ক্রিকেটের প্রথম ‘টেস্ট’ এবং জুয়াড়ি ও মদ্যপ এক উইকেটকিপারের গল্প
কীভাবে শুরু হয়েছিল টেস্ট ক্রিকেট, কেমন ছিল ইতিহাসের প্রথম টেস্ট—সেই গল্পটাই লিখেছেন অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেট লেখক ও চলচ্চিত্র নির্মাতা জ্যারড কিম্বার। ১৫ মার্চ, টেস্ট ক্রিকেটের ইতিহাসে প্রথম দিনটায় গুডএরিয়াস ব্লগে প্রকাশিত তাঁর এই লেখাটার বাংলা ভাষান্তর প্রথম আলোর পাঠকদের জন্য।
ইতিহাসের প্রথম টেস্টটা অস্ট্রেলিয়া জিতেছিল ৪৫ রানে। সেই ম্যাচে ইংল্যান্ড ‘বাই’ থেকে অতিরিক্ত ৯ রান দিয়েছিল। হয়তো ওই ৯ রান ম্যাচের ফলে খুব একটা প্রভাব ফেলেনি। কিন্তু সুযোগ থাকলে ইংল্যান্ড নিশ্চয়ই অন্য কোনো উইকেটকিপারকে দলে নিত।
সেই ম্যাচে ইংল্যান্ডের প্রথম পছন্দ ছিলেন টেড পুলি। কিন্তু যখন মাঠে খেলা চলছে, পুলি তখন ক্রাইস্টচার্চের এক আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে বিচারের অপেক্ষায়।
টেড পুলি মানুষটা কখনোই খুব সহজ-সরল ছিলেন না। এমনকি তিনি ‘মারা’ও গিয়েছিলেন দুবার! প্রথমবার, যখন খবরের কাগজে ছাপা হলো তিনি যকৃতের ক্যানসারে মারা গেছেন। পরে দেখা গেল, খবরটি ভুল।
পুলি ছিলেন জাত ক্রিকেটার। ক্যারিয়ার শুরু করেছিলেন বোলার হিসেবে, সঙ্গে মারকুটে ব্যাটিংও পারতেন। পরে অধিনায়ককে পটিয়ে উইকেটকিপিং শুরু করেন এবং সমসাময়িকদের মধ্যে অন্যতম সেরা হয়ে ওঠেন। এক ম্যাচে গ্লাভস হাতে ১২টি ডিসমিসাল আছে তাঁর, যার মধ্যে চারটিই ছিল স্টাম্পিং। ক্যারিয়ারের শুরুতে সারে কাউন্টির নজর কাড়তে নিজের বয়স কমিয়েছিলেন কাগজে-কলমে। একবার লাঞ্চের বিরতিতে অন্য খেলোয়াড়ের সঙ্গে বাজি ধরে জেতা শ্যাম্পেন খেয়ে মাতাল হয়ে গিয়েছিলেন। শোনা কথা, সেই বাজিতে আর্থিক লেনদেনও হয়েছিল। সারে কর্তৃপক্ষ বাধ্য হয়ে লাঞ্চের পর তুলনামূলক সুস্থ এক কিপারকে মাঠে নামায়। এ ছাড়া একবার ম্যাচ ফিক্সিংয়ের সন্দেহও জেগেছিল তাঁকে নিয়ে।
পুলি তিনটি জিনিস খুব ভালোবাসতেন—জুয়া, মদ্যপান আর উইকেটকিপিং। উইজডেন তাঁর সম্পর্কে একবার লিখেছিল, ‘পুলির ব্যক্তিগত চরিত্রের যেসব ত্রুটি তাঁর ক্যারিয়ারকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছিল এবং শেষ জীবনে তাঁকে চরম দারিদ্র্যের মুখে ঠেলে দিয়েছিল, তা নিয়ে এখন আর কথা না বলাই ভালো। তিনি নিজেই ছিলেন নিজের শত্রু। তবে শেষ দিন পর্যন্ত তাঁর রসবোধ ও অমায়িক ব্যবহার মানুষের মন জয় করে রেখেছিল।’
গ্লাভস হাতে তাঁর অসাধারণ দক্ষতার কারণেই তাঁকে অস্ট্রেলিয়াগামী জাহাজে তোলা হয়েছিল। ৩৭০টি প্রথম শ্রেণির ম্যাচে সেঞ্চুরি মাত্র একটি। কিন্তু আক্রমণাত্মক ব্যাটিংয়ের জন্য তাঁর বেশ নামডাক ছিল। আঙুল ভাঙা অবস্থায় এক ম্যাচে ৯৩ রানের ইনিংস খেলেছিলেন। আজকের আধুনিক উইকেটকিপারদের যে রূপ আমরা দেখি, পুলি ছিলেন ঠিক তারই আদি সংস্করণ—একগুঁয়ে, লড়াকু আর বেশ চটপটে। তবে তাঁর সেই ‘চটপটে’ স্বভাবটা মাঝেমধ্যে অপরাধের সীমানা ছুঁয়ে ফেলত। আজকের যুগে হলে নির্ঘাত তিনি ফিক্সিংয়ের দায়ে নিষিদ্ধ হতেন। কিন্তু সেই সময়ে তাঁর ‘দুষ্টুমি’গুলো ছিল ক্রিকেটেরই অংশ।
আপনার যদি মনে হয়, সেই সময়েও ইংল্যান্ডের ক্রিকেট মানেই বিকেলবেলা ধোঁয়া ওঠা চা, সঙ্গে স্যান্ডউইচ, তবে ভুল করবেন। ক্রিকেটের জন্ম হয়েছিল রাস্তার খেলা হিসেবে। এরপর হ্যাম্বলডন ক্লাব এসে কিছু কড়া নিয়ম বানাল, যাতে বাজি ধরতে সুবিধা হয়! ক্রিকেট শুধু বিশ্বের প্রথম আন্তর্জাতিক খেলাই ছিল না, এটি ছিল আধুনিক স্পোর্টস বিজনেস বা ব্যবসারও শুরু। লোকে যাতে টিকিট কেটে খেলা দেখে, সে জন্য মাঠের চারদিকে বেড়া দেওয়া হলো, ডব্লিউ জি গ্রেস খেললে টিকিটের দাম বাড়িয়ে দেওয়া হলো। ইংল্যান্ড দল যে সেবার অস্ট্রেলিয়া সফরে গিয়েছিল, তার একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল পয়সা কামানো। নিউজিল্যান্ডে যাওয়ার পর দেখা গেল, খবরের কাগজগুলোতে বাজির দর ছাপা হচ্ছে। ক্রিকেটে প্রথম ম্যাচ ফিক্সিংয়ের ঘটনা ঘটেছিল এরও প্রায় ৫০ বছর আগে। মানুষ আসলে সব সময়ই টাকার কাঙাল ছিল!
টেড পুলি টাকা উপার্জনের নেশায় একটু বেশিই বুঁদ ছিলেন। ক্রাইস্টচার্চে এক ম্যাচে চোটের কারণে তিনি খেলতে পারলেন না। বসে না থেকে তিনি রালফ ডনকিন নামের এক রেলওয়ে প্রকৌশলীর সঙ্গে বাজি ধরলেন। ডনকিন পেশাদার বুকি ছিলেন না। তিনি প্রত্যেক ব্যাটসম্যানের সুনির্দিষ্ট স্কোরের ওপর বাজি ধরছিলেন। বুদ্ধিমান পুলি সব ব্যাটসম্যানের ‘ডাক’ বা শূন্য রানের ওপর বাজি ধরেন। নিউজিল্যান্ডের দলটিতে তখন ২৫ জন খেলোয়াড় ছিল (সেই আমলে শক্তির ভারসাম্য রাখতে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে বেশি খেলোয়াড় নিয়ে নামার নিয়ম ছিল)। বেশি খেলোয়াড় মানেই শূন্য রানে আউট হওয়ার সম্ভাবনা বেশি—পুলির হিসাবটা ছিল পাকা।
মজার ব্যাপার হলো, সেই ম্যাচে পুলি নিজেই আম্পায়ারিং করেছিলেন! আশ্চর্যের বিষয়, কেউ তাঁর আম্পায়ারিং নিয়ে প্রশ্ন তোলেনি। সে ম্যাচে ১১ জন ব্যাটসম্যান শূন্য রানে আউট হন এবং পুলি ৩৬ পাউন্ড জিতে নেন। আজকের বাজারে যার মূল্য প্রায় ৪ হাজার ২০০ পাউন্ড!
গন্ডগোলটা বাধল বাজির টাকা বুঝে নেওয়ার সময়। ডনকিনের সঙ্গে তাঁর হাতাহাতি হলো। সহজ ভাষায় বলতে গেলে, পুলি ডনকিনকে আচ্ছামতো পিটিয়েছিলেন। মুখে তিনটি ঘুষি আর জামাকাপড় ছিঁড়ে একাকার! ডনকিনের মনে হয়েছিল পুলি তাঁকে ঠকিয়েছেন। পুলি টাকা নিয়ে নিউজিল্যান্ডের ডানেডিনে চলে যান, কিন্তু সেখান থেকে পুলিশ তাঁকে গ্রেপ্তার করে আবার ক্রাইস্টচার্চে নিয়ে আসে। ফিক্সিংয়ের জন্য নয়, বরং ডনকিনকে মারধরের জন্য তাঁর ৫ পাউন্ড জরিমানা হয়। ডনকিনের সম্পত্তি নষ্ট করার অভিযোগে তাঁকে বিচারের মুখোমুখি হতে হয়। সাক্ষী না পাওয়ায় বিচার ঝুলে থাকে এবং পুলি সেই ঐতিহাসিক প্রথম টেস্টটি মিস করেন।
সেই প্রথম টেস্টের গল্পটাও বেশ অদ্ভুত। অস্ট্রেলিয়ার ওপেনার চার্লস ব্যানারম্যান ছিলেন ইংল্যান্ডে জন্ম নেওয়া ক্রিকেটার। সেই ম্যাচেই তিনি প্রথম বল খেললেন, প্রথম রান নিলেন, প্রথম সেঞ্চুরি এবং প্রথম রিটায়ার্ড হার্ট হওয়ার রেকর্ড গড়লেন। তাঁর ১৬৫ রানের ইনিংসটি এখনো এক অনন্য রেকর্ড—দলের মোট রানের (২৪৫) ৬৭ শতাংশই ছিল তাঁর একার। অথচ পরে ব্যানারম্যান হারিয়ে গেলেন জুয়া আর মদে ডুবে। একসময় তিনি আম্পায়ারিং শুরু করেন এবং আম্পায়ার থাকা অবস্থাতেই বুকি বা বাজিকর হিসেবে কাজ করতেন!
ওই সময় অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেটকে কেউ পাত্তা দিত না। কিন্তু ইংল্যান্ড দল ছিল ক্লান্ত আর সমুদ্রযাত্রায় অসুস্থ। দলে জেমস সাউদারটন নামে একজন ছিলেন ৪৯ বছরের বুড়ো!
টম কেন্ডাল নামের অস্ট্রেলিয়ার এক বোলার (যিনিও ইংল্যান্ডে জন্মেছিলেন) দ্বিতীয় ইনিংসে ৭ উইকেট নিয়ে ইংল্যান্ডকে হারিয়ে দেন। সেই সময় অস্ট্রেলিয়ার মতো ছোট এক দ্বীপরাষ্ট্রের কাছে ইংল্যান্ডের হার ছিল বিশাল ঘটনা। অস্ট্রেলিয়ার এক পত্রিকা লিখেছিল, ‘এই জয় প্রমাণ করে যে পেশিশক্তি আর খেলার মাঠে সারের বা ইয়র্কশায়ারের ইংলিশদের চেয়ে অস্ট্রেলীয়রা কোনো অংশে কম নয়।’
এতক্ষণ যে ম্যাচের গল্প শুনলেন, সেটাকে ইতিহাসের প্রথম টেস্ট বলা হয়। কিন্তু স্টার ওয়ারস সিনেমার সেই বিখ্যাত ডায়ালগের মতো যদি বলা হয়, ‘এতক্ষণ যা শুনলে, তার প্রতিটি শব্দই ভুল...!’
আসলেই সেটা অস্ট্রেলিয়া-ইংল্যান্ডের ম্যাচ ছিল না; ছিল ‘কম্বাইন্ড অস্ট্রেলিয়া একাদশ’ বনাম ‘লিলিহোয়াইটস একাদশ’। ডব্লিউ জি গ্রেস সেই সফরে যাননি। ফ্রেড স্পফোর্থ খেলেননি কারণ তাঁর প্রিয় উইকেটকিপারকে দলে নেওয়া হয়নি বলে। জেমস লিলিহোয়াইট স্রেফ পয়সা কামানোর জন্য একদল পেশাদার ক্রিকেটার নিয়ে এই সফরের আয়োজন করেছিলেন। এটি কোনো জাতীয় দলের ম্যাচ ছিল না।
তাহলে এই সাধারণ ম্যাচটি ‘টেস্ট’ হলো কীভাবে? এখানে দৃশ্যপটে আসেন ক্লারেন্স মুডি। দক্ষিণ অস্ট্রেলিয়ার এই ক্রিকেট লেখক ১৮৯৪ সালে একটি বই লিখেছিলেন। সেখানে তিনি নিজের ইচ্ছেমতো কিছু ম্যাচকে ‘টেস্ট’ হিসেবে তালিকাভুক্ত করেন। কোনো ক্রিকেট বোর্ড বা এমসিসি নয়, স্রেফ অ্যাডিলেডের এক অখ্যাত লেখকের করা সেই তালিকাটিই পরে ক্রিকেটের ইতিহাসে দাপ্তরিক স্বীকৃতি পেয়ে যায়। বিখ্যাত ক্রিকেট লেখক গিডিওন হেইগ যেমনটা বলেছিলেন, ‘আরও ভালো কিছুর অভাবে এটাই মানদণ্ড হয়ে দাঁড়িয়েছে।’
এভাবেই এক ম্যাচ ফিক্সিং কেলেঙ্কারি, তারকাদের অনুপস্থিতি আর এক সাংবাদিকের খেয়ালি তালিকার ওপর ভিত্তি করে জন্ম নিল টেস্ট ক্রিকেট।
ও আচ্ছা, টেড পুলির গল্পটা তো শেষ করা হয়নি। ওই সফরের পর তাঁর ক্যারিয়ার আর এগোয়নি খুব একটা। শেষ জীবনে দেউলিয়া হয়ে নিঃস্ব অবস্থায় মারা যান তিনি। ৩৭০টি প্রথম শ্রেণির ম্যাচে ৯ হাজার ৩৪৫ রান আছে তাঁর, উইকেটের পেছনে অসংখ্য ডিসমিসাল।
কিন্তু ইতিহাসের প্রথম টেস্টটি আর খেলা হয়নি তাঁর।