মোস্তাফিজকে নিয়ে এখন পর্যন্ত যা যা হলো
বাংলাদেশ পেসার মোস্তাফিজুর রহমানের এবারের আইপিএলে কলকাতা নাইট রাইডার্সের (কেকেআর) হয়ে খেলার কথা ছিল। তবে ৩ জানুয়ারি ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড বিসিসিআইয়ের নির্দেশে মোস্তাফিজকে দল থেকে বাদ দিয়েছে কেকেআর। উগ্রপন্থীদের দাবির মুখে ভারতীয় বোর্ডের এমন সিদ্ধান্তের পর বাংলাদেশে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া হয়েছে, যা টি–টোয়েন্টি বিশ্বকাপ ও আইসিসি পর্যন্ত গড়িয়েছে। পুরো ঘটনায় এখন পর্যন্ত কী কী হলো, তা থাকছে এই প্রতিবেদনে।
১৬ ডিসেম্বর, ২০২৫
আবুধাবিতে আইপিএল নিলামে মোস্তাফিজুর রহমানকে কেনে কলকাতা নাইট রাইডার্স (কেকেআর)। চেন্নাই সুপার কিংস, দিল্লি ক্যাপিটালসও তাঁকে কিনতে আগ্রহী হওয়ায় কাড়াকাড়ির শেষ পর্যায়ে মোস্তাফিজের দাম ওঠে ৯ কোটি ২০ লাখ রুপি।
১৮ ডিসেম্বর, ২০২৫
বিসিসিআইর অনুরোধে মোস্তাফিজকে আইপিএলে খেলার অনাপত্তিপত্র দেওয়ার কথা জানায় বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি)। বোর্ডের ক্রিকেট পরিচালনা বিভাগের প্রধান নাজমূল আবেদীন জানান, এপ্রিলের মাঝামাঝিতে ৮ দিন বাদে আইপিএলের পুরো সময়ের জন্য ছাড়পত্র দেওয়া হয়েছে।
২৭ ডিসেম্বর, ২০২৫
মোস্তাফিজুর রহমানকে আইপিএল থেকে বাদ দেওয়ার দাবি করেন মধ্যপ্রদেশের উজ্জয়িনীর রিনমুক্তেশ্বর মহাদেব মন্দিরের প্রধান উপাসক মহাবীর নাথ। বাংলাদেশের খেলোয়াড়কে খেলালে পিচ নষ্ট করে দেওয়ার হুমকি দেন তিনি।
৩০ ডিসেম্বর, ২০২৫
নিলাম থেকে মোস্তাফিজকে দলে নেওয়ায় শাহরুখ খানকে ‘গাদ্দার’ বা দেশদ্রোহী আখ্যা দেন উত্তর প্রদেশের শাসক দল বিজেপির নেতা সঙ্গীত সোম। তিনি বলেন, ‘মোস্তাফিজের মতো খেলোয়াড় যদি ভারতে খেলতে আসেন, তাহলে বিমানবন্দরের বাইরে পা রাখতে পারবেন না। আমি প্রতিজ্ঞা করে বলছি। এই কথাটা শাহরুখ খানের মতো গাদ্দারদের বুঝে নেওয়া উচিত। উনি দেশদ্রোহিতা করছেন।’
সঙ্গীত সোমের সুরে কথা বলেন আধ্যাত্মিক গুরু দেবকীনন্দন ঠাকুরও। এক অনুষ্ঠানে তিনি শাহরুখ খান ও কেকেআর ম্যানেজমেন্টের উদ্দেশে বলেন, মোস্তাফিজুর রহমানকে যেন না খেলানো হয়। তবে তাঁর এই মন্তব্যের সমালোচনা করেন উত্তর প্রদেশ বিধানসভার বিরোধী নেতা মাতা প্রসাদ পান্ডে ও কংগ্রেস নেতা সুরেন্দ্র রাজপুত। তাঁরা বলেছেন, শাহরুখ খানকে গাদ্দার বা দেশদ্রোহী বলা হচ্ছে মুসলিম বলে। বিজেপি দলটাই দেশদ্রোহী। বিজেপির শরিক দল সুহেলদেব ভারতীয় সমাজ পার্টির নেতা ওম প্রকাশ রাজভরও সঙ্গীত সোমের সমালোচনা করেন।
২ জানুয়ারি, ২০২৫
সাবেক পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী, কংগ্রেস নেতা ও লোকসভার সদস্য শশী থারুর বলেন, ‘আমি সত্যিই মনে করি না যে ক্রিকেটকে বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার ভার বহন করতে দেওয়া উচিত। আমার দৃষ্টিভঙ্গি স্পষ্ট—আমাদের উচিত কিছু ক্ষেত্রকে অন্য ক্ষেত্র থেকে আলাদা রাখার চেষ্টা করা। মোস্তাফিজুর রহমান একজন ক্রিকেটার, যার এসব ঘটনার সঙ্গে তাঁর কোনো সম্পর্কই নেই। তিনি ব্যক্তিগতভাবে ঘৃণাসূচক কথা, হামলা বা এমন কর্মকাণ্ডকে সমর্থন কিংবা ন্যায্যতা দেওয়ার জন্য কখনো অভিযুক্ত হননি। তিনি একজন ক্রীড়াবিদ আর এ দুটি বিষয়কে মিশিয়ে ফেলাটা অনুচিত।’
৩ জানুয়ারি, ২০২৬
ভারতীয় উগ্রবাদী গোষ্ঠীর হুমকির মুখে মোস্তাফিজুর রহমানকে স্কোয়াড থেকে ছেড়ে দেওয়ার জন্য কলকাতা নাইট রাইডার্সকে নির্দেশ দেয় ভারতের ক্রিকেট বোর্ড (বিসিসিআই)। গুয়াহাটিতে বিসিসিআইয়ের সচিব দেবজিৎ সাইকিয়া ভারতের বার্তা সংস্থা এএনআইকে বলেন, ‘সাম্প্রতিক ঘটনার কারণে বিসিসিআই কেকেআর ফ্র্যাঞ্চাইজিকে তাদের দলে থাকা বাংলাদেশের খেলোয়াড় মোস্তাফিজুর রহমানকে ছেড়ে দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে। তারা যদি খেলোয়াড় বদলাতে চায়, বিসিসিআই সেই অনুমতিও দেবে।’
সাইকিয়ার ঘোষণার ঘণ্টা দুয়েক পরই কলকাতা নাইট রাইডার্সের কাছ থেকে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসে। এক বিবৃতিতে ফ্র্যাঞ্চাইজিটি বাংলাদেশের পেসার মোস্তাফিজকে দল থেকে ছেড়ে দেওয়ার ঘোষণা দেয়। কারণ হিসেবে বিসিসিআইয়ের নির্দেশনার কথা উল্লেখ করে কেকেআর। বিবৃতিতে দলটি লিখেছে, ‘কলকাতা নাইট রাইডার্স নিশ্চিত করেছে যে আইপিএলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে বিসিসিআই/আইপিএল আসন্ন ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগ (আইপিএল) মৌসুমের আগে দল থেকে মোস্তাফিজুর রহমানকে ছেড়ে দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে। যথাযথ প্রক্রিয়া ও পরামর্শ অনুসরণ করে, ভারতীয় ক্রিকেট কন্ট্রোল বোর্ডের (বিসিসিআই) নির্দেশে ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত কার্যকর করা হয়েছে।’
ভারতে প্রতিক্রিয়া
মোস্তাফিজকে আইপিএল থেকে বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানান ভারতের কয়েকজন রাজনীতিবিদ ও ধর্মীয় নেতা। বিজেপি নেতা সংগীত সোম বার্তা সংস্থা এএনআইকে বলেন, ‘১০০ কোটি সনাতনী ভারতীয়দের প্রতি লক্ষ রেখে বিসিসিআইয়ের এই সিদ্ধান্তের জন্য ধন্যবাদ। আমরা গতকাল বলেছিলাম, এ বিষয়ে পদক্ষেপ নেওয়া হবে, কারণ ১০০ কোটি মানুষের আবেগ-অনুভূতিকে হেলাফেলা করা যায় না। এটি গোটা দেশের হিন্দুদের জয়।’
উত্তর প্রদেশের মন্ত্রী ও বিজেপি নেতা নরেন্দ্র কাশ্যপ বলেন, ‘আমরা বিসিসিআইয়ের সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানাই, কারণ তাঁরা দেশের আবেগ-অনুভূতি বুঝেছেন এবং বাংলাদেশি খেলোয়াড়টিকে সরিয়ে দিয়েছেন, যেহেতু বাংলাদেশে হিন্দুদের ওপর অত্যাচার চলছে—এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী মোদি এবং সরকার প্রতিবাদ জানাচ্ছেন।’ দেবকীনন্দনও বিসিসিআইকে ধন্যবাদ জানান।
তবে মোস্তাফিজকে বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্তে বিপরীত প্রতিক্রিয়াও আছে কারও কারও। তাদের একজন কংগ্রেস নেতা শশী থারুর। পুরোনো একটি একটি ভিডিও শেয়ার করে তিনি ক্যাপশনে একটি প্রশ্ন তুলেছেন, ‘এ বিষয়ে আমার মতামত আবার স্মরণ করিয়ে দিচ্ছি—বিশেষ করে এখন, যখন বিসিসিআই নিন্দনীয়ভাবে মোস্তাফিজুর রহমানকে বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সংশ্লিষ্ট বাংলাদেশি খেলোয়াড়টি যদি লিটন দাস বা সৌম্য সরকার হতেন, তাহলে কী হতো? এখানে আমরা আসলে কাকে শাস্তি দিচ্ছি—একটি দেশকে, একজন ব্যক্তিকে নাকি তাঁর ধর্মকে? খেলাধুলাকে এভাবে নির্বিচার রাজনৈতিক রঙে রাঙানো আমাদের শেষ পর্যন্ত কোথায় নিয়ে যাবে?’
বাংলাদেশে প্রতিক্রিয়া
মোস্তাফিজুর রহমানকে বাদ দেওয়ার পর আসন্ন টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে বাংলাদেশ দলের ভারত সফর ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ বলে মন্তব্য করেন জাতীয় ফুটবল দলের সাবেক অধিনায়ক ও দেশের শীর্ষ রাজনৈতিক দল বিএনপির ক্রীড়াবিষয়ক সম্পাদক আমিনুল হক। নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করে আমিনুল গণমাধ্যমকে বলেন, ‘সামনে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ। মোস্তাফিজ ইস্যুতে যা হলো, এরপর আমাদের ক্রিকেটাররা ভারতে গিয়ে খেললে বড় একটা শঙ্কার জায়গা থেকে যাবে।’
উগ্রপন্থীদের দাবির মুখে মোস্তাফিজকে খেলতে না দেওয়ার প্রেক্ষিতে আগামী মাসে বাংলাদেশ দলের ভারতের মাটিতে টি–টোয়েন্টি বিশ্বকাপ খেলা নিরাপদ কি না প্রশ্নে সিলেটে বিসিবি সভাপতি আমিনুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, ‘টুর্নামেন্ট (বিশ্বকাপ) আয়োজন করছে আইসিসি, ভারত হচ্ছে স্বাগতিক। আমাদের কিছু যোগাযোগ করার দরকার হলে আইসিসিতে করব।’ এরপর রাতে বিসিসিআইয়ের সিদ্ধান্তের প্রতিক্রিয়া জানাতে বৈঠক করেন বিসিবি পরিচালকেরা। তবে বৈঠকের সিদ্ধান্ত নিয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য দেওয়া হয়নি।
মোস্তাফিজুর রহমানকে আইপিএল থেকে বাদ দেওয়ার নিন্দা ও প্রতিবাদ জানান যুব ও ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ নজরুল। নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে আসিফ নজরুল লিখেছেন, ‘ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী হিসেবে আমি ক্রিকেট কন্ট্রোল বোর্ডকে (বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডকে) বলেছি, তারা যেন আইসিসির কাছে পুরো বিষয়টি ব্যাখ্যা করে লিখে। বোর্ড যেন জানিয়ে দেয় যে যেখানে বাংলাদেশের একজন ক্রিকেটার চুক্তিবদ্ধ হওয়া সত্ত্বেও ভারতে খেলতে পারেন না, সেখানে বাংলাদেশের গোটা ক্রিকেট টিম বিশ্বকাপ খেলতে যাওয়া নিরাপদ মনে করতে পারে না। বোর্ড থেকে বাংলাদেশের বিশ্বকাপ খেলাগুলো শ্রীলঙ্কায় করার অনুরোধ জানানোর নির্দেশনাও আমি দিয়েছি।’ এ ছাড়া তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টাকে বাংলাদেশে আইপিএল খেলার সম্প্রচারও বন্ধ করে দেওয়ার অনুরোধের কথাও জানান তিনি।
বাংলাদেশের পেসার মোস্তাফিজুর রহমানকে আইপিএলের ২০২৬ আসর থেকে বাদ দেওয়ার ঘটনায় অসন্তোষ প্রকাশ করেন ফেসবুকে পোস্ট দেন সংস্কৃতিবিষয়ক উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী। তিনি ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড-বিসিসিআইয়ের সিদ্ধান্তটিকে ‘ন্যক্কারজনক’ বলে অভিহিত করেন।