ফুটবলে গার্দিওলার সেই একচ্ছত্র আধিপত্যের যুগ কি তবে শেষ হয়ে এল
দুই দশক আগে কোচিং ক্যারিয়ার শুরু করার পর থেকে যেখানেই গেছেন, দাপট দেখিয়েছেন পেপ গার্দিওলা। তাঁর কোচিংয়ে দলগুলো যে শুধু শিরোপা জিতেছে, তা নয়, ফুটবলের ব্যাকরণই বদলে দিয়েছেন তিনি। বদলে দিয়েছেন ফুটবলের সংস্কৃতিও।
২০০৮ সাল থেকে বার্সেলোনা, বায়ার্ন মিউনিখ আর ম্যানচেস্টার সিটির ডাগআউটে দাঁড়িয়ে তিনি জিতেছেন ১২টি লিগ শিরোপা, ১০টি ঘরোয়া কাপ ও ৩টি চ্যাম্পিয়নস লিগসহ মোট ৩৯টি ট্রফি। সর্বকালের অন্যতম সেরা কোচের তালিকায় তাঁর নাম প্রথম তিনজনের মধ্যেই থাকবে।
কিন্তু ইদানীং প্রশ্ন উঠছে, রাজকীয় সেই শাসনের সূর্য কি এখন অস্তাচলে?
বুধবার রাতে ইতিহাদ স্টেডিয়ামে ব্রাইটনের সঙ্গে ১-১ গোলে ড্র করে পয়েন্ট হারিয়েছে সিটি। এ নিয়ে টানা তিন ম্যাচে পয়েন্ট হারাল তারা। গত বৃহস্পতিবার এমিরেটসে আর্সেনালও লিভারপুলের সঙ্গে গোল শূন্য ড্র করায় কিছুটা হলেও স্বস্তি পেয়েছে সিটি। নইলে শীর্ষে থাকা আর্সেনালের সঙ্গে ব্যবধান হয়ে যেত ৮ পয়েন্টের। আপাতত সিটি ২১ ম্যাচ পর আর্সেনালের চেয়ে ৫ পয়েন্ট পিছিয়ে ২ নম্বরে।
গত মৌসুমটাও সিটির জন্য ছিল বিভীষিকার মতো। সমর্থকেরা আশা করেছিলেন, এবার হয়তো প্রিমিয়ার লিগ পুনরুদ্ধারে জানপ্রাণ লড়িয়ে দেবে ‘স্কাই ব্লু’রা। জানুয়ারি মাস চলছে, সম্ভাবনা এখনো শেষ হয়ে যায়নি ঠিকই, কিন্তু সেই চেনা অপ্রতিরোধ্য সিটিকে যেন খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। সময় কি তবে বদলে যাচ্ছে?
পরিসংখ্যানের দিকে তাকালে গার্দিওলার দলের একধরনের পতন চোখে পড়ে। প্রিমিয়ার লিগে ২১ ম্যাচ শেষে সিটির সংগ্রহ ৪৩ পয়েন্ট। কোচ হিসেবে গার্দিওলার ক্যারিয়ারে ২১ ম্যাচ শেষে এর চেয়ে কম পয়েন্ট ছিল মাত্র দুবার—সিটিতে তাঁর প্রথম মৌসুম (৪২ পয়েন্ট) এবং গত মৌসুম (৩৫ পয়েন্ট)। যদিও এই মানদণ্ড সাধারণ কোনো কোচের জন্য খুব একটা খারাপ নয়। কিন্তু গার্দিওলার নিজের তৈরি করা মানদণ্ডে যে এই পারফরম্যান্স খুবই খারাপ, তা পরিসংখ্যানই বলছে।
ইতিহাদে প্রায় ১০ বছর কাটিয়ে ফেলেছেন পেপ। কোনো ক্লাবে এত দীর্ঘ সময় তিনি আগে কখনো থাকেননি। সিটিকে তিনি ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা এক দল বানিয়েছিলেন, জিতেছিলেন টানা চারবার প্রিমিয়ার লিগ শিরোপা। কিন্তু সেই সোনালি সময়ের কারিগরদের অনেকেই এখন নেই। কেভিন ডি ব্রুইনা, ইলকায় গুন্দোয়ান, কাইল ওয়াকার আর এদেরসনরা বিদায় নিয়েছেন। বের্নার্দো সিলভা আর জন স্টোনসদেরও বয়স হয়েছে। শূন্য থেকে আবার নতুন করে দল গড়ার সেই শক্তি আর উদ্যম গার্দিওলার ভেতর কতটা অবশিষ্ট আছে, সেটাই এখন বড় প্রশ্ন।
গার্দিওলার হাতে এখনো আর্লিং হলান্ড-রায়ান শেরকির মতো একঝাঁক প্রতিভাবান তরুণ আর অসাধারণ এক স্কোয়াড আছে। কিন্তু ২০২৭ সালে সিটির সঙ্গে চুক্তির মেয়াদ শেষ হয়ে যাচ্ছে তাঁর। গুঞ্জন আছে, এমনকি এই মৌসুম শেষেও গার্দিওলা বিদায় নিতে পারেন। যাওয়ার আগে কি আবার সিটিকে ইংলিশ ফুটবলের শীর্ষে নিয়ে যেতে পারবেন?
প্রতিটি যুগই একসময় শেষ হয়। হয়তো বিশ্ব ফুটবলে গার্দিওলার এই আধিপত্যের যুগটাও শেষের পথে। তবে মজার ব্যাপার হলো, গার্দিওলার সাম্রাজ্য যদি শেষও হয়, ফুটবল বিশ্ব শাসন করবেন তাঁর উত্তরসূরিরাই। প্রিমিয়ার লিগের শীর্ষে থাকা আর্সেনাল কোচ মিকেল আরতেতা ছিলেন পেপের সহকারী। চেলসির হয়ে ক্লাব বিশ্বকাপ জেতা এনজো মারেসকাও তাঁর সঙ্গে কাজ করেছেন। এমনকি বায়ার্ন মিউনিখকে টানা দ্বিতীয়বার বুন্দেসলিগা জেতানোর পথে থাকা ভিনসেন্ট কোম্পানিও পেপেরই শিষ্য।
গার্দিওলার পতাকা উড়বে তাঁদের হাতেই।