‘ফোর্স ম্যাজিউর’ কি পাকিস্তানকে আইসিসির শাস্তি থেকে বাঁচাতে পারবে

পাকিস্তানের লাহোরে পিসিবি কার্যালয়পিসিবি

টি-টুয়েন্টি বিশ্বকাপে ভারতের বিপক্ষে খেলবে না পাকিস্তান—এ সিদ্ধান্ত গত সপ্তাহে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জানায় পাকিস্তান সরকার। তারপর পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ গত বুধবার ইসলামাবাদে বলেছেন, ‘টি-টুয়েন্টি বিশ্বকাপ নিয়ে আমরা খুব পরিষ্কার অবস্থান নিয়েছি—আমরা ভারতের বিপক্ষে ম্যাচ খেলব না। কারণ, খেলার মাঠে কোনো রাজনীতি থাকা উচিত নয়।’

অর্থাৎ প্রধানমন্ত্রী নিজে এ বিষয়ে সবকিছু স্পষ্ট করে দেওয়ায় পাকিস্তানের ভারত–ম্যাচ বয়কটের অবস্থান আরও শক্ত হলো। যদিও সংবাদমাধ্যমে গুঞ্জন চলছে, পর্দার আড়ালে পাকিস্তানকে ভারতের বিপক্ষে খেলতে রাজি করানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। তবে সেই চেষ্টা আদৌ কতটুকু সফল হবে, তা সময় হলেই জানা যাবে। আপাতত পরিস্থিতি আইসিসি ও পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ডকে (পিসিবি) আইনি লড়াইয়ের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। এই বিরোধের কেন্দ্রে রয়েছে আইসিসির মেম্বারস পার্টিসিপেশন অ্যাগ্রিমেন্টের (এমপিএ) একটি ধারা—‘ফোর্স ম্যাজিউর’। প্রশ্ন হচ্ছে, এটি কি সত্যিই এ ক্ষেত্রে প্রযোজ্য।

সংবাদমাধ্যম এরই মধ্যে জানিয়েছে, যদি পাকিস্তান এই ম্যাচ বয়কট করে, তবে তাদের বিরুদ্ধে চুক্তিভঙ্গের অভিযোগ উঠতে পারে। সবার নজর তাই এখন তাই টি-টুয়েন্টি বিশ্বকাপে অংশগ্রহণকারী সব দলের স্বাক্ষরিত মেম্বারস পার্টিসিপেশন অ্যাগ্রিমেন্টে (এমপিএ)। অনেকেই এমপিএর ১২ নম্বর ধারাকে (ফোর্স ম্যাজিউর) সামনে এনেছেন, যা যুদ্ধ, সন্ত্রাস, প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের মতো অপ্রত্যাশিত পরিস্থিতির কারণে কোনো পক্ষকে চুক্তিগত বাধ্যবাধকতা থেকে মুক্তি দেয়।

আইসিসি টুর্নামেন্টে ফোর্স ম্যাজিউর কী


ফোর্স ম্যাজিউর হলো একটি চুক্তিগত সুরক্ষা, যা কোনো পক্ষকে তার বাধ্যবাধকতা পূরণ থেকে মুক্তি দেয়, যখন তার নিয়ন্ত্রণের বাইরে অস্বাভাবিক ঘটনা ঘটে। আইসিসির শর্তে, সাধারণত এর মধ্যে যুদ্ধ, সন্ত্রাসবাদ, প্রাকৃতিক বিপর্যয় এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, বাধ্যতামূলক সরকারি নির্দেশ অন্তর্ভুক্ত থাকে।

এমপিএর ১২ নম্বর ধারা অনুযায়ী, কোনো সদস্য বোর্ড ফোর্স ম্যাজিউর দাবি করতে পারে যদি:

—ঘটনাটি যদি বোর্ডের নিয়ন্ত্রণের বাইরে হয়।

—সরাসরি চুক্তিগত বাধ্যবাধকতা পালনকে বাধাগ্রস্ত করে।

—বোর্ড আনুষ্ঠানিকভাবে আইসিসিকে নথিপত্রসহ জানায়।

—ঘটনার প্রভাব কমাতে যথাযথ চেষ্টা করা হয়।

দুবাইয়ে অবস্থিত আইসিসির সদরদপ্তর
এএফপি

পিসিবি যে যুক্তি দিতে পারে

ভারতের বিপক্ষে ম্যাচ বয়কটের যুক্তি হিসেবে পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ড (পিসিবি) যুক্তি দিতে পারে যে পাকিস্তান সরকারের পক্ষ থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত ঘোষণার পর বোর্ডের কোনো স্বাধীন সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ ছিল না। একই কথা পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীও পুনর্ব্যক্ত করেছেন।

এ পরিস্থিতিতে ভারতের বিপক্ষে ম্যাচ বয়কট করার সম্ভাব্য শাস্তি এড়াতে পিসিবি একটি প্রতিরক্ষামূলক যুক্তি দাঁড় করাতে পারে—সরকারি নির্দেশ।

পিসিবি যুক্তি দিতে পারে, তাদের সরকারের নির্দেশ মানতে বাধ্য করা হয়েছে, যা এমপিএ অনুযায়ী ফোর্স ম্যাজিউরের আওতায় পড়ে।

আরও পড়ুন

পুরো টুর্নামেন্ট বয়কট নয়

পাকিস্তান দল ইতিমধ্যে শ্রীলঙ্কায় পৌঁছে গেছে। সেখানে টি-টুয়েন্টি বিশ্বকাপের প্রস্তুতি ম্যাচ খেলছে। ভারতের বিপক্ষে ম্যাচ বাদে পুরো টুর্নামেন্টেই খেলবে পাকিস্তান। পিসিবি যুক্তি দিতে পারে, ফোর্স ম্যাজিউর শুধু নির্দিষ্ট একটি ম্যাচের জন্য প্রযোজ্য, পুরো টুর্নামেন্টে অংশগ্রহণে নয়।

সম্ভাব্য শাস্তির বিষয়ে পিসিবি আরও একটি যুক্তি দিতে পারে। সেটা হলো ভারত–ম্যাচ বয়কট করার অর্থ হলো পিসিবি এই ম্যাচের পয়েন্ট হারাতে রাজি। এই সিদ্ধান্ত তাদের পয়েন্ট ও রান রেটে প্রভাব ফেলবে। সুতরাং পাকিস্তান দাবি করতে পারে যে পয়েন্ট ও নেট রান রেটের ওপর নেতিবাচক প্রভাবই এই টুর্নামেন্টে তাদের শাস্তি হতে পারে।

আইসিসি কেন পিসিবির দাবি প্রত্যাখ্যান করতে পারে

আইসিসির দৃষ্টিকোণ থেকে বলা যায়, ফোর্স ম্যাজিউর দাবিতে কিছু দুর্বলতা রয়েছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো ‘সিলেকটিভ পার্টিসিপেশন’ বা ‘বেছে বেছে অংশ নেওয়া’র বিষয়টি, যা আইসিসি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করতে পারে। আইসিসি যুক্তি দিতে পারে, টুর্নামেন্টে অংশগ্রহণ বিভাজ্য নয়, অর্থাৎ কোনো দলকে সব ম্যাচেই অংশ নিতে হবে, তা না হলে চুক্তিভঙ্গ হিসেবে গণ্য হবে। একটি হাই ভোল্টেজ ম্যাচ বয়কট করা এমপিএর ৫.৭.১ ধারাকে ক্ষুণ্ন করে।

পিসিবি চেয়ারম্যান মহসিন নাকভি
এএফপি

পাকিস্তানের অবস্থানকে আরেকটি বিষয় দুর্বল করতে পারে। সেটা হলো, তারা ইতিমধ্যে নিরপেক্ষ ভেন্যুতে নিজেদের ম্যাচ খেলছে। অতীতের বয়কটগুলো সাধারণত নিরাপত্তা বা ভিসা অস্বীকৃতির সঙ্গে যুক্ত থাকলেও এই ম্যাচ কলম্বোতে নিরপেক্ষ ভেন্যুতে নির্ধারিত, যা পাকিস্তান আগেই মেনে নিয়েছে।

আইসিসি সরকারি হস্তক্ষেপের বিষয়টি নিয়েও যুক্তি দিতে পারে। পিসিবির চেয়ারম্যান মহসিন নাকভি পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্বেও আছেন। আইসিসি তাই যুক্তি দিতে পারে, ফোর্স ম্যাজিউরের দাবিটি এড়ানো যেত এবং এটি বৈধ নয়। ‘ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’কে বিসিসিআইয়ের এক কর্মকর্তা বলেছেন, ‘পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ড এবং পাকিস্তান সরকারের মধ্যে তেমন পার্থক্য নেই।’ তাঁর দাবি, পিসিবির এমন যুক্তি ‘কাজে লাগবে না’।

আরও পড়ুন

নকআউট পর্বে ভারতের সঙ্গে খেললে কী হবে

৭ ফেব্রুয়ারি টি-টুয়েন্টি বিশ্বকাপে পাকিস্তান যদি পরে নকআউট ম্যাচে ভারতের মুখোমুখি হয়, তবে এটি সরকারি নির্দেশের ব্যাপারে গুরুতর প্রশ্ন তোলার সুযোগ দেবে আইসিসিকে। ইএসপিএনক্রিকইনফোর সঙ্গে কথা বলা আইনবিশেষজ্ঞদের মতে, একই প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে গ্রুপ পর্বের ম্যাচ না খেলে নকআউট ম্যাচ খেলা যায়—এমন যুক্তি দাঁড় করানো কঠিন হবে।

পাকিস্তান দল ইতমধ্যেই টি–টুয়েন্টি বিশ্বকাপ খেলতে কলম্বোয় পৌঁছেছে। কাল ‘ক্যাপ্টেনস ডে’তে পাকিস্তান অধিনায়ক সালমান আলী
পিসিবি এক্স হ্যান্ডল

আইসিসি যে শাস্তি দিতে পারে পাকিস্তানকে

আইসিসির কাছে বেশ কিছু বিকল্প আছে। ম্যাচের পয়েন্ট কেটে নেওয়া ও নেট রান রেটে নেতিবাচক প্রভাব তো আছেই। পাশাপাশি রয়েছে আর্থিক জরিমানা ও ক্ষতিপূরণ, যা বিশেষ করে সম্প্রচারকদের আর্থিক লোকসানের সঙ্গে সম্পর্কিত।

আইসিসি ইতিমধ্যে সতর্ক করেছে যে ভারতের বিপক্ষে ম্যাচ বয়কট পাকিস্তান ও বিশ্ব ক্রিকেটের ওপর ‘গুরুত্বপূর্ণ এবং দীর্ঘমেয়াদি’ প্রভাব ফেলতে পারে। অর্থাৎ ম্যাচটি বয়কট করলে বিষয়টির প্রভাব হবে সুদূরপ্রসারী। এর মধ্যে থাকতে পারে টুর্নামেন্ট থেকে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা, বার্ষিক আয় থেকে লভ্যাংশ না দেওয়া এবং দ্বিপক্ষীয় সিরিজে নিষেধাজ্ঞা, যা বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপে পয়েন্ট এবং আইসিসি র‍্যাঙ্কিংয়েও প্রভাব ফেলবে।

ভারতের বার্তা সংস্থা পিটিআইয়ের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আইসিসির ২০২৪-২৭ অর্থনৈতিক চক্রে পাকিস্তানের অংশ সর্বোচ্চ পে-আউট রেটে প্রায় ১১৪ মিলিয়ন ডলার, যা বছরে পিসিবিকে ৩৮ মিলিয়ন ডলার হিসেবে বিতরণ করা হয়। অভ্যন্তরীণ এক সূত্র পিটিআইকে বলেছেন, ‘আইসিসি যদি পাকিস্তানকে ভারতের বিপক্ষে না খেলার জন্য শাস্তি দিতে চায়, তাহলে পিসিবি বড় আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে পারে।’

অতীত বয়কট কি পাকিস্তানের জন্য সহায়ক

খুবই সীমিত। ২০০৩ বিশ্বকাপে ইংল্যান্ড ও নিউজিল্যান্ড জিম্বাবুয়ে ও কেনিয়ায় খেলতে অস্বীকার করেছিল কিংবা ২০০৯ টি-টুয়েন্টি বিশ্বকাপে ভিসা না দেওয়া—এসব ঘটনা পাকিস্তানকে শুধু নৈতিক প্রেক্ষাপট দিতে পারে। কিন্তু এগুলো আইনি বা ঐতিহাসিকভাবে বড় প্রভাব ফেলে না। প্রতিটি বিষয় বিচার করা হয় বর্তমান চুক্তির নির্দিষ্ট শর্ত অনুযায়ী, অতীতের সহনশীলতায় নয়।

ফোর্স ম্যাজিউর কি পাকিস্তানকে বাঁচাতে পারবে

পাকিস্তানের কৌশল কার্যকর হতে পারে, যদি আইসিসি সরকারি নির্দেশকে সত্য, বাধ্যতামূলক ও এড়ানো সম্ভব নয় বলে মনে করে। তবে পুরো টুর্নামেন্টে বেছে বেছে একটি ম্যাচ বয়কট করা, নিরপেক্ষ ভেন্যু ও ক্ষতিপূরণ–সংক্রান্ত বিষয়গুলো পিসিবির অবস্থান দুর্বল করছে। সর্বোচ্চ যেটা হতে পারে, ফোর্স ম্যাজিউর পাকিস্তানের পয়েন্ট কর্তন–হ্রাস এবং আর্থিক ক্ষতি কমাতে পারে। সর্বনিম্ন ক্ষেত্রে, আইসিসি বয়কটকে চুক্তিভঙ্গ হিসেবে বিবেচনা করে আরও বিস্তৃত পরিণতি দিতে পারে; যেমন দৃষ্টান্ত তৈরি করা, যা বিশ্ব ক্রিকেটে আগে কখনো দেখা যায়নি।

আরও পড়ুন