ভেনেজুয়েলায় অভিযানের কারণে ফিফা কি যুক্তরাষ্ট্রকে শাস্তি দিতে পারবে

ছবিটি গত ৮ মার্চের। হোয়াইটহাউজে যুক্তরাষ্ট্র প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের হাতে ফিফা ক্লাব বিশ্বকাপের অফিশিয়াল বল তুলে দেন ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো।ফিফা ওয়েবসাইট

২০২২ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি ইউক্রেনে হামলা চালায় রাশিয়া। এর পাঁচ দিন পরই ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফা এবং ইউরোপীয় ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা উয়েফা যৌথ সিদ্ধান্তে রাশিয়াকে তাদের সব প্রতিযোগিতায় নিষিদ্ধ করে। দেশটির বয়সভিত্তিকসহ সব ধরনের জাতীয় দল এবং ক্লাবগুলোর ওপর আরোপিত এ নিষেধাজ্ঞা এখনো ওঠেনি। ২০২২-এর পর ২০২৬ বিশ্বকাপেও খেলতে পারছে না রাশিয়া।

রাশিয়ার সেই নিষেধাজ্ঞা নতুন করে আবারও আলোচনায়। ৩ জানুয়ারি ভেনেজুয়েলায় হামলা চালিয়ে প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরো ও তাঁর স্ত্রীকে তুলে নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। হামলার পেছনে সুস্পষ্টভাবেই ভেনেজুয়েলার তেলসম্পদের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার কথা বলেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। যেটিকে ‘নগ্ন সাম্রাজ্যবাদ’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন অনেকে।

প্রশ্ন উঠেছে, ইউক্রেনে হামলা করে রাশিয়া যদি নিষিদ্ধ হয়, ভেনেজুয়েলায় হামলা করে তাদের প্রেসিডেন্টকে তুলে নেওয়ার মতো ঘটনার পর যুক্তরাষ্ট্রকে কেন নিষিদ্ধ করছে না ফিফা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকে ২০২৬ বিশ্বকাপ আয়োজন থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে বাদ দেওয়ার দাবিও তুলেছেন।

আপাতদৃষ্টে স্পষ্ট, ফিফা যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেবে না। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর ঘনিষ্ঠতা যেখানে বড় প্রভাবক। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে বিশ্বকাপ আয়োজনের বিশালতা। এবারই প্রথম ৪৮ দল নিয়ে বিশ্বকাপ হতে যাচ্ছে।

দর্শকসংশ্লিষ্টতার দিক থেকে খেলার দুনিয়ার সবচেয়ে বড় প্রতিযোগিতা ফিফা বিশ্বকাপ। একটি বিশ্বকাপ আয়োজনের সঙ্গে বিশাল কর্মযজ্ঞ জড়িত বলে আয়োজক চূড়ান্ত করে ফেলা হয় কয়েক বছর আগে। এবার যেমন যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোর নাম চূড়ান্ত হয়েছিল ২০১৮ সালে। গত ৮ বছরে আয়োজক দেশগুলো কয়েক শ কোটি টাকা খরচও করে ফেলেছে। সুতরাং বিশ্বকাপ আয়োজন থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে সরানোর দাবি পূরণ অসম্ভবই বলা চলে।

কিন্তু তাই বলে যুক্তরাষ্ট্রকে ফিফা কিছুই বলবে না?

আরও পড়ুন

প্রভাবশালী দেশ বলে যুক্তরাষ্ট্র বেঁচে যাবে?

এককথায় উত্তর—হ্যাঁ, বেঁচে যাবে। এ বিষয়ে স্প্যানিশ দৈনিক দিয়ারিও এএসের প্রতিবেদন বলছে, রাশিয়ার তুলনা যুক্তরাষ্ট্রে খাটে না আইনগত কারণেই। ফিফার বিধিমালায় এমন কোনো ব্যবস্থা নেই, যা রাশিয়ার ক্ষেত্রে যেমন করা হয়েছিল, যুক্তরাষ্ট্রকেও তেমন কিছু করার সুযোগ দেয়।

আরও স্পষ্ট করে বললে, ফিফার সংবিধানে এমন কোনো নির্দিষ্ট বিধান নেই, যা এক দেশ অন্য দেশে আগ্রাসন চালালে বা বোমা হামলা করলে, কিংবা কোনো বিদেশি রাষ্ট্রপ্রধানকে আটক করলে, সেই দেশের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলে।

ফিফা শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে পারে সদস্য সংস্থার ওপর। অর্থাৎ, যুক্তরাষ্ট্রের ফুটবল কর্তৃপক্ষের ওপর ব্যবস্থা নিতে পারবে, কিন্তু রাষ্ট্রের ওপর নয়। এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে কাছাকাছি প্রাসঙ্গিক ধারা হলো ফিফা সংবিধির ৩ নম্বর অনুচ্ছেদ। সেখানে বলা হয়েছে, ‘ফিফা আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সব মানবাধিকারকে সম্মান করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ এবং এসব অধিকারের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে কাজ করবে।’

রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের কারণে সদস্যসংস্থার স্থগিতাদেশ নিয়ে যে ১৬ ও ১৯ নম্বর অনুচ্ছেদ রয়েছে, সেগুলো কেবল ক্রীড়া সংস্থার ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য, জাতীয় সরকারের ক্ষেত্রে নয়। ফিফার ডিসিপ্লিনারি কোডেও অন্য দেশের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানের বিষয়ে কোনো ধারা নেই, এর পরিসর ক্রীড়া-সংক্রান্ত প্রেক্ষাপটে বৈষম্য ও প্রতিযোগিতা বিধিলঙ্ঘনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ।

আরও পড়ুন

তাহলে রাশিয়াকে কীভাবে বাদ দেওয়া হয়েছিল

ইউক্রেনে হামলার পর রাশিয়াকে ফিফা ও উয়েফা যে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছিল, সেটা ক্রীড়াগত নয়, বরং প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত ছিল। সংস্থা দুটির যুক্তি ছিল, যুদ্ধের ফলে সৃষ্ট আন্তর্জাতিক ও অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা, ভ্রমণসীমাবদ্ধতা এবং নিরাপত্তাজনিত ঝুঁকি আছে রাশিয়ায়। যে কারণে দেশটিতে প্রতিযোগিতার নিরপেক্ষতা ও স্বচ্ছতা ক্ষুণ্ন করতে পারে। আবার রাশিয়ার দলগুলোরও বাইরে খেলার ঝুঁকি উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

এ ধরনের পরিস্থিতিকে ‘ফোর্স মাজার’ বা অপ্রত্যাশিত পরিস্থিতি হিসেবে বিবেচনা করা হয়, যা ফিফাকে তাদের বিধিমালার কঠোর শব্দগত সীমার বাইরে গিয়ে নিজস্ব বিবেচনায় সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ দেয়। নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে রাশিয়ান ফুটবল ইউনিয়ন কোর্ট অব আরবিট্রেশন ফর স্পোর্টসে আপিল করেছিল। সেখানেও একই সিদ্ধান্ত বহাল ছিল।

সহজ কথায় বললে, নিষেধাজ্ঞার সময় রাশিয়া কোনো টুর্নামেন্টের আয়োজক ছিল না। তাদের কাছ থেকে আয়োজক স্বত্ব কেড়ে নেওয়ার বিষয় ছিল না। আর ফিফা ও উয়েফার প্রতিযোগিতায় নিষিদ্ধ করা হয়েছিল খেলোয়াড় ও দর্শকদের নিরাপত্তার বিষয়টি মাথায় রেখে। কারণ, যুদ্ধের মধ্যে কারও নিরাপত্তা নিশ্চিত নয়।

কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেত্রে এমন কোনো যুদ্ধ পরিস্থিতি নেই। রাশিয়ার মতো নিরাপত্তাঝুঁকি যুক্তরাষ্ট্রে নেই। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে, রাশিয়া ইউক্রেনে হামলার পরপরই ইউরোপের বেশ কয়েকটি দেশ তাদের নিষিদ্ধ করতে আনুষ্ঠানিক অনুরোধ করেছিল। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের বিষয়ে এখন পর্যন্ত এমন কোনো অনুরোধ বা অভিযোগ নেই।

আরও পড়ুন