ক্যাম্প ন্যু থেকে ৫০০ মিটার দূরে জিওসায়েন্সেস বার্সেলোনার অবস্থান। জউমে আলমেরা ইনস্টিটিউট অব আর্থ সায়েন্স (আইসিটিজেএ-সিএসআইসি) নামেও চেনেন কেউ কেউ। সেদিন রাত ১০টার দিকে সেখানে তাদের সিসমোগ্রাফে খুবই মৃদু একটা কম্পন ধরা পড়ল। মিনিট দশেক পর আরও একটা কম্পন। আগেরটির চেয়ে একটু বেশি। রাত ১০টা ৫০ নাগাদ রিখটার স্কেলে মাত্রা ১। অফিশিয়ালি ভূমিকম্প। তবে ‘মাইক্রো’, মানে ছোট।
মাত্রা তিনের ঘরে গেলে লোকে ভূমিকম্প টের পায়। আইসিটিজেএ-সিএসআইসি টের পায় সবই। গবেষক জর্দি দিয়াজের তথ্যমতে, ‘ষষ্ঠ গোলে এই ঘরানার সর্বকালের সেরা ভূকম্পন আইসিটিজেএ-সিএসআইসিতে নথিভুক্ত করা হয়।’
ক্যাম্প ন্যূ ছিল সেই ভূকম্পনের কেন্দ্রস্থল। এক অসম্ভবকে সম্ভব হতে দেখে ৯৬ হাজার ৯২০ জন মানুষ (পিএসজির সমর্থক বাদ দিতে পারেন) প্রায় একসঙ্গে লাফিয়ে গগণবিদারী চিৎকারে যে প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছিল, সেটাই ওই ১ মাত্রার কম্পনের উৎস। অন্য ভাষায়, ক্যাম্প ন্যুর মানুষেরা সেদিন অতিশয় আনন্দে পৃথিবী নড়িয়ে দিয়েছিল।
তাতে দু-একজনের যে অসুবিধা হয়নি, তা নয়।
ভূকম্পন শুনলেই যেখানে একটু আতঙ্ক জাগে, সেখানে এর শিকার হলে মনে তো একটু চোট লাগবেই। ২০২২ সালে এদিনসন কাভানি ‘রেলেভো’কে বলেছিলেন, ওই হারের পর জীবনে প্রথমবারের মতো মনোবিদের কাছে যান থেরাপি নিতে। তাঁর সতীর্থ ফ্লোরেন্স মাতুউদির জেগেছিল উথাল-পাতাল বিষাদ। তাৎক্ষণিক অবসর নিতে চেয়েছিলেন ‘নিজের ওপর লজ্জা লাগছিল’ বলে। লুকাস মউরা কেঁদেছিলেন বাকি রাত। আর ভোর দেখে ঘুমিয়েছিলেন বার্সেলোনার অনেক সমর্থক।
রাতের প্রসববেদনায় নতুন এক সূর্য সেদিন উঠেছিল ইউরোপিয়ান ক্লাব ফুটবলের আকাশে। লোকে সাধ করে নাম রাখে, ‘লা রেমোন্তাদা’।
এক মাস আগের কথা।
পার্ক দে প্রিন্সেস থিয়েটারে ‘ফ্রম প্যারিস উইথ ফোর’ দেখে ঘরে ফিরেছে বার্সেলোনা। চ্যাম্পিয়নস লিগ শেষ ষোলোর প্রথম লেগে পিএসজির আতিথ্যে চার গোল খেয়েছে। অনেকেই ধরে নেন—লুইস এনরিকের হাত ধরে ২০১৫ ‘ট্রেবল’জয়ী বার্সায় যুগাবসান। ইউরোপিয়ান কাপ ও চ্যাম্পিয়নস লিগ মিলিয়ে ইউরোপের শীর্ষ ক্লাব আসরের ৬২ বছরের ইতিহাসে এখান থেকে কেউ কখনো ফিরতে পারেনি। বার্সার প্রধান প্রেস কর্মকর্তা হোসে ম্যানুয়েল লাজারোর ভাষ্য, ‘ধরে নিয়েছিলাম, চ্যাম্পিয়নস লিগ শেষ।’
কোচ লুইস এনরিকেই সম্ভবত সেই বিষাদের সুর কাটেন প্রথম। ফিরতি লেগের আগে এনরিকে জানিয়ে দেন, মৌসুম শেষেই বার্সা ছাড়বেন। বিষাদের সুর কাটার আরেকটি উপলক্ষ হয়ে ওঠে এনএফএলের একটি একটি ম্যাচ। সম্ভবত প্রথম লেগে বার্সার হারের দুই সপ্তাহ আগে এনএফএলে নিউ ইংল্যান্ড প্যাট্রিয়টস ২৫ পয়েন্ট পিছিয়ে থাকা থেকে ঘুরে দাঁড়িয়ে আটলান্টা ফ্যালকনসকে হারায় ৩৪-২৮ ব্যবধানে। দলের দু-একজন এনএফএল-ভক্তের মুখে এসেছে সেই ম্যাচের প্রসঙ্গ।
তাতে কাজ হলো। পিএসজির বিপক্ষে ফিরতি লেগের আগে স্পোর্তিং গিহনকে ৬-১ আর সেল্তা ভিগোকে ৫-০ গোলে হারাল বার্সা। শুরুতে মাত্র ১ শতাংশ জয়ের সম্ভাবনা দেখা নেইমার ২০১৯ সালে ডিএজেডএনকে বলেছিলেন সেই পাল্টে যাওয়ার ধরন, ‘সবাই হালকা ছিল। কারও মনে কোনো দুশ্চিন্তা নেই। পরের রাউন্ডে যাব কি না, জানতাম না। তবে জিতব এবং যে যার খেলাটা খুব ভালো খেলবে, এটা বুঝে ফেলি।’
একদম শেষবেলায় এসে সংবাদ সম্মেলনের সলতেয় আগুনটা দেন এনরিকে, ‘একটি দল যদি আমাদের চার গোল দিতে পারে, তাহলে আমরা তাদের ছয় গোল দিতে পারি।’ ম্যাচটা যে ডেড রাবার হচ্ছে না, সেটা ততক্ষণে সাংবাদিকদের কাছে পরিষ্কার। পিএসজির সংবাদ সম্মেলনে এডিনসন কাভানিও বলে দিলেন, তিনি যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত। প্রশ্ন হতে পারে, ৪-০ গোলে এগিয়ে থাকার পরও এই কথা কেন? ‘কাভানি এল ম্যাটাডোর’ বইয়ে আছে, ফেয়ারমাউন্ট হুয়ান কার্লোন হোটেল থেকে বের হওয়ার আগে পিএসজির দুই পরিচালক ঠিক করেন, ফেরার পর ওয়াইনের কোন বোতল খোলা হবে।
তার পর থেকেই বদলে যেতে শুরু করল সবকিছু।
ক্যাম্প ন্যুতে ঢোকার পথে হাজারো বার্সা সমর্থকের আক্রমণাত্মক আচরণ সইল পিএসজির টিম বাস। অগ্নিকুণ্ডলী ছুড়ে মারা হলো। স্টেডিয়ামে ঢোকার পর কেমন লাগতে পারে, সেটা আন্দাজ করে নেওয়া যায় মিডিয়াপ্রোর ধারাভাষ্যকার হোসে সানচিসের কথায়। ‘কিছু একটা ঘটা’র ঘ্রাণ পাওয়া সানচিস ২০২৪ সালে দ্য অ্যাথলেটিককে বলেন, ‘ক্যাম্প ন্যুতে যত ম্যাচ দেখেছি, তার (ফিরতি লেগ) আগে বা পরে কখনো অমন আবহ দেখিনি।’
বার্সার ড্রেসিংরুমে এনরিকে তখন একটু ব্যস্ত। খেলোয়াড়দের কাছে তাঁর চাওয়া নতুন কিছু; এমন কিছু, যা আগে কেউ দেখেনি। এনরিকে খেলোয়াড়দের বললেন, তাঁদের কেউ কখনো ‘রেমোন্তাদা’র স্বাদ পেয়েছেন কি না?
শব্দটা স্প্যানিশ। ইংরেজিতে ‘কামব্যাক’, বাংলায় ‘ঘুরে দাঁড়ানো।’ ইউরোপিয়ান ফুটবলে কথাটা বেশি প্রচলিত। বেশির ভাগ খেলোয়াড় ‘না’ বলায় এনরিকের বার্তাটা ছিল, তবে রেমোতান্দাই হোক।
লুইস সুয়ারেজ তাঁর প্রথম কারিগর। ৩ মিনিটে গোল করেন। ৪০ মিনিটে লাভিন কুরজাওয়ার আত্মঘাতী গোল এগিয়ে দেয় আরও একটু। বার্সার গ্যালারিতে তখন আশার বাতাস, কিন্তু সামনে এক দীর্ঘ পথ।
বিরতির পর ৫ মিনিটের মাথায় পিএসজির বক্সে দারুণ পাসে নেইমারকে পেয়ে যান আন্দ্রেস ইনিয়েস্তা। ব্রাজিলিয়ানকে ঠেকাতে না পেরে ফাউল করায় পেনাল্টি এবং সেখান থেকে লিওনেল মেসির গোল (৩-০)। বার্সা তখন মাত্র এক গোলের দূরত্বে। ক্যাম্প ন্যুর গ্যালারি তখন উত্তেজনায় ফুটছে।
কিন্তু ১২ মিনিট পরই চুপসে গেল ফাটা বেলুনের মতো। কাভানি গোল করেছেন (৬২ মিনিট)। সেটাও মহামূল্য অ্যাওয়ে গোল। অর্থাৎ পরের রাউন্ডে যেতে বার্সাকে আরও তিন গোল করতে হবে। হাতে আধা ঘণ্টার কম সময়। ক্যাম্প ন্যুতে পিনপতন নীরবতা। মাঠেও তাই এবং সেটা ভেঙে খানখান হলো গোলকিপার মার্ক-আন্দ্রে টের স্টেগেনের চিৎকারে, ‘উই নেভার ডাই! উই আর বার্সেলোনা! উই উইল উইন! উই উইল উইন!’
হাভিয়ের মাচেরানো সের্হিও বুসকেতসের দিকে চাইলেন। টের স্টেগেনের মাথা ঠিক আছে তো! মাঠে নেমেছিল চার গোলে পিছিয়ে থেকে। তিন গোল করার পর এখন করতে হবে আরও তিন গোল!
৮৭ মিনিট পর্যন্তও কেউ কিছু পাল্টাতে পারল না। সেই তিন গোলই চাই।
উনাই এমেরির পিএসজি রক্ষণাত্মক খেলছিল। শুধু লিওনেল মেসিকে বোতলবন্দী করার ব্যস্ততায় অন্যদের বল্গাহরিণের মতো দৌড়ানোর জায়গা ছিল। সেখান থেকে হাজার কিলোমিটার দূরে বেনফিকাকে হারিয়ে বরুসিয়া ডর্টমুন্ড কোচ টমাস টুখেল ছুটে যান নিজের অফিসে। ক্যাম্প ন্যুতে কী হয় দেখতে হবে!
নেইমার ঠিক তখনই আলো হয়ে ফুটলেন। বার্সেলোনায় সম্ভবত তাঁর সেরা মুহূর্ত।
আনহেল দি মারিয়ার ফাউলের শিকার হয়ে ৮৮ মিনিটে নেইমার যে ফ্রি–কিক নেন, সেটাকে ২০ গজি ম্যাজিক বলা যায়। গোলকিপার কেভিন ট্রাপের কিছু করার ছিল না। বাঁকানো তিরের ফলার মতো ঢোকে জালে। তিন মিনিট পরই মেসির কথায় পেনাল্টি শট নিয়ে নেইমারের দ্বিতীয় গোল (৫-৫)। ৯৫ মিনিটে ব্রাজিলিয়ানের পাস মেসিকে টপকে, পিকেকে পেছনে ফেলে একদম সের্হি রবার্তোর পায়ের সামনে। তাঁর শট এবং গোল (ম্যাচে ৬-১ ও দুই লেগ মিলিয়ে ৬-৫)!
মাটিতে পড়ে উদ্যাপন করছিলেন রবার্তো। মুহূর্তেই নেই হয়ে গেলেন একের পর এক সতীর্থ তাঁর গায়ের ওপর পড়ায়। টাচলাইনে এনরিকে ছুটলেন দ্বিগ্বিদিক। আর গ্যালারি উদ্বাহু, উন্মত্ত, অবিশ্বাস্য! হঠাৎ দেখা গেল, মানুষ দৌড়ে মাঠে ঢুকছে। ঢলের মতো লোক নামছে গ্যালারি থেকে। মানুষের এমন গর্জন এই স্টেডিয়ামে আগে শোনা যায়নি। এর মধ্যেই দেখা গেল খেলোয়াড়দের কাঁধে মেসি। নেইমার সেদিন বুঝেছিলেন, বার্সায় মেসিই শেষ কথা। মেসি থাকতে নেইমার ওই জায়গা কখনো পাবেন না। ব্যালন ডি’অর জিততে তাঁকে মধ্যমণি হয়ে থাকতে হবে। অতএব? ওই ম্যাচই হয়ে রইল বার্সায় ‘এমএসএন’ জুটির শেষ জয় ও শেষ গোল।
দলবদলের ফিতে বিশ্ব রেকর্ড গড়ে নেইমার যোগ দেন পিএসজিতে। মাঝে আল হিলাল ঘুরে এখন সান্তোসে। ব্যালন ডি’অর জেতা হয়নি।
বার্সা সেবার কোয়ার্টার ফাইনাল পেরোতে পারেনি। এনরিকেও থাকেননি। মৌসুম শেষে ছেড়ে যান ক্যাম্প ন্যু। গত বছর চ্যাম্পিয়নস লিগ জেতান পিএসজিকে।
এনরিকের নিশ্চয়ই আজকের দিনটা মনে আছে? ৯ বছর আগে এই দিনেই তো জন্ম লা রেমোন্তাদার, যে ম্যাচে বার্সাকে আসলে ‘কামব্যাক’ করতে হয় দুবার। ডেড। রিভাইভড। ডেড। রিভাইভ।