এশিয়ান গেমসে বাংলাদেশ কেন গাইছে ‘রেইন রেইন, গো অ্যাওয়ে’

খারোগি স্পোর্টস পার্কে বৃষ্টির কারণে বেশির ভাগ ম্যাচই অনুষ্ঠিত হয়নিএক্স

বৃষ্টিই যদি সব ঠিক করে দেয়, তাহলে মানুষের আর ক্রিকেট খেলার কী দরকার!

ক্রিকেট খেলায় কথাটা শতভাগ সত্যি। সম্ভবত আর কোনো খেলায় কন্ডিশন ও আবহাওয়ার এতটা প্রভাব নেই। সামান্য কিছুক্ষণের বৃষ্টিতেই বন্ধ হতে পারে খেলা, গড়ে দিতে পারে ম্যাচের ভাগ্য। এশিয়ান গেমসে ছেলেদের ক্রিকেটে অবশ্য খেলাই হতে পারছে না, বলা ভালো বৃষ্টি হতে দিচ্ছে না। খেলার মাঝে বৃষ্টি নয়, বৃষ্টি তো খেলাই শুরু হতে দিচ্ছে না!

সূচি অনুযায়ী গ্রুপ পর্ব ও কোয়ার্টার ফাইনাল মিলিয়ে এখন পর্যন্ত মোট ১০টি ম্যাচ অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল। দুটি গ্রুপ মিলিয়ে মোট ছয়টি ম্যাচ এবং কোয়ার্টার ফাইনালে চারটি ম্যাচ। কিন্তু ইভেন্টের এ পর্যন্ত এসে দেখা যাচ্ছে, এই ১০ ম্যাচের মধ্যে মাত্র চার ম্যাচে মাঠের খেলায় ফল মিলেছে। বাকি ছয় ম্যাচেরই ভাগ্য গড়ে দিয়েছে বৃষ্টি।

কোয়ার্টার ফাইনালে চার ম্যাচের একটিতেও একটি বলও খেলা হয়নি। সব কটি ম্যাচই শুরুর আগেই পরিত্যক্ত ঘোষণা করতে বাধ্য হয়েছেন আয়োজকেরা। ‘এ’ গ্রুপে নেপাল-জাপান ম্যাচে একটি ইনিংসে ১৫ ওভার খেলা হওয়ার পর হানা দেয় বৃষ্টি। এরপর খেলা হয়নি। কিন্তু ‘বি’ গ্রুপে মালয়েশিয়া-ওমান ম্যাচে সেই সুযোগটুকুও মেলেনি। ম্যাচটি পরিত্যক্ত হওয়ার আগে বৃষ্টির কারণে একটি বলও খেলা যায়নি।
প্রশ্ন উঠতে পারে, জাপানের নিশিনে খারোগি স্পোর্টস পার্ক তো এশিয়ান গেমস ক্রিকেটের ভেন্যু। সেখানকার পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা কিংবা আউটফিল্ডের পানি শুকানোর ব্যবস্থা কি নেই?

জাপানে এশিয়ান গেমস ক্রিকেট খেলতে গিয়ে বৃষ্টির কবলে পড়েছেন ক্রিকেটাররা। ছাতা মাথায় রাস্তায় লিটন, রিশাদ, মোসাদ্দেকদের হাঁটার একটি মুহূর্তে
বিসিবি

আসলে কয়েক মাস আগেও এটি ছিল বেসবল মাঠ। এশিয়ান গেমস সামনে রেখে গত মার্চে এটিকে ক্রিকেটের উপযোগী করে তোলা হয়। কিন্তু কতটা উপযোগী, তা নিয়ে গেমসের শুরু থেকে প্রশ্ন ছিল অংশ নেওয়া দলগুলোর মধ্যে। তবে ক্রিকেটে হাঁটি হাঁটি পা পা করা জাপানের তো আর বৃষ্টিতে কোনো হাত নেই। এবার গেমসে ক্রিকেট ইভেন্ট যে বৃষ্টি পণ্ড করে দিতে পারে, সেটাও কারও অজানা ছিল না। আবহাওয়ার পূর্বাভাসে জানা গেছে আগেই।

সম্ভবত এ কারণেই টানা ছয়টি ম্যাচ বৃষ্টিতে পরিত্যক্ত হওয়ার পরও কেউ তেমন গা করছেন না। এর মধ্যে আবার পাঁচটি ম্যাচে একটি বলও খেলা হয়নি। তবে সেমিফাইনালে টেস্ট খেলুড়ে দলগুলো ওঠায় এখন সম্ভবত অনেকে গায়ে মাখবেন। কারণ, বৃষ্টিসংশ্লিষ্ট একটি নিয়মের অদ্ভুত কিন্তু নির্মম মারপ্যাঁচ।

সেই নিয়মটি হয়তো অনেকেই জানেন। সেটাই আবারও বলার আগে চলুন একটু কল্পনার জগৎ থেকে ঘুরে আসি।

ধরুন, একটি দাওয়াত–বাড়ি। একই টেবিলে দুজন ব্যক্তি খেতে বসেছেন। বাটিতে একটাই গোশতের টুকরা। টেবিলে বসা দুই ব্যক্তির মধ্যে একজন অবস্থাসম্পন্ন এবং পারিবারিক ঐতিহ্যও আছে। অন্য ব্যক্তিটি গুণে-মানে-সম্পদে তাঁর ধারেকাছেও নেই। এ পরিস্থিতিতে গোশতের সেই টুকরা ধরে নেওয়া যাক ভদ্রতার খাতিরে কেউই আগেভাগে পাতে তুলছেন না। তখন এগিয়ে আসতে হয় দাওয়াত-বাড়ির কর্তাদের। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে কিন্তু গোশতের টুকরাটি সেই ধনী ব্যক্তির পাতেই ওঠে। সামাজিক স্তরবিন্যাসে এ যেন এক অলিখিত নিয়ম।

কিন্তু এশিয়ান গেমস ক্রিকেটের নিয়ম অলিখিত নয়। তবে স্তরবিন্যাস আছে নিয়মেই। আর সেই নিয়ম হলো ম্যাচ বৃষ্টিতে পরিত্যক্ত হলে দুটি দলের মধ্যে র‌্যাঙ্কিংয়ে শ্রেয়তর অবস্থানে থাকা দল উঠবে পরবর্তী ধাপে। নিয়মটির প্রয়োগ এবং সবকিছু দেখভালের দায়িত্ব অলিম্পিক কাউন্সিল অব এশিয়া (ওসিএ) এবং এশিয়ান ক্রিকেট কাউন্সিলের (এসিসি)।

এশিয়ান গেমসে খেলতে জাপানে উড়াল দেওয়ার আগে শেরেবাংলা স্টেডিয়ামে বাংলাদেশ ক্রিকেট দল
বিসিবি

দাওয়াতে গোশতজনিত সমস্যার যে কাল্পনিক প্রসঙ্গ টানা হলো, সেটাই বসিয়ে নিতে পারেন এবারের এশিয়ান গেমস ক্রিকেটের ছাঁচে।

নিশিনে আজ পরিত্যক্ত হওয়া বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া কোয়ার্টার ফাইনাল ম্যাচটিই ধরুন। টি-টুয়েন্টি র‌্যাঙ্কিংয়ে মালয়েশিয়া বাংলাদেশের চেয়ে পিছিয়ে। ম্যাচটি পরিত্যক্ত হওয়ায় নিয়ম অনুযায়ী ওসিএ ও এসিসিকে লড়াইয়ের টেবিলে সেমিফাইনালের ‘গোশত’ তুলে দিতে হয় বাংলাদেশের থালায়। স্রেফ র‌্যাঙ্কিংয়ে পিছিয়ে থাকায় মালয়েশিয়া কোনো সুযোগ পেল না। কারণ, এশিয়ান গেমস ক্রিকেটে কোনো ম্যাচে রিজার্ভ ডে রাখা হয়নি। সেমিফাইনালে তাকিয়ে মালয়েশিয়া দলের অবস্থা তাই সেই বাংলা গানের মতো, ‘চেয়ে চেয়ে দেখলাম তুমি চলে গেলে...আমার বলার কিছু ছিল না।’

আরও পড়ুন

শুধু মালয়েশিয়া কেন, কোয়ার্টার ফাইনাল না খেলেই বাদ পড়া হংকং, নেপাল ও আফগানিস্তানেরও একই দশা। লড়াইয়ের টেবিলে ছিল ক্রিকেটের স্তরবিন্যাসে গুণে-মানে অপেক্ষাকৃত শ্রেয়তর দল। তাই এই তিন দলকেও মালয়েশিয়ার মতো প্রতিপক্ষ দলের শেষ চারে ওঠা চেয়ে চেয়ে দেখা ছাড়া বলার কিছু ছিল না।

এমন নয় যে ব্যাপারটা অন্যায়। নিয়ম তো নিয়মই। আর এই নিয়ম শুধু এশিয়ান গেমস ক্রিকেটে নয়, অতীতেও বিভিন্ন টুর্নামেন্টে কার্যকর ছিল। কিন্তু পরিবেশ-পরিস্থিতির মারপ্যাঁচে কখনো কখনো দলগুলো এমন নিয়মের গ্যাঁড়াকলে পড়ে যায়। ক্রিকেটে তো আবার কন্ডিশনের প্রভাব অসামান্য!

২০২৩ এশিয়ান গেমসে সোনাজয়ী ভারত ক্রিকেট দল
এএফপি

যেমনটা হয়েছিল তিন বছর আগে হাংঝুতে সর্বশেষ এশিয়ান গেমসে ছেলেদের ক্রিকেট ইভেন্টের ফাইনালে। আফগানিস্তানে আগে ব্যাটিংয়ে নেমে ১৮.২ ওভারে ৫ উইকেটে ১১২ তোলার পর নেমে আসে বৃষ্টি। খেলা এরপর না হওয়ায় র‌্যাঙ্কিংয়ে শ্রেয়তর অবস্থানের কারণে চ্যাম্পিয়ন হয় ভারত। এতে একটু দুষ্টু ক্রিকেটপ্রেমীদের কিন্তু মনে হতেই পারে, ক্রিকেট কখনো কখনো অগৌরবময় অনিশ্চয়তার খেলাও!

ভারতের তাতে অবশ্য খুব একটা আপত্তি তোলার কথা নয়। কারণ, খেলাধুলায় সাফল্যই শেষ কথা, তেমনি এশিয়ান গেমসে সোনা জেতাও। এবার যেমন ভারতের সমর্থকেরা সমস্বরে গাইতে পারেন, ‘বৃষ্টি রে বৃষ্টি, আয় না জোরে...।’ কিন্তু র‌্যাঙ্কিং-সমীকরণ মাথায় রেখে শেষ চারে ওঠা বাকি তিন দলের সমর্থক হয়তো ওই গানের মুখরাও মাড়াবেন না। আকাশপানে তাকিয়ে তাঁরা সমস্বরে গাইতে পারেন সেই নার্সারি রাইম, ‘রেইন রেইন, গো অ্যাওয়ে!’

আরও পড়ুন

কারণটা আসলে র‌্যাঙ্কিংয়ে। নিশিনে দুটি সেমিফাইনালই অনুষ্ঠিত হবে ১ অক্টোবর। ধরুন, বাংলাদেশ-পাকিস্তান সেমিফাইনাল বৃষ্টির কারণে পরিত্যক্ত হলো। তখন র‌্যাঙ্কিংয়ে বাংলাদেশের (৮ম) চেয়ে শ্রেয়তর অবস্থানের কারণে পাকিস্তান উঠবে ফাইনালে (৬ষ্ঠ)। ভারত-শ্রীলঙ্কা সেমিফাইনালও যদি বৃষ্টিতে পরিত্যক্ত হয়, তাহলে ফাইনালে উঠবে র‌্যাঙ্কিংয়ে শীর্ষে থাকা ভারত। তারপর?

তারপর ফাইনালেও সেই একই সমীকরণ। নিশিনে আগামী ৩ অক্টোবরের ফাইনালও পরিত্যক্ত হলে সোনা জিতবে ভারত। র‌্যাঙ্কিংয়ে তাদের চেয়ে ওপরে যেকোনো দল নেই। শুধু কি তা–ই, একটি তথ্য জেনে ভারতের সমর্থকেরা হয়তো আরও খুশি হবেন, আবহাওয়ার পূর্বাভাস বলছে, দুটি সেমিফাইনাল ও ফাইনালের দিনেও বৃষ্টির প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে নিশিনে।

তাই সেমিফাইনালে ওঠা বাকি তিনটি দলের সমর্থকদের আসলে দুঃখ পাওয়ার কিছু নেই। ক্রিকেটীয় সমাজের স্তরবিন্যাস ঠিক হয় আসলে পারফরম্যান্সে। জাপানের দাওয়াত-বাড়িতে দুটি অসমস্তরের দলের লড়াইয়ের টেবিলে কার থালায় ‘গোশত’ উঠবে, সেটা তো প্রকৃতি ঠিক করে দিচ্ছে।

যত দূর জানা গেছে, প্রকৃতি গান বা প্রার্থনা বোঝে না। তবু মন না মানলে মনে মনে গাইতে পারেন, ‘বৃষ্টি...এসো না/ দিয়ো না দুচোখ ভিজিয়ে।’

আরও পড়ুন