যে দেশে কখনো যাননি, সে দেশের হয়ে বিশ্বকাপ খেলতে নামছেন তিনি
আগামী ৯ ফেব্রুয়ারি স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে টি–টুয়েন্টি বিশ্বকাপে প্রথম ম্যাচ খেলবে ইতালি। সেদিন ইতালির এমন একজন খেলোয়াড় মাঠে নামবেন, যিনি কখনো দেশটিতেই যাননি। সেই ক্রিকেটার হলেন জে জে স্মাটস।
দক্ষিণ আফ্রিকায় জন্ম নেওয়া ও দক্ষিণ আফ্রিকার হয়ে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট খেলা এই ক্রিকেটার এখন আছেন ইতালির টি-টুয়েন্টি বিশ্বকাপ দলে। মূলত বিবাহ সূত্রে তিনি ইতালির নাগরিক। যদিও তিনি কখনো দেশটিতে যাননি। তবু স্মাটসের দাবি, ইতালিয়ান মানসিকতা তিনি ইতিমধ্যেই কিছুটা বুঝে গেছেন এবং নিজেকে এই দলে মানিয়ে নিতে পারছেন।
দুবাই থেকে ক্রিকেটভিত্তিক পোর্টাল ‘ক্রিকইনফো’কে স্মাটস বলেন, ‘ইতালিয়ান মানুষ খুবই আবেগপ্রবণ। আমরা যখন খেলি, সেই আবেগটা মাঠে ফুটে ওঠে। আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে আমাদের প্রথম জয়টা আমি নিজে দেখেছি ও অনুভব করেছি। এটা বড় কোনো দলের বিপক্ষে ইতালির প্রথম জয়। আমরা এখন বিশ্বাস করি, এমন দলগুলোর সঙ্গেও আমরা লড়তে পারি।’
গত ২৬ জানুয়ারি জয়ের পথে আয়ারল্যান্ডকে মাত্র ১৫৪ রানে অলআউট করে ইতালি। ম্যাচে স্মাটস ১৮ রানে নেন ২ উইকেট। এর আগেই অবশ্য ইউরোপের আঞ্চলিক ফাইনালে ইতালি হারিয়েছিল স্কটল্যান্ডকে। বাংলাদেশকে বাদ দিয়ে শেষ মুহূর্তে টি–টুয়েন্টি বিশ্বকাপে স্কটল্যান্ডকে নিয়েছে আইসিসি।
স্মাটস অবশ্য ইউরোপের আঞ্চলিক বাছাই টুর্নামেন্টে ইতালি দলে ছিলেন না। তবে ইতালিয়ান ক্রিকেট ফেডারেশনের সঙ্গে তাঁর আলোচনা চলছিল বেশ কিছুদিন ধরে। ইতালির ক্রিকেট তখন দলের জন্য অভিজ্ঞ খেলোয়াড় খুঁজছিল। সে ধারাতেই মূলত স্মাটসের ইতালি দলে যোগ দেওয়া। স্মাটস বলেন, ‘প্রায় দুই বছর ধরে আমাদের কথাবার্তা চলছিল। কিন্তু সূচি, ঘরোয়া লিগের চুক্তি, এসব কারণে তখন কিছুই চূড়ান্ত করা যায়নি।’
গত ১৯ বছর ধরে স্মাটস দক্ষিণ আফ্রিকায় ঘরোয়া ক্রিকেট খেলছেন। বেশির ভাগ সময় তিনি খেলেছেন নিজের অঞ্চল ইস্টার্ন কেপ ও ওয়ারিয়র্স ফ্র্যাঞ্চাইজির হয়ে, আর সাম্প্রতিক সময়ে ছিলেন ডারবানভিত্তিক ডলফিনস দলে। ওপেনিংয়ে ধারাবাহিক, ‘ক্লিন হিটিং’ ও নিয়ন্ত্রিত বাঁহাতি স্পিনের জন্য তিনি পরিচিত। ২০১৭ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে তিনি দক্ষিণ আফ্রিকার জাতীয় দলের হয়েও খেলেছেন। জাতীয়তা বদলে নতুন কোনো আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার গড়ার বড় কোনো পরিকল্পনা তাঁর ছিল না। বরং তাঁর স্ত্রী জুডি স্মাটসের পারিবারিক পূর্বপুরুষের সূত্র ধরে পুরো পরিবারের জন্য ইতালিয়ান পাসপোর্টের ব্যবস্থা করেন, যাতে ভ্রমণ ও কাজের সুযোগ সহজ হয়। প্রায় চার বছর আগে স্মাটস সেই কাগজপত্র হাতে পান।
ক্রিকেট খেলাটা মানসিকভাবে খুব কঠিন। আবেগ, উত্তেজনা, ওঠানামা সব মিলিয়ে ব্যাপারটা সহজ নয়। তবে আমি সব সময় আমার ডাক্তারের সঙ্গে যোগাযোগ রাখি। এটা এমন একটা ব্যাপার, যেটার সঙ্গে আমাকে মানিয়ে নিতে হয়েছে।ইতালি দলের ক্রিকেটার জে জে স্মাটস
তবে ৩৭ বছর বয়সে এসে ইতালির জাতীয় দলে ডাক পাবেন, বিশেষ করে বিশ্বকাপের মতো বড় আসরের জন্য, এমনটা স্মাটস কল্পনাও করেননি। স্মাটস বলেন, ‘আমি কখনো ভাবিনি বিশ্বকাপ খেলব। তবে নিজেকে সব সময় আন্তর্জাতিক মানের জন্য প্রস্তুত রাখার চেষ্টা করতাম। দক্ষিণ আফ্রিকার হয়ে খুব বেশি ম্যাচ খেলিনি, কিন্তু যতটা খেলেছি, তাতে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কী তা বুঝেছি। শেষ দিকে কয়েকটি ম্যাচে ভালো করেছিলাম, সেখান থেকেই আত্মবিশ্বাস পেয়েছি। জানি আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কতটা কঠিন, কিন্তু এটাও জানি যে এখনো আমি অবদান রাখতে পারি।’
২০১৭ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে স্মাটস দক্ষিণ আফ্রিকার হয়ে ৬টি ওয়ানডে ও ১৬টি টি-টুয়েন্টি ম্যাচ খেলেছেন। তাঁর ক্যারিয়ারের সেরা পারফরম্যান্স আসে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ওয়ানডে ম্যাচে। যেখানে তিনি করেন ৮৪ রান ও ৪২ রানে নেন ২ উইকেট।
করোনা-পরবর্তী সময়ে দীর্ঘ বিরতি, দক্ষিণ আফ্রিকার ক্রিকেট কাঠামোর ভেতরের অস্থিরতা ও দলে তীব্র প্রতিযোগিতার কারণে স্মাটস নিজের জায়গা ধরে রাখতে পারেননি। এ নিয়ে অবশ্য কোনো আক্ষেপ নেই স্মাটসের কণ্ঠে, ‘সব ক্রিকেটারই মনে করে, আরও লম্বা সময় খেলতে পারত। কিন্তু দক্ষিণ আফ্রিকা সব সময়ই দারুণ সব ক্রিকেটার তৈরি করেছে। আমাদের দলে বিশ্বমানের তারকা অনেক, প্রতিযোগিতা খুব কঠিন। তাই কয়েকটা ম্যাচ খেলে আবার ছিটকে পড়া খুব স্বাভাবিক।’
স্মাটসের যাত্রাটা অবশ্য সহজ ছিল না। পুরো ক্যারিয়ারজুড়েই তিনি খেলেছেন টাইপ–১ ডায়াবেটিস নিয়ে। প্রতিদিন তিনি ‘ছয় থেকে আটবার’ রক্তে শর্করার মাত্রা পরীক্ষা করেন এবং দিনে অন্তত চারবার ইনসুলিন নিতে হয়। স্মাটস বলেন, ‘ক্রিকেট খেলাটা মানসিকভাবে খুব কঠিন। আবেগ, উত্তেজনা, ওঠানামা সব মিলিয়ে ব্যাপারটা সহজ নয়। তবে আমি সব সময় আমার ডাক্তারের সঙ্গে যোগাযোগ রাখি। এটা এমন একটা ব্যাপার, যেটার সঙ্গে আমাকে মানিয়ে নিতে হয়েছে।’
বিশ্বকাপ ‘সি’ গ্রুপে আছে ইতালি। যেখানে স্কটল্যান্ড, নেপাল, ইংল্যান্ড ও ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে খেলবে তারা। লড়াইটা যে চ্যালেঞ্জ কঠিন হবে, তা অজানা নয় স্মাটসের। তবু দল নিয়ে আশাবাদী তিনি, ‘ক্রিকেটের ইতিহাসই বলে দেয়, অঘটন ঘটে। আমাদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো মানসিকভাবে প্রস্তুত থাকা, বড় দলগুলোর সঙ্গে লড়াই করতে রাজি থাকা। টি-টুয়েন্টি ক্রিকেটের সৌন্দর্য এখানেই। একজন খেলোয়াড়ের একমুহূর্তের অসাধারণ পারফরম্যান্স পুরো ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে।’
ইতালিয়ান ক্রিকেটের জন্য বিশ্বকাপ কেন গুরুত্বপূর্ণ তা ব্যাখ্যা করে স্মাটস বলেছেন, ‘এই টুর্নামেন্টের মাধ্যমে আমরা সচেতনতা তৈরি করতে পারি, ইতালিতে ক্রিকেট ছড়িয়ে দিতে পারি। ২০ দলের বড় একটি টি-টুয়েন্টি বিশ্বকাপ মানে হলো ক্রিকেটের বৈশ্বিক বিস্তার, নতুন নতুন দেশে খেলাটার পৌঁছে যাওয়া।’