‘দোষটা কার আপনারা বুঝে নেন’—টি–টুয়েন্টি বিশ্বকাপে না যাওয়ার কারণ বলতে গিয়ে তদন্ত কর্মকর্তা

বাংলাদেশ ক্রিকেট দলবিসিবি

এ বছরের ফেব্রুয়ারি-মার্চে ভারত ও শ্রীলঙ্কায় অনুষ্ঠিত টি–টুয়েন্টি বিশ্বকাপ বয়কট করেছিল বাংলাদেশ। পেসার মোস্তাফিজুর রহমানকে আইপিএল থেকে বাদ দেওয়ার প্রতিক্রিয়ায় নিরাপত্তার কারণে বিশ্বকাপে খেলতে ভারতে দল পাঠায়নি বাংলাদেশের তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকার। বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) বাংলাদেশের ম্যাচগুলো ভারত থেকে শ্রীলঙ্কায় স্থানান্তরের দাবি করেছিল। সেই দাবিতে আইসিসি সাড়া না দেওয়ায় বাংলাদেশও যায়নি বিশ্বকাপ খেলতে।

বিশ্বকাপে খেলতে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত ছিল তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকারের। সাবেক ক্রীড়া উপদেষ্টা অধ্যাপক আসিফ নজরুল একাধিকবারই তা বলেছেন। একই কথা বলেছেন ওই সময় বিসিবি সভাপতির দায়িত্বে থাকা আমিনুল ইসলামও।

বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হক বিশ্বকাপ খেলতে না যাওয়ার কারণ উদ্‌ঘাটনে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেন। তদন্ত প্রতিবেদন আজ প্রকাশ করা হয়েছে।

জাতীয় ক্রীড়া পরিষদে তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন কমিটির প্রধান যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব ড. এ কে এম ওয়ালী উল্লাহ। কমিটির অপর দুই সদস্য বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের সাবেক অধিনায়ক ও বিসিবির বর্তমান প্রধান নির্বাচক হাবিবুল বাশার ও সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার ফয়সাল দস্তগীর।

সাবেক যুব ও ক্রীড়া উপদেষ্টা অধ্যাপক আসিফ নজরুল
প্রথম আলো

কিন্তু বাংলাদেশের বিশ্বকাপ বয়কট করার দায় কার—২২ পৃষ্ঠার প্রতিবেদনে এ নিয়ে সুষ্পষ্ট কোনো বক্তব্য নেই। তবে সরকারের কার সিদ্ধান্তে বাংলাদেশ দল বিশ্বকাপ খেলতে যায়নি—সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে বলা হয়েছে, সিদ্ধান্তটা ছিল অধ্যাপক আসিফ নজরুলের (অন্তর্বর্তী সরকারের যুব ও ক্রীড়া উপদেষ্টা)।

প্রতিবেদনের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা, তদন্ত কমিটি এত বড় একটি ঘটনার তদন্ত করেছে, অথচ সেখানে সংশ্লিষ্ট তিন গুরুত্বপূর্ণ পক্ষ—অধ্যাপক আসিফ নজরুল, বিসিবির সাবেক সভাপতি আমিনুল ইসলাম ও আইসিসির সঙ্গে তারা কথা বলতে পারেনি। আসিফ নজরুলের বিভিন্ন সাক্ষাৎকার আর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া বক্তব্যই প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছে।

আরও পড়ুন

তদন্তের মূল ভিত্তি ছিল একটি চিঠি, যেটি যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় থেকে বিসিবির কাছে পাঠানো হয়েছিল। যেখানে নির্দেশনা ছিল, নিরাপত্তার কারণে বাংলাদেশ ভারতে টি–টুয়েন্টি বিশ্বকাপ খেলতে যাবে না।

প্রতিবেদনে ক্রীড়া সাংবাদিক, বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের সিনিয়র সহকারী কোচ সালাহউদ্দিন, বাংলাদেশ টেস্ট দলের অধিনায়ক নাজমুল হোসেন, টি–টুয়েন্টি অধিনায়ক লিটন দাস, বিসিবির সভাপতি তামিম ইকবালের বক্তব্য তুলে ধরা হয়েছে।

সাবেক বিসিবির সভাপতি আমিনুল ইসলাম বুলবুল
প্রথম আলো

কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার ফয়সাল দস্তগীর সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ‘আমিনুল ইসলামের সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করেছি। দুর্ভাগ্যজনকভাবে কথা বলতে পারিনি।’ এক প্রশ্নে তিনি বলেন, সরকারের সিদ্ধান্তেই বাংলাদেশ দল বিশ্বকাপে যেতে পারেনি। ‘মোস্তাফিজুর রহমানের বিষয়টা ছিল ঘরোয়া টুর্নামেন্ট ঘিরে। সেটা আন্তর্জাতিক ইস্যু হওয়া উচিত ছিল না’—বলেছেন তিনি।

প্রতিবেদনে ১৯ নম্বর পাতায় বলা হয়েছে, সিদ্ধান্ত একজন ব্যক্তির নেওয়া উচিত নয়। এই একজন ব্যক্তি কে? লিখিত প্রতিবেদনে এর উল্লেখ না থাকলেও সংবাদ সম্মেলনে ব্যারিস্টার ফয়সাল বলেন, ‘এই একজন’ বলতে তাঁরা তখনকার ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ নজরুলকেই বুঝিয়েছেন। কার কারণে বাংলাদেশ বিশ্বকাপে খেলেনি—এমন প্রশ্নে ওয়ালী উল্লাহ বলেন, ‘এটা সরকারের সিদ্ধান্ত ছিল। এর বাইরে আর কী বলব!’

আরও পড়ুন

প্রতিবেদনে তদন্ত কমিটি মূলত টি–টুয়েন্টি বিশ্বকাপে দল না পাঠানোর ঘটনা প্রবাহই তুলে ধরেছে; সঙ্গে কিছু সুপারিশও দিয়েছে। কমিটির বক্তব্য, দোষী কে—সেটা খোঁজার জন্য তারা তদন্ত করেনি। কমিটির সদস্য ওয়ালী উল্লাহ একপর্যায়ে বলেন, ‘যেহেতু সরকার সিদ্ধান্ত দিয়েছে, সরকারকে দোষারোপ করি কীভাবে!’

তবে নিজেদের মতামত দিতে গিয়ে ব্যারিস্টার ফয়সাল বলেন, ‘আমরা মনে করি, বাংলাদেশের যাওয়া উচিত ছিল। বিশেষজ্ঞরাও মনে করেন, যাওয়া উচিত ছিল।’ তবে বিশ্বকাপে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত ঠিক ছিল কি না—এমন প্রশ্নে ওয়ালী উল্লাহ বলেন, ‘সঠিক না বেঠিক, কীভাবে বলব! তখনকার প্রেক্ষাপটে সরকার সিদ্ধান্ত দিয়েছে। মন্ত্রণালয় থেকে চিঠি দেওয়া হয়েছে বিসিবিকে। বিসিবি সরকারের সিদ্ধান্ত মেনে নিয়েছে।’ অন্য এক প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘সরকারের সিদ্ধান্তের কারণে খেলতে যেতে পারেনি বাংলাদেশ। দোষটা কার আপনারা বুঝে নেন।’

প্রতিবেদনের উপসংহারে উল্লেখ করা হয়েছে, এ সংকট বিসিবির ভেতরের কিছু গভীর ও কাঠামোগত দুর্বলতা উন্মোচন করেছে। বলা হয়েছে কূটনৈতিক ব্যর্থতার কথাও।

কমিটি সাতটি সুপারিশও দিয়েছে। যার মধ্যে আছে আন্তর্জাতিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতাকে সব ধরনের কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক টানাপোড়েন থেকে মুক্ত রাখা, খেলোয়াড় ও সমর্থকদের স্বার্থ রক্ষায় বিসিবির আনুষ্ঠানিক নীতিমালা তৈরি করা, বিসিবির স্বায়ত্তশাসনকে শক্তিশালী করার মতো বিষয়গুলো। ভবিষ্যতে বিসিবির সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা ও যোগাযোগের মাধ্যমগুলো স্পষ্ট করার কথাও বলা হয়েছে সুপারিশে।

আরও পড়ুন