জেলেই মরতে রাজি ইমরান খান, তবু নীতির প্রশ্নে আপস নয়

প্রায় ১ হাজার দিন কারাগারে বন্দী ইমরান খান।ইমরান খানের ইনস্টাগ্রাম
কারাবন্দী সাবেক পাকিস্তান অধিনায়ক ও দেশটির সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানকে নিয়ে ব্রিটেনের দ্য টাইমস পত্রিকায় লিখেছেন সাবেক ইংল্যান্ড অধিনায়ক মাইকেল আথারটন। প্রথম আলোর পাঠকদের জন্য লেখাটির বাংলা ভাষান্তর।

গত শনিবার সকালের কথা।

একটু বেলা করে ঘুমানোর ইচ্ছা ছিল কাসিম খানের। কিন্তু পাশের বাড়িতে বোধহয় কোনো কিছু ভাঙাভাঙির কাজ চলছে। ঠুকঠাক শব্দে ঘুমটা ভেঙে গেল সাতসকালেই। বিরক্তি নিয়ে ফোন হাতে নিতেই বুকটা ধক করে উঠল। পাকিস্তান থেকে দুটো মিসড কল! দ্রুত ছুটলেন বড় ভাই সুলায়মানের ঘরে। ২৯ বছরের সুলায়মান আর ২৬ বছরের কাসিম—দুই ভাই একসঙ্গে বসে কল ব্যাক করলেন। কথা বললেন তাঁদের বাবার সঙ্গে। বাবার নাম ইমরান খান।

এই বছর জানুয়ারির পর এই প্রথম বাবার সঙ্গে কথা হলো দুই ছেলের। পাক্কা ২৮ মিনিট!

মা-বাবার সঙ্গে ফোনে কথা বলাটা আমাদের কাছে খুব স্বাভাবিক এক ব্যাপার। এর কোনো আলাদা মাহাত্ম্যের কথা মনে হয় না এই বয়সের ছেলেমেয়েরা ভাবে। বরং অনেক সময় আমরা কাজটা করি একেবারে দায়সারাভাবে, হয়তো অবহেলাও করি।

কিন্তু ভাবুন তো, যদি আপনার বাবার সঙ্গে আপনার মাসের পর মাস যোগাযোগ না থাকে? যদি জানা না থাকে, আবার কবে কথা হবে, কিংবা আদৌ কোনো দিন আর দেখা হবে কি না! যখন আপনার বাবা একজন ‘রাজনৈতিক বন্দী’ এবং আপনি জানেন না তাঁর শরীরের অবস্থা ঠিক কেমন! তখনো কি একই রকম হয় ফোনালাপটা?

এই লেখার লেখক সাবেক ইংল্যান্ড অধিনায়ক মাইক আথারটনের সঙ্গে ইমরানের দুই ছেলে সুলায়মান ও কাসিম (ডানে)।
দ্য টাইমস

যাঁরা ইমরান খানকে চেনেন, তাঁরা জানেন মাঠের ক্রিকেটে বা রাজনীতির ময়দানে তিনি যেমন ‘ডমিনেটিং’, ফোনালাপেও ঠিক তেমন। তাঁর দুই ছেলেও সেটাই বলছিলেন—ওপাশে বাবা কথা বলেন, এপাশে তাঁরা শুধু শুনে যান। সুলায়মান বলছিলেন, ‘আমরা শুরুতে ওনার শরীর-স্বাস্থ্য নিয়ে জানতে চাই। কিন্তু বাবা খুব দ্রুতই আমাদের জীবন নিয়ে জ্ঞানগর্ভ কথা শোনাতে শুরু করেন। জেলখানায় একাকী সময়ে তিনি নাকি জীবন নিয়ে অনেক গভীর চিন্তার সুযোগ পেয়েছেন। প্রথম দশ মিনিট চলে ওনার লেকচার, তারপর সুযোগ মেলে আমাদের কথা বলার।’

আরও পড়ুন

কাসিম যোগ করলেন, ‘শারীরিক অবস্থার কথা জিজ্ঞেস করলে বাবা সেটা উড়িয়ে দেন। শুধু বললেন, “আমি ঠিক আছি।” তবে জানালেন ওনার চোখের অবস্থা একটু ভালোর দিকে। আমাদের জন্য ওটা একটা ভালো খবর। এবার বাবা ওনার স্ত্রীকে (বুশরা বিবি) নিয়ে খুব চিন্তিত ছিলেন। তিনি নাকি বাবার চেয়েও খারাপ পরিস্থিতিতে আছেন। বাবা বললেন, ওরা আমাকে কোনো দিন ভাঙতে পারবে না। বলেছেন, তিনি সব সহ্য করতে পারবেন, কিন্তু পরিবারের ওপর আঘাত এলে কাজটা কঠিন হয়ে যায়।’

ফোনালাপের পর কাসিম সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বাবার একটি বার্তা পোস্ট করলেন। পাকিস্তানের বিচার বিভাগের তীব্র সমালোচনা। তাঁর স্ত্রীর সঙ্গে অন্যায় আচরণের প্রতিবাদ। যেন সেই চিরচেনা আপসহীন ইমরান!

পাকিস্তানের কর্তৃপক্ষের ভয়টা আসলে কোথায়? কাসিম মনে করেন, আসলে তারা জনরোষকে ভয় পায়। তাই তারা সব ধামাচাপা দিয়ে আন্দোলনকে স্তিমিত করতে চায়। ছোট ছোট বিষয়েও তারা নিষ্ঠুর। মাঝেমধ্যে ইমরানের সেলের বিদ্যুৎ বন্ধ করে দেওয়া হয় কিংবা নতুন কোনো বই পড়তে দেওয়া হয় না। কাসিমের মতে, এই নির্যাতনই উল্টো শক্তি দিয়েছে তাঁর বাবাকে, ‘প্রথম দুদিন ছিল ভয়াবহ। তারপর উনি একটা ধ্যানের অবস্থায় চলে যান। নিজের ভেতরে ডুব দিতে শেখেন। এই অত্যাচারগুলোই তাঁকে শিখিয়েছে কীভাবে আরও দীর্ঘক্ষণ ওই অবস্থায় টিকে থাকতে হয়।’

আরও পড়ুন

এখনো কতটা শক্ত ইমরান খান সেটা জানাতে গিয়ে কাসিম আরও বলেন, ‘বাবা এখন এটাকে জীবনের একটা পরীক্ষা হিসেবে দেখছেন। দশ বছর আগে হয়তো এভাবে ভাবতেন না। এখন তাঁর মন বলে, যা হওয়ার, তা-ই হবে। শরীরের ক্ষতি হচ্ছে সত্যি, তবু ভেতরে তিনি স্থির।’

প্রায় ১ হাজার দিন কারাগারে ইমরান খান। ২০২৩ সালের মে মাসে প্রথম গ্রেপ্তার। একই বছরের সেপ্টেম্বরে রাওয়ালপিন্ডির কুখ্যাত আদিয়ালা জেলে স্থানান্তর। দুটো আলাদা মামলায় সাজা ভোগ করছেন। আরও অনেক মামলা ঝুলছে মাথার ওপর। তাঁর সমর্থকদের দাবি, সবই রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। ৭৩ বছর বয়সী এই কিংবদন্তির ডান চোখের দৃষ্টিশক্তি কমে যাওয়া ও ব্যক্তিগত চিকিৎসকের সঙ্গে দেখা করতে না পারা নিয়ে বিশ্বজুড়ে উদ্বেগ বাড়ছে।

ইমরানের মানবাধিকারের দাবিতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সোচ্চার তাঁর দুই ছেলে সুলায়মান ও কাসিম।
ইমরানের ইনস্টাগ্রাম

২০২৪ সালের জুলাইয়ে জাতিসংঘের একটি ওয়ার্কিং গ্রুপ ইমরানের এই আটকাদেশকে আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন বলে অভিহিত করেছে। এরপর ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে জাতিসংঘের বিশেষ প্রতিনিধি অ্যালিস জিল এডওয়ার্ডস পাকিস্তান সরকারকে অবিলম্বে ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানান। ইমরান খানের বয়স এখন ৭৩। এই বয়সে তাঁর ভেঙে পড়া স্বাস্থ্য নিয়ে শঙ্কিত হয়ে ছয় সপ্তাহ আগে ১৪ জন সাবেক টেস্ট অধিনায়ক (যাঁদের মধ্যে আমিও একজন) পাকিস্তান সরকারের কাছে একটি মানবিক আবেদন জানিয়েছি। আমরা চেয়েছি তাঁকে যেন তাঁর পছন্দের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক দেখানো হয় এবং আইনিপ্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা হয়। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, সেই আবেদনের কোনো আনুষ্ঠানিক জবাব মেলেনি।

আরও পড়ুন

দীর্ঘদিন সুলায়মান ও কাসিম বাবার বিষয়ে নীরব ছিলেন। তাঁরা প্রচারের আলো থেকে দূরে থাকতে পছন্দ করেন। কিন্তু এখন পরিস্থিতি এত খারাপ যে তাঁরা সরব হয়েছেন। গতকাল জেনেভায় জাতিসংঘের মানবাধিকার পরিষদে বক্তব্য দেওয়ার কথা কাসিমের।

বাবাকে দেখতে যাওয়ার জন্য জানুয়ারিতে দুই ভাই পাকিস্তানের ভিসার আবেদন করলেও এখনো কোনো সাড়া পাননি। পাকিস্তান বলছে তারা ‘নিকোপ’ (ওভারসিজ কার্ড) দিয়ে যেতে পারেন, কিন্তু মা জেমাইমা খানের ভয়—সে ক্ষেত্রে ব্রিটিশ নাগরিক হিসেবে যে নিরাপত্তা বা প্রটেকশন পাওয়ার কথা, তা পাওয়া যাবে না। তবু দুই ভাই যেতে চান পাকিস্তানে। ভয় পান না? কাসিমের উত্তরটা পিতার যোগ্য সন্তানের মতোই, ‘আমি সেটা বলব না। মূল বিষয় হলো আমরা সম্মানের সঙ্গে যেতে চাই। ঝুঁকি তো আছেই, কিন্তু বাবাকে আর কখনোই দেখতে পাব না—এই ভয়ের চেয়ে বড় কোনো ভয় আমাদের নেই।’ ২০২২ সালের পর তাঁরা বাবাকে আর দেখেননি!

পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান ও তাঁর স্ত্রী বুশরা বিবি
এক্স থেকে নেওয়া

ছোটবেলায় বাবার রাজনীতি একদম পছন্দ ছিল না সুলায়মানের। তাঁর ভাষায়, ‘ইশ! বাবা যদি ক্রিকেটের বিশ্লেষণ বা এই জাতীয় কিছু করতেন!’ কাসিম হাসতে হাসতে মনে করলেন বাবার সঙ্গে কাটানো মুহূর্তগুলো। শৈশবের স্মৃতিচারণা করতে গিয়ে কাসিম হাসেন, ‘স্কুলে স্পোর্টস ডের দিনে বাবা হাজির হতেন ঠিকই, কিন্তু আমার বোলিং আর ক্রিকেটের মান দেখে শুধু মাথা নাড়তেন আর বলতেন, তোকে দিয়ে কিচ্ছু হবে না! ক্রিকেটের ক্ষেত্রে তিনি ভুল ছিলেন না। যতক্ষণ পাশে থাকতেন, সততা আর সম্মানের সঙ্গে জীবন যাপনের কথা বলতেন।’

আরও পড়ুন

স্কুলের ছুটিতে ছেলেরা যখন পাকিস্তানে যেতেন, ইমরান সব কাজ ফেলে তাঁদের সময় দিতেন। পাহাড়ে দীর্ঘ পথ হাঁটা ছিল সুলায়মানের সবচেয়ে প্রিয়। সল্ট রেঞ্জে পাখি শিকার করতে নিয়ে যেতেন বাবা। সুলায়মান বলছিলেন, ‘পাহাড়ই ছিল ওনার সবচেয়ে আনন্দের জায়গা।’

আপাতত সেই পাহাড়ে ইমরানের ফেরার সম্ভাবনা ক্ষীণ। তিনি কোনো আপস করবেন না, সেটা ছেলেরাও জানেন। সুলায়মান খুব পরিষ্কার করেই বললেন, ‘বাবা এক চুলও নড়বেন না। যদি কোনো সম্মানজনক সমাধান আসে যেখানে সব রাজনৈতিক বন্দী মুক্তি পাবেন এবং তিনি রাজনীতিতে সক্রিয় থাকতে পারবেন—তবেই হয়তো কিছু হতে পারে। আমাদের মূল চাওয়া এখন ওনার সঠিক চিকিৎসা নিশ্চিত করা।’

ইমরান খান
রয়টার্স

মাঝেমধ্যেই অনলাইনে ইমরানের মৃত্যুর গুজব ছড়ায়। ছেলেরা কি মানসিকভাবে কোনো খারাপ খবরের জন্য প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছেন? সুলায়মান একটু শক্ত হয়েই বললেন, ‘কয়েক বছর আগে তো ওনাকে গুলিই করা হলো। এসব শুনে শুনে আমরা অভ্যস্ত হয়ে গেছি। বাবা প্রকাশ্যেই বলেছেন—নীতির প্রশ্নে আপস করে বাইরে থাকার চেয়ে তিনি জেলেই মরতে রাজি।’

আরও পড়ুন

কাসিম যখন ছোট ছিলেন, তখন বাবা করাচির কোনো এক ‘মাফিয়া’ গোছের রাজনীতিবিদের বিরুদ্ধে লড়ছিলেন। কাসিম বাবাকে রাজনীতি ছাড়ার জন্য অনেক অনুরোধ করেছিলেন। কিন্তু এখন তিনি গর্বিত। বললেন, ‘মানুষ আমাকে বলে, বাবা যদি একটা রফা করে ইংল্যান্ডে চলে আসতেন তবে কি ভালো হতো না? আমি জানি, অন্য রাজনৈতিক বন্দীদের জেলে রেখে আমাদের সঙ্গে আয়েশি জীবন কাটানো ইমরান খানের পক্ষে সম্ভব নয়। তিনি সেটা নিয়ে বাঁচতে পারবেন না। ওনার জীবনটা এখন পাকিস্তানের মানুষের জন্য উৎসর্গ করা। তাঁর স্পষ্ট কথা—আদর্শ বিসর্জন দেওয়ার চেয়ে জেলখানায় মরে যাওয়াও ভালো।’

আরও পড়ুন