দ্বিতীয় বিভাগে ১৭তম দলের কাছে হেরে বিদায় রিয়ালের, আরবেলোয়া বললেন ‘দায় আমার’
এবার কি তাহলে আলভারো আরবেলোয়াকেও কাঠগড়ায় তুলবে রিয়াল মাদ্রিদ? চাইলে ছাঁটাইও করতে পারে!
জেদ্দায় গত রোববার স্প্যানিশ সুপার কাপের ফাইনালে বার্সেলোনার কাছে ৩-২ গোলে হারের পর জাবি আলোনসোকে কোচ পদ থেকে সরিয়ে দেয় মাদ্রিদের ক্লাবটি। তাদের পরবর্তী ম্যাচ ছিল গতকাল রাতে কার্লোস বেলমন্ত স্টেডিয়ামে। কোপা দেল রে শেষ ষোলোয় স্প্যানিশ ফুটবলে দ্বিতীয় স্তরের দল আলবাখেটের বিপক্ষে। শেষ বাঁশি বাজার পর দেখা গেল নতুন কোচ হিসেবে অভিষেকে জাবির পথেই হেঁটেছেন আরবেলোয়া। আলবাখেটের কাছে রিয়াল হেরেছে সেই ৩-২ গোলেই।
জাবির তবু একটা সান্ত্বনা হতে পারে যে হারটা চিরপ্রতিদ্বন্দ্বীদের বিপক্ষে, শক্তিতে ও ঐতিহ্যে যাদের সঙ্গে তুলনা চলে। কিন্তু আরবেলোয়ার তো সেটুকুও নেই।
আলবাখেটে স্পেনের শীর্ষ লিগে (লা লিগা) খেলার সুযোগই পেয়েছে মাত্র সাতবার। আর রিয়াল এই প্রতিযোগিতায় শিরোপাই জিতেছে ৩৬ বার। ট্রান্সফারমার্কেট জানাচ্ছে, আলবাখেটে স্কোয়াডের বাজারমূল্য ১ কোটি ৪৫ লাখ ইউরো, রিয়ালের ১৩৫ কোটি ইউরো। আকাশ-পাতাল পার্থক্য আরকি।
সে জন্যই প্রশ্নটি উঠতে পারে—স্প্যানিশ ফুটবলের সবচেয়ে কম মর্যাদার শিরোপা লড়াইয়ে বার্সার কাছে হারের পর যদি শীর্ষ স্তরে পরীক্ষিত কোচ জাবির চাকরি যায়, তাহলে তার চেয়ে আরেকটু বেশি মর্যাদার টুর্নামেন্টে দ্বিতীয় বিভাগীয় দলের কাছে হারে আরবেলোয়ার চাকরি থাকে কীভাবে?
স্প্যানিশ ফুটবলে এই ফল যেমন চমকে দেওয়ার মতো তেমনি রিয়ালের ‘বি’ দল থেকে মূল দলের দায়িত্ব পাওয়া আরবেলোয়ার জন্য সেই ফলটাই অভিষেক পণ্ড করল। অবশ্য রিয়ালের কোচ হিসেবে অভিষেকে হারের তেতো স্বাদ পাওয়া প্রথম কোচ নন আরবেলোয়া। সর্বশেষ প্রায় চার দশকের (৪২ বছর) মধ্যে এই তালিকায় আরবেলোয়া দশম, তাঁর আগে সর্বশেষ ২০১৮ সালে হুলেন লোপেতেগিকেও একই ফল ভোগ করতে হয়। আরবেলোয়ার কষ্ট আছে আরও।
কোপা দেল রে-তে খেলোয়াড় ও কোচ হিসেবে রিয়ালের হয়ে অপেক্ষাকৃত নিচু স্তরের দলের বিপক্ষে হারের তেতো স্বাদ পাওয়া দ্বিতীয় ব্যক্তি আরবেলোয়া। ১৯৭৬ সালে টেনেরিফের বিপক্ষে খেলোয়াড় হিসেবে এবং ২০০০ সালে তোলেদোর বিপক্ষে হারেন ভিসেন্তে দেল বস্ক। আরবেলোয়া ২০০৯ সালে আলকরকনের বিপক্ষে খেলোয়াড় হিসেবে (স্প্যানিশ ফুটবলে যে ম্যাচ ‘আলকরকোনাজ্জো’ নামে পরিচিত) তারপর কোচ হিসেবে গতকাল রাতে।
আলবাখেটের জন্য আরবেলোয়ার অভিষেক পণ্ড করা জয়টাই আবার ঐতিহাসিক। তাদের ৮৬ বছরের ইতিহাসে রিয়ালের বিপক্ষে এটাই প্রথম জয়, যেটা তাদের পাইয়ে দিয়েছে কোয়ার্টার ফাইনালের টিকিট।
রিয়াল কোচ হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব নেওয়ার পরের দিনই প্রথম ম্যাচে এই হার আরবেলোয়ার জন্য অবশ্যই কষ্টের। তবে হারের দায়টাও নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছেন। ম্যাচ শেষে সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, ‘এই ক্লাবে ড্র বাজে ফল, ট্র্যাজেডি বলতে পারেন। তাহলে ভাবুন এমন একটা হার কেমন হতে পারে। এটা কষ্টের, বিশেষ করে নিচু স্তরের দলের বিপক্ষে। অবশ্যই আমাদের উন্নতি করতে হবে। দায় আমার। সিদ্ধান্তগুলো আমার; দল, কীভাবে খেলব, বদলি।’
আরবেলোয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে কথা উঠতেই পারে। কিলিয়ান এমবাপ্পে, থিবো কোর্তোয়া, অরেলিয়ে চুয়ামেনি, আলভারো ক্যারেরাস, জুড বেলিংহাম রদ্রিগোদের ছাড়াই দলের একাদশ গঠন করেন। আরবেলোয়ার ভাবনাতেই ছিল না স্পেনের দ্বিতীয় বিভাগের পয়েন্ট টেবিলে ১৭তম দলের বিপক্ষে পুরো শক্তির দল মাঠে নামাতে হবে। এ নিয়ে অবশ্য তাঁর আক্ষেপ নেই, ‘আমার কোনো অনুশোচনা নেই। আবারও সুযোগ পেলে এই একই দলই গড়তাম।’
কিন্তু ম্যাচের বাস্তবতা বলছে, হেলাফেলা করা কিংবা যে কারণেই হোক পুরো শক্তির দল মাঠে না নামানোর ফলটা হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছেন আরবেলোয়া। ‘কামব্যাক’ করায় খ্যাতি কুড়োনো রিয়াল এই ম্যাচে প্রথমে দুবার পিছিয়ে পড়েও ঘুরে দাঁড়ায়। কিন্তু তৃতীয় দফায় পিছিয়ে পড়ার পর আর ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি।
৪২ মিনিটে আলবাখেটে মিডফিল্ডার জাভি ভিলারের হেডে করা গোলে পিছিয়ে পড়ে রিয়াল। প্রথমার্ধের যোগ করা সময়ে (৪৫+৩) তাদের সমতায় ফেরান মিডফিল্ডার ফ্রাঙ্কো মাস্তানতুয়োনো। ৮২ মিনিটে ফরোয়ার্ড জেফটে বেতানকোরের গোলে আবারও এগিয়ে যায় আলবাখেটে। দ্বিতীয়ার্ধের যোগ করা সময়ে (৯০+১) রিয়ালকে আবারও সমতায় ফেরান ফরোয়ার্ড গঞ্জালো গার্সিয়া। তখন মনে হচ্ছিল, অতিরিক্ত সময়ে গড়াতে পারে ম্যাচ। কিন্তু শেষ চমকটা এল তারপরই। যোগ করা সময়েই (৯০+৩) একেবারে শেষ মুহূর্তে বাঁ দিক থেকে বেতানকোরের কোনাকুনি লব করা শট রিয়াল গোলকিপার আন্দ্রে লুনিনের মাথার ওপর দিয়ে জড়ায় জালে। অন্য ভাষায়, দুঃস্বপ্নের ষোলোকলা পূর্ণ হয় রিয়ালের। যে কারণে শেষ বাঁশি বাজার পর কাঁদতে কাঁদতে মাঠ ছাড়েন দলটির ডিফেন্ডার জেসুস ভালেয়ো।
ম্যাচের প্রায় ৮০ শতাংশ সময় বল দখলে রেখেও তুলনামূলক নিচু স্তরের দলের বিপক্ষে হার—আরবেলোয়াকে নিয়ে সমালোচনা শুরু হলো বলে! এমনিতেই কথা উঠেছে, সিনিয়র পর্যায়ে কোচিংয়ের অভিজ্ঞতা না থাকা কাউকে কীভাবে এমন কঠিন সময়ে মূল দলের কোচের দায়িত্ব তুলে নেয় রিয়াল?
আরবেলোয়া অবশ্য এসব নিয়ে ভাবছেন না। শুনুন তাঁর মুখেই, ‘লোকে এটাকে ব্যর্থতা মনে করলে আমার আপত্তি নেই। আমার মতে, সফলতার পথেই ব্যর্থতা থাকে...এই শব্দে আমার ভয় নেই। জীবনে অনেক ব্যর্থ হয়েছি।’
ব্যর্থতার এই শিবিরের অন্য প্রান্তেই ছিল দারুণ সফলতার আনন্দ। শুনুন আলবাখেটে ফরোয়ার্ড বেতানকোরের মুখেই, ‘ফুটবলে এর চেয়ে বড় কোনো কিছু আমার জীবনে ঘটেনি। এমন কিছুর স্বপ্নই দেখেছি। নয় বছর আগে ফুটবল ছেড়ে দিতে চেয়েছিলাম। এখন স্বপ্ন দেখি, কঠোর পরিশ্রম করি আর দেখুন এখন কোথায় দাঁড়িয়ে! এটা আমাদের প্রাপ্য ছিল।’
কোপা দেল রে থেকে বিদায়ের পর এখন লা লিগায় ফিরতে হবে রিয়ালকে। শনিবার রাতে স্বাগতিক হয়ে লেভান্তেকে আতিথ্য দেবে তারা। শীর্ষে থাকা বার্সার সঙ্গে ৪ পয়েন্ট ব্যবধানে পিছিয়ে দুইয়ে রিয়াল। কোচ বদল ও হারের বৃত্তে ঘুরপাক খাওয়ার এই সময়কে সবচেয়ে ভালোভাবে বর্ণনা করেছেন রিয়ালের ডিফেন্ডার দানি কারবাহল, ‘আমরা তলানিতে পৌঁছে গেছি...সমর্থকদের কাছে ক্ষমা চাইছি।’