নাহিদের পর তানজিদ, ৬ উইকেটে জিতে সিরিজে বাংলাদেশ
নাহিদ রানা পারলে নাথান স্মিথ, উইলিয়াম ও’রুর্করা পারবেন না! গতি আর বাউন্সকে অস্ত্র বানিয়ে ২১ রানের মধ্যে তাঁরাও তুলে নিলেন বাংলাদেশের ওপেনার সাইফ হাসান ও চার ম্যাচ পর একাদশে ফেরা সৌম্য সরকারকে। তবে পার্থক্যটা গড়ে উঠেছে এর পর থেকে। যার শেষ বাংলাদেশের ৬ উইকেটের জয়ে। সিরিজে এখন ১-১ সমতা, চট্টগ্রামে ২৩ এপ্রিলের শেষ ম্যাচটি হয়ে দাঁড়িয়েছে ওয়ানডে সিরিজের ‘ফাইনাল।’
নাহিদ রানার গতির ঝড় তোলা বোলিংয়ের জবাব শেষ পর্যন্ত পুরোপুরি দিতে পারেননি কিউই পেসাররা। তবে কিউই ওপেনার নিক কেলির ৮৩ রানের জবাব দারুণভাবেই দিয়েছেন বাংলাদেশের ওপেনার তানজিদ হাসান। চার ছক্কা আর ১০ চারে ৫৮ বলে ৭৬ রান, তৃতীয় উইকেটে নাজমুল হোসেনের সঙ্গে গড়েছেন ১২০ রানের জুটি। তাঁরা যতক্ষণ উইকেটে ছিলেন, মিরপুরের উইকেটে কিউই বাউন্স-পেসের সামনেও ব্যাটিংটাকে কঠিন মনে হচ্ছিল না।
দলের জয় থেকে ৫৮ রান দূরে থাকতে বাঁহাতি স্পিনার জেইডেন লেনক্সের বলে ছক্কা হাঁকাতে গিয়ে হেনরি নিকোলসের হাতে ক্যাচ দিয়েছেন তানজিদ। পরের ওভারেই নিজের শততম ওয়ানডেতে লিটন দাস মাত্র ৭ রানে আউট হয়ে যান। ১৩ ইনিংস পর ফিফটির দেখা পাওয়া নাজমুল ফিরেছেন ৫০ রানে, তবে আউট হয়ে নয়।
ইনিংসের ২৯তম ওভারের প্রথম বলে ১ রান নিয়ে ওয়ানডেতে নিজের ১১তম ফিফটি পূর্ণ করে ফর্মে ফেরার বার্তা দিয়েছেন নাজমুল। কিন্তু এরপরই উইকেটের পাশে শুয়ে পড়েন নাজমুল। পায়ের মাংসপেশিতে টান পড়ায় উঠে যেতে হয় মাঠ থেকে। অধিনায়ক মেহেদী হাসান মিরাজ এসে উইকেটে থাকা তাওহিদ হৃদয়কে নিয়ে বাকি কাজটা সেরে ফেলেন ৮৭ বল হাতে রেখেই।
সিরিজের প্রথম ওয়ানডেতে মিরপুর শেরেবাংলা স্টেডিয়ামের উইকেট একটু অবাকই করেছিল সবাইকে। ‘স্পোর্টিং উইকেটে’র স্লোগান তুলে কিনা অসম বাউন্সের মন্থর উইকেট! বুমেরাং হয়ে তা ফিরে এসেছিল বাংলাদেশের দিকেই। নিউজিল্যান্ডের ২৪৭ রান তাড়া করতে গিয়ে ২৬ রানের হার।
কাল সেই মিরপুরেই খেলা হলো ভিন্ন উইকেটে, আরও নির্দিষ্ট করে বললে ভিন্ন ধরনের উইকেটে। সর্বশেষ পাকিস্তান সিরিজের মতো স্পোর্টিং উইকেট না হলেও আগের ম্যাচের তুলনায় গতকালের উইকেটে রান করাটা অপেক্ষাকৃত সহজ ছিল। অবশ্য পেসারদের বলগুলো কখনো কখনো আগুনের গোলা হয়ে আসছিল। কিছু অসম বাউন্সও দেখা গেছে মাঝেমধ্যে। তবে নিক কেলির মতো তানজিদ, নাজমুলদের ব্যাটিং আবার বলছে—চাইলে এই উইকেটেও রান করা কঠিন ছিল না।
কেলি ছাড়া নিউজিল্যান্ডের বাকি ব্যাটসম্যানদের কেউই পারেননি ২০ রানেও পৌঁছাতে! ১৪ বাউন্ডারিতে ১০২ বলে কেলির ৮৩ রানের পর দ্বিতীয় সর্বোচ্চ পাঁচে নামা মুহাম্মদ আব্বাসের ৩৪ বলে ১৯। ৪৯তম ওভারেই শেষ হয়ে যাওয়া ১৯৮ রানের ইনিংসে নিউজিল্যান্ডের সবচেয়ে বড় জুটি চতুর্থ উইকেটে কেলি আর আব্বাসের ৫৬ রান।
কৃতিত্বটা দিতে হবে বাংলাদেশের বোলারদের, বিশেষ করে নাহিদ রানার। গতির আগুনের ঝাপটায় নিউজিল্যান্ডের ইনিংস বারবার থামিয়ে দিয়েছেন তো তিনিই। ওয়ানডেতে দ্বিতীয়বারের মতো ৫ উইকেট নিতে গিয়ে নাহিদ পাঁচটি উইকেটই নিয়েছেন ঘণ্টায় ১৪১ কিলোমিটারের বেশি গতিতে বল করে। ১৪৪.৭, ১৪৬.৮, ১৪৬.১, ১৪৪.১ ও ১৪১.৬ কিমি—নাহিদের ওই পাঁচটি বলের কোনো উত্তর ছিল না কিউই ব্যাটসম্যানদের ব্যাটে। উত্তর ছিল না তাঁর বাউন্সারগুলোরও।
উইকেট বুঝতে প্রথম ৫ ওভারে ১২ রানের সতর্ক শুরুর পর অষ্টম ওভারেই নাহিদের প্রথম আঘাত। ম্যাচে প্রথমবারের মতো বল পেয়ে প্রথম বলেই এলবিডব্লু করে দেন কিউই ওপেনার হেনরি নিকোলসকে। নিজের পরের ওভার আর পাওয়ার প্লের শেষ ওভারের প্রথম বলে আবারও রানার আঘাত। বাড়তি বাউন্সের ভেতরে ঢোকা বল উইল ইয়াংয়ের ব্যাটে লেগে ব্যাকওয়ার্ড পয়েন্টে সৌম্য সরকারের ক্যাচ। এই দুই ধাক্কার পর নিউজিল্যান্ডকে ৫০-এ পৌঁছাতে খেলতে হয়েছে ১৮তম ওভার পর্যন্ত।
তারপরও রানটা আরও বড় হতে পারত যদি আরও এক-দুটি বড় জুটি বা ইনিংস হতো। কিন্তু সেখানে যে কেলিই একা! অন্যদিকে নাহিদের আগুনে শাণিত হয়ে জ্বলে ওঠেন বাংলাদেশের অন্য বোলাররাও। প্রচণ্ড গরমে পেসারদের জন্য বোলিং করাটা সহজ ছিল না; তার ওপর নাহিদ, তাসকিন, শরীফুল—তিন পেসারেরই লম্বা রান আপ। প্রায় প্রতিটি বলের পর বোলিং প্রান্তে ফিরে যেতে একটু বাড়তি সময় নিয়েছেন সবাই। সঙ্গে একটি বাড়তি ড্রিংকস বিরতি মিলিয়ে আজও প্রথম ওয়ানডের মতো নিউজিল্যান্ডের ইনিংস শেষ হতে লেগেছে বাড়তি ৪৫ মিনিটের মতো।
শরীফুল আগের ম্যাচের ভালো বোলিংয়ের ধারাবাহিকতা ধরে রেখে বাঁহাতি শরীফুল ১০ ওভারে ৩২ রানে নিয়েছেন ২ উইকেট, যার মধ্যে ছিল কেলির গুরুত্বপূর্ণ উইকেটটিও। ১টি করে উইকেট নিয়েছেন তাসকিন আহমেদ, রিশাদ হোসেন আর সৌম্য।
তাসকিনের নেওয়া ও’রুর্কের শেষ উইকেটটিতে কৃতিত্ব দিতে হবে তাওহিদ হৃদয়কেও। লং অনে অনেকটা দৌড়ে গিয়ে দারুণ এক ডাইভে বলটা মুঠোবন্দী করেছেন তিনি। বোলিংয়ের মতো ফিল্ডিংয়েও এই ম্যাচে ১০-এ ১০-ই দিতে হবে বাংলাদেশকে।
আর নাহিদ রানাকে? খেলা দেখে থাকলে নিশ্চয়ই আপনার কাছ থেকেও ১০-এ ১০-এর কম পাননি তিনি। না দেখে থাকলেও তাই দেওয়া উচিত। ম্যান অব দ্য ম্যাচ নাহিদ রানাই যে সিরিজে ফেরা জয়টাকে সহজ করে দিয়েছেন বাংলাদেশের জন্য!
সংক্ষিপ্ত স্কোর:
নিউজিল্যান্ড: ৪৮.৪ ওভারে ১৯৮ (কেলি ৮৩, আব্বাস ১৯, স্মিথ ১৮ *; নাহিদ ৫/৩২, শরীফুল ২/৩২, সৌম্য ১/২৭, তাসকিন ১/৪৬)।
বাংলাদেশ: ৩৫.৩ ওভারে ৪/১৯৯ (তানজিদ ৭৬, নাজমুল ৫০*, হৃদয় ৩০, লেনক্স ২/৩৬, স্মিথ ১/৪৬)।
ফল: বাংলাদেশ ৬ উইকেটে জয়ী।
ম্যাচসেরা: নাহিদ রানা
সিরিজ: তিন ম্যাচের সিরিজে ১–১ ব্যবধানে সমতায় বাংলাদেশ।