১৫৬ রান টি–টোয়েন্টিতে অনতিক্রম্য নয়, হারারে স্পোর্টস ক্লাব মাঠের উইকেটে তো আরও নয়। কিন্তু আজ জিম্বাবুয়ের সেই রানটাই বাংলাদেশের সিরিজ জয়ের পথে অনতিক্রম্য বাধার দেয়ালে পরিণত। শেষ ওভারে জেতার জন্য দরকার ছিল ১৯ রান। ১ উইকেট হারিয়ে বাংলাদেশ করতে পারল মাত্র ৮।

ইনিংসের দ্বিতীয় ওভারে ব্যাটের কানায় লাগিয়ে ক্যাচ দিয়েছেন ওপেনার লিটন দাস। শুরুর এই ধাক্কা আর সামলাতে পারেনি বাংলাদেশ। জিম্বাবুয়েকেই সম্ভাব্য জয়ী বলে মনে হচ্ছিল বাংলাদেশের ইনিংসের প্রায় পুরোটা সময়। ২৭ বলে অপরাজিত ৩৯ রানের ইনিংসে আফিফ হোসেন হয়তো কিছু হাততালি পেয়েছেন। এর বাইরে আর কারো ব্যাটিং দেখেই মনে হয়নি ম্যাচটা টি–টোয়েন্টি এবং সিরিজ জিততে এই ম্যাচ জেতা চাই বাংলাদেশের। নাটকীয়ভাবে অধিনায়কত্ব পেয়ে যাওয়া মোসাদ্দেক হোসেন যাতে বিপরীত অর্থে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন। জঘন্য এক শট খেলে আউট হয়ে গেছেন প্রথম বলেই।

বলতে পারেন এই একই উইকেটে জিম্বাবুয়ের ব্যাটসম্যানরাও তো ধুঁকেছে। প্রথম ৬ উইকেট হারিয়েছে ৬৭ রানে। কিন্তু এরপর? রায়ান বার্ল–লুক জঙ্গুয়ে মিলে যে তাণ্ডবটা চালালেন, সেরকম ব্যাটিং বাংলাদেশের ইনিংসে কোথায়! জিম্বাবুয়ের সাদামাটা বোলিংটাও যেন হয়ে দাঁড়ালো বিষাক্ত।

default-image

এর আগে জিম্বাবুয়ের ইনিংসের শেষ বলটা করার পর মোস্তাফিজুর রহমানের মুখটা হয়েছিল দেখার মতো। বিড় বিড় করে যেন বলছিলেন, ‘এমন ক্যাচ কেউ মিস করে!’ পেছন থেকে এসে পিঠে হালকা চাপড় দিয়ে সান্ত্বনা দিয়ে গেলেন উইকেটকিপার লিটন দাস। ক্যাচ ছেড়ে মাটিতে হালকা গড়াগড়ি খাওয়া আফিফ তখনো সোজা হয়ে উঠে দাঁড়াতে পারেননি। এই সুযোগে ক্যাচ তুলেও বেঁচে যাওয়া ব্রাডলি এভান্স আর ভিক্টর নিয়াউচি দৌড়ে প্রান্ত বদল করলেন তিনবার। যে বলে আউট হয়, সেই বলে ৩ রান!

জিম্বাবুয়ের ইনিংসের এই শেষ দৃশ্যটাকে বলতে পারেন প্রতীকী। আফিফের ক্যাচ ছাড়ার মতো শুরুতে নেওয়া বোলিংয়ের নিয়ন্ত্রণটাও যে ফসকে গেছে বাংলাদেশের বোলারদের হাত থেকে!

১৩ ওভারের মধ্যে ৬৭ রানে ৬ উইকেট নেই, এমনকি ইনিংসের ১৪তম ওভার শেষেও জিম্বাবুয়ের রান ছিল ৬ উইকেটে ৭৬। সেই স্কোরটাই যে ২০ ওভার পর ২ উইকেট হাতে রেখে ১৫৬ হয়ে গেল, সেটা তো ওই বোলিংয়ের নিয়ন্ত্রণ ফসকানোতেই। শুরুতে একের পর এক উইকেট হারিয়ে টালমাটাল জিম্বাবুয়ের ইনিংসে শেষ পর্যন্ত অলঙ্কার হলো একটা রেকর্ডও।

বার্ল–জঙ্গুয়ে মিলে সপ্তম উইকেট জুটিতে ৩১ বলে করেছেন ৭৯ রান। টি–টোয়েন্টির সপ্তম উইকেটে দ্রুততম জুটি, বাংলাদেশের বিপক্ষে যে কোনো উইকেট জুটিতেই রেকর্ড। খেলা না দেখে থাকলেও বলের সংখ্যাটা দেখেই নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন বার্ল–জঙ্গুয়ে মিলে নিশ্চিত কারও ওপর ঝড় বইয়ে দিয়েছেন। বাংলাদেশের সেই দুর্ভাগা বোলারের নাম নাসুম আহমেদ।

বাঁহাতি স্পিনার নাসুমের জন্য দুঃস্বপ্ন হয়ে রইল ইনিংসের ১৫তম ওভার। যা থেকে এসেছে ৩৪ রান, সবই বার্লের ব্যাট থেকে। প্রথম চার বলে চার ছক্কা। পঞ্চম বলে লং অন দিয়ে চার। শেষ বলে আবার ছক্কা লং অফ দিয়ে। টি–টোয়েন্টিতে বাংলাদেশের আর কোনো বোলার এর আগে এক ওভারে এত বেশি রান দেননি। অবশ্য আন্তর্জাতিক টি–টোয়েন্টিতেই এক ওভারে এর চেয়ে বেশি রান দেওয়ার ঘটনা আছে মাত্র দুটি। ওই ঝড়ের পর নাসুম হয়তো সান্ত্বনা খুঁজেছেন এই ভেবে যে, ৬ বলে ৩৬–তো হয়নি!

টি–টোয়েন্টির ব্যাটিংয়ের একটা ফর্মুলাই হলো, সব ওভারে চড়াও হওয়ার দরকার নেই। দুই–একজন বোলারের দু–চারটি ওভারকে টার্গেট করো, তেড়েফুঁড়ে মেরে দলের রানটা বাড়িয়ে নাও। বাংলাদেশের বোলার–ফিল্ডারদের দর্শক বানিয়ে ১৫ থেকে ১৭তম ওভার পর্যন্ত সেটাই করে গেলেন জিম্বাবুয়ের দুই ব্যাটসম্যান। অথচ বাংলাদেশের ব্যাটিংয়ে দেখা যায়নি সেই পরিকল্পনাটাই। কী এক অজানা আতঙ্কই যেন পেয়ে বসেছিল সবাইকে।

default-image

হাসান মাহমুদের করা ১৬তম ওভারে জঙ্গুয়ের দুই বাউন্ডারিতে ১০, ১৭তম ওভারে জঙ্গুয়ে ও বার্ল দুজনের হাতে দুই ছক্কা খেয়ে মেহেদী দিয়েছেন ১৭ রান। এরপর শেষ তিন ওভারে জিম্বাবুয়ের সীমানা ছাড়া শট একটাই, ৯ রান আসা ১৮তম ওভারে মোস্তাফিজকে লং অন দিয়ে মারা জঙ্গুয়ের ছক্কা। শেষ দুই ওভারে কোনো বাউন্ডারি নেই। ১৯তম ওভারে হাসান মাহমুদের বলে জঙ্গুয়ে–বার্ল দুজনকেই হারিয়ে এই দুই ওভার থেকে জিম্বাবুয়ে পেয়েছে মাত্র ১০ রান।

তাতে কি? বার্লের ওই ঝড়ে কাজের কাজ তো হয়ে গেছে আগেই। বাংলাদেশের বোলারদের হাত থেকে সেই যে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণটা হারালো, সেটা আর নিতে পারেননি ব্যাটসম্যানরাও। বাংলাদেশ পুরো ২০ ওভার ব্যাট করে এলেও ম্যাচ তো আসলে ওখানেই শেষ!

ক্রিকেট থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন