের পরও করতে পারলেন ৫৬। স্লগ সুইপ খেলতে গিয়ে যেভাবে বাঁহাতি স্পিনার ওয়েলিটংটন মাসাকাদজার বলে আউট হলেন, ওটা তো আত্মহত্যাই। মুমিনুল দ্বিতীয় ইনিংসে আটকা পড়েন ভিক্টর নিয়াউচির অফ স্টাম্পের বাইরে পাতা ফাঁদে, যখন তাঁর রান ৪৭। শুধু টেস্ট খেলেন বলে তাঁর কাছ থেকে প্রত্যাশা একটু বেশিই থাকে। আর কীভাবে সাদা পোশাকের ক্রিকেটে সেঞ্চুরি করতে হয়, তাঁর চেয়ে তো ভালো কেউ বাংলাদেশে জানেন না। দেশের হয়ে সর্বোচ্চ ১৩টি সেঞ্চুরিই যে তাঁর। কিন্তু সেটা সিলেটে সেটা পারলেন কই?

আরও পড়ুন
মুশফিক দুই ইনিংস মিলিয়ে করেছেন ৮ রান
প্রথম আলো

মুশফিক কোথায়?
মুশফিক আছেন। তবে তাঁর মতো নেই। ফিফটি নেই টানা ১২ ইনিংসে। প্রথম ইনিংসে তো আউট হয়েছেন ম্যাচের সবচেয়ে নিরীহ বলের একটিতে। মাসাকাদজার বলে ৪ রান করে। দ্বিতীয় ইনিংসে আবার ৪ রানে আউট। এ দফায় মুজারাবানির অফ স্টাম্পের বাইরের বলে খোঁচা মেরে। টেস্টে বাংলাদেশের মিডল অর্ডারকে বছরের পর বছর ধরে টানার অভিজ্ঞতা আছে মুশফিকের। কিন্তু সে অভিজ্ঞতার ছাপ সিলেটে পাওয়া যায়নি।

ওপেনিং: যেন থেকেই নেই
ওপেনারদের কাজটা কঠিন। নতুন বলটাকে সামলানো একটু মুশকিলই। তবে সাদমান ইসলাম ও মাহমুদুল হাসানের ব্যাটিং দেখে যতটা মনে হয়, ততটাও হয়তো কঠিন নয়। উইকেটে দুজনকে যে অস্বস্তিতে দেখা গেছে, তা দৃষ্টিকটুই। দুজনের খেলা মোট ৪ ইনিংসের মধ্যে মাহমুদুল সর্বোচ্চ ৩৩ রান করেছেন দ্বিতীয় ইনিংসে, তা–ও দুবার জীবন পেয়ে। উদ্বোধনী জুটিতে প্রথম ইনিংসে উঠেছে ৩১, পরের ইনিংসে ১৩। অবশ্য টেস্টে ওপেনিংয়ে সর্বশেষ ১২ ইনিংসেই কোনো পঞ্চাশোর্ধ্ব রানের জুটি পায়নি বাংলাদেশ।

আরও পড়ুন
সেই শট। মুজারাবানির বাউন্সারে লোভ সামলাতে না পেরে ক্যাচ দিলেন বাংলাদেশ অধিনায়ক নাজমুল হোসেন
প্রথম আলো

ভুলে ভরা প্রথম ইনিংস
দুই দল মিলিয়ে ম্যাচে হওয়া চার ইনিংসের মধ্যে বাংলাদেশ ঠিক কোথায় হেরেছে? এককথায় বললে বাংলাদেশের ১৯১ রানের অলআউট হওয়া প্রথম ইনিংসটিকেই কাঠগড়ায় তুলতে হবে। সেই ইনিংসে ২ উইকেটে ৯৮ রান তোলা বাংলাদেশ পরের ৯৩ রানে হারিয়েছে ৮ উইকেট। এই ইনিংসে বাংলাদেশ আরও ৮০–১০০ রান যোগ করতে পারলে ম্যাচের ফল অন্য রকম হতে পারত। চতুর্থ ইনিংসে বড় হতে পারত জিম্বাবুয়ের লক্ষ্যও। ১৭৪ রান তুলতে জিম্বাবুয়ে ৭ উইকেট হারিয়ে ফেলায় যা আফসোসই বাড়িয়েছে।  

বল হাতেও প্রথম ইনিংসে ভুল করেছে বাংলাদেশ। শন উইলিয়ামস ষষ্ঠ ব্যাটসম্য্যান হিসেবে দলীয় ১৯৩ রানে আউট হওয়ার পর শেষ ৪ উইকেটে ৮০ রান যোগ করেছে জিম্বাবুয়ে। মুজারাবানি–এনগারাভাদের সামনে পেসারদের বাউন্সার, ইয়র্কারের চেষ্টাতে রান বেরিয়েছে বেশি।

পরীক্ষার আগে প্রশ্ন পেয়েও ফেল
সিলেটে মাঠে নামার আগেই বাংলাদেশ জানত, এই উইকেটে ৬ ফুট ৮ ইঞ্চি উচ্চতার মুজারাবানি বাংলাদেশকে ভোগাতে পারেন। জেনেশুনেও মুজারাবানির ফাঁদে পা দিয়েছেন বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানরা। তাঁর অফ স্টাম্পের বাইরের ও শর্ট বলে বোকা হয়েছেন নাজমুল–মিরাজরা। একটু কঠিন বোলাদের সামনে পড়লেই ব্যাটসম্যানদের দিনের পর দিন এমন ব্যর্থতা টেস্টে ধারাবাহিক চিত্রে পরিণত হয়েছে। বাংলাদেশের পাওয়া সাম্প্রতিক জয়গুলোতে বোলাররাই ব্যাটসম্যানের ব্যর্থতা পুষিয়ে দিয়ে জয় এনে দিয়েছেন। সিলেটে বোলাররা লড়াই করলেও সেটি হয়ে ওঠেনি। তাতেই তো সিরিজের প্রথম টেস্ট শেষে বাংলাদেশ ০, জিম্বাবুয়ে ১।

আরও পড়ুন