সেই এলোমেলো চট্টগ্রামই যে ৪ কারণে সফল

পয়েন্ট তালিকার শীর্ষে চট্টগ্রাম রয়্যালসচট্টগ্রাম রয়্যালস

ম্যাচের আগের দিন ক্রিকেটাররা সাধারণত কী করেন? হালকা অনুশীলন, প্রতিপক্ষ বিশ্লেষণ, ম্যাচ পরিকল্পনা—এগুলোই তো চেনা প্রস্তুতি; কিন্তু বিপিএলে নিজেদের প্রথম ম্যাচের আগে চট্টগ্রাম রয়্যালসের এসব করার সুযোগ ছিল না। সুযোগ থাকবে কীভাবে? ম্যাচের একদিন আগেও তো নিশ্চিত ছিল না দলটির মালিক কে!

বিপিএলের প্রথম দিনই মাঠে নামতে হয়েছিল চট্টগ্রামকে। তার ঠিক একদিন আগে ফ্র্যাঞ্চাইজিটির স্বত্বাধিকারী মালিকানা ছেড়ে দেন। বাধ্য হয়ে দলটির দায়িত্ব নিতে হয় বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডকে (বিসিবি)। কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে পুরো ম্যানেজমেন্ট বদলে যায়। এমন পরিস্থিতিতে ম্যাচ পরিকল্পনা তো দূরের কথা, দল গুছিয়ে নেওয়াই ছিল বড় চ্যালেঞ্জ।

দলে বিদেশি ক্রিকেটার ছিলেন মাত্র দুজন—মির্জা বেগ ও মাসুদ গুরবাজ। নিয়মিত খেলার খোঁজ না রাখলে নাম দুটি পরিচিত মনে হওয়ারও কথা নয়। এ অবস্থায় কোনো রকমে একাদশ সাজিয়েই নিজেদের প্রথম ম্যাচ খেলতে নেমেছিল চট্টগ্রাম রয়্যালস।

অথচ সেই এলোমেলোভাবে শুরু করা চট্টগ্রামই এখন টুর্নামেন্টে ৭ ম্যাচে ৫ জয় নিয়ে পয়েন্ট তালিকার শীর্ষে। এবারের বিপিএলে সবচেয়ে ধারাবাহিক দলও তারা। প্রশ্ন একটাই—কীভাবে?

কার্যকর টি–টোয়েন্টি বোলিং

টুর্নামেন্টের প্রথম ম্যাচ থেকে এখন পর্যন্ত দলটির অধিনায়ক মেহেদী হাসান যতবারই মাইক্রোফোন হাতে নিয়েছেন, প্রায় প্রতিবারই বলেছেন, ‘আমাদের বোলিং বিভাগ খুব ভালো।’ মেহেদীর এই ভরসার প্রতিদান দিয়েছেন দলটির বোলাররা।

দলটির সেরা বোলার বাঁহাতি পেসার শরীফুল ইসলাম। ৭ ম্যাচে উইকেট নিয়েছেন ১৩, যা এখন পর্যন্ত টুর্নামেন্টে সর্বোচ্চ। ওভারপ্রতি রান দিয়েছেন ৬.৯২, অথচ পাওয়ার প্লে, ডেথ ওভারে দুই জায়গাতেই বোলিং করেন।

১৩ উইকেট নিয়েছেন শরীফুল
চট্টগ্রাম রয়্যালস

বাঁহাতি স্পিনার তানভীর ইসলামের উইকেট ১০টি। ওভারপ্রতি তিনি রান দিয়েছেন ৬.৭১ করে। সবচেয়ে বড় কথা তানভীরের সঙ্গে ৭ উইকেট নেওয়া অফ স্পিনার মেহেদীর কম্বিনেশনটা ভয়ংকর। দুজনেই নতুন বল থেকে পুরোনো বল, সব সময় বোলিং করতে পারেন।

তাঁদের সঙ্গে যোগ করুন পাকিস্তানের অলরাউন্ডার আমের জামালকে। টুর্নামেন্টে ৫ ম্যাচে উইকেট নিয়েছেন ১০টি। তাঁদের ভালো সমর্থন দিতে আছেন পেসার মুকিদল ইসলাম, আবু হায়দার রনি ও পাকিস্তানি স্পিন বোলিং অলরাউন্ডার হাসান নেওয়াজ। দলটিতে অনেক বিকল্প আছে তা নয়, তবে যাঁরা আছেন তাঁরা কার্যকর।

আরও পড়ুন

ওপেনিং জুটি

বিপিএলে এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ রানসংগ্রাহক চট্টগ্রামের ওপেনার অ্যাডাম রসিংটন। ছয় ম্যাচে তিনটি ফিফটি ও একটি ৪৯ রানের ইনিংস মিলিয়ে তাঁর সংগ্রহ ২৫৮ রান। স্ট্রাইক রেটও চোখে পড়ার মতো—১৩৯.২৫। গত বছরের নভেম্বরে অনুষ্ঠিত নেপাল প্রিমিয়ার লিগের এই সর্বোচ্চ রানসংগ্রাহকে দলে ভেড়ানো চট্রগ্রামের জন্য ‘মাস্টারস্ট্রোক’ হিসেবে কাজ করেছে।

দারুণ ছন্দে চট্টগ্রামের দুই ওপেনার রসিংটন ও নাঈম
চট্টগ্রাম রয়্যালস

টুর্নামেন্টে পঞ্চম সর্বোচ্চ রানসংগ্রাহকও চট্টগ্রামের। কোটি টাকার বাঁহাতি ওপেনার মোহাম্মদ নাঈম সাত ম্যাচে দুটি ফিফটিতে করেছেন ১৯৭ রান, স্ট্রাইক রেট ১৩৫.৮৪।
সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি, এই দুজন মিলে ছয় ইনিংসে দুটি শতরানের জুটি গড়েছেন। ডানহাতি–বাঁহাতি এই ওপেনিং কম্বিনেশন বেশ ভালোভাবেই জমে গেছে। ব্যাট হাতে তাঁদের ভালোভাবেই সাপোর্ট দিচ্ছেন মাহমুদুল হাসান, হাসান নেওয়াজ ও মেহেদীরা।

অলরাউন্ডার মেহেদী

মেহেদীর বোলিং নিয়ে বাড়তি শব্দ খরচের হয়তো প্রয়োজন নেই। টি–টোয়েন্টিতে বাংলাদেশ দলেরই অন্যতম সেরা বোলার তিনি। এই টুর্নামেন্টে ওভারপ্রতি ৬.৮৫ গড়ে ৭ উইকেট নিয়ে পারফরম্যান্সের ধারাবাহিকতাই ধরে রেখেছেন।

পারফরম্যান্স ধরে রেখেছেন মেহেদী
চট্টগ্রাম রয়্যালস

তবে এবারের বিপিএল ব্যাটসম্যান মেহেদীকেও পাওয়া গেছে। ব্যাটিং নিয়ে প্রায়ই সমালোচনার মুখে পড়া মেহেদী এবার ৫ ইনিংসে রান করেছেন ১০১। সেটা ১৬৮ স্ট্রাইকরেটে। গড় ৩৩.৬৬।

প্রথম ম্যাচে নোয়াখালীর বিপক্ষে তাঁর ১৩ বলে ২৬ থেকে শুরু, এরপর ৭ জানুয়ারি সিলেটের বিপক্ষে অপরাজিত ছিলেন ১৩ বলে ৩৩ রানে। গতকাল রাজশাহীর বিপক্ষে লো স্কোরিং ম্যাচে করেছেন ২৮। মিডল–লোয়ার অর্ডারের দিকে এসে গুরুত্বপূর্ণ রানগুলো করছেন মেহেদী। এর সঙ্গে যোগ করুন অধিনায়কত্ব। সব মিলিয়ে পরিপূর্ণ প্যাকেজ হিসেবে সামনে থেকে দলকে নেত্বত্ব দিচ্ছেন এই অলরাউন্ডার।

আরও পড়ুন

নির্ভার এক দল

বিপিএলে ক্রিকেটারদের পারিশ্রমিক নিয়ে জটিলতা নতুন নয়। চট্টগ্রামেরই আরেকটি ফ্র্যাঞ্চাইজির বিরুদ্ধে এখনো ক্রিকেটারদের পাওনা পরিশোধ না করার অভিযোগ রয়েছে। তবে বর্তমান দলটির ক্ষেত্রে পরিস্থিতি ভিন্ন। দলটির স্বত্বাধিকারী এখন বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) হওয়ায় পারিশ্রমিক নিয়ে জটিলতা হওয়ার কথা নয়। এতে দলটি কিছুটা নির্ভার থাকতে পারে। মাঠের বাইরের দুশ্চিন্তা কমে গিয়ে খেলোয়াড়েরা পুরো মনোযোগ দিতে পারবেন মাঠের খেলায়।