২০২৬ বিশ্বকাপ বিতর্ক: কেন উঠছে বয়কটের কথা, ট্রাম্প কী করছেন, শেষ পর্যন্ত কী হতে পারে
একদিকে ডোনাল্ড ট্রাম্প গ্রিনল্যান্ড দখলের হুমকি দিচ্ছেন, ওদিকে মিনিয়াপোলিসে তাঁর সরকারের এজেন্টদের গুলিতে দুই বিক্ষোভকারী প্রাণ হারিয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান টালমাটাল রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে একটা দাবি বেশ জোরেশোরেই উঠছে—২০২৬ বিশ্বকাপ বয়কট।
যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোর যৌথ আয়োজনে হতে যাওয়া এ মহাযজ্ঞ ঘিরে কি আসলেই কোনো অনিশ্চয়তা আছে?
আসলে বিশ্বকাপ বয়কটের এ ডাক যতটা জোরে শোনা যাচ্ছে, বাস্তবে তার প্রভাব ততটা নয়। আলোচনাটা মূলত ট্রাম্পের নীতি ও কৌশলের সমালোচক আর সাধারণ ফুটবল–সমর্থকদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। যাঁদের হাতে আসল ক্ষমতা, তাঁদের মধ্যে এ আলোচনা এখনো অর্থবহ জায়গায় পৌঁছায়নি। কোনো উচ্চপদস্থ ফুটবল কর্মকর্তা বা সরকারপ্রধানেরা—যাঁরা চাইলে সত্যিই প্রভাব রাখতে পারেন, তাঁদের মধ্যে এই বয়কট নিয়ে এখনো তেমন কোনো শোরগোল নেই। তাই বলে ভাবনাটা একেবারে অমূলকও নয়। ট্রাম্পের খামখেয়ালি স্বভাবের কথা তো সবারই জানা। যদি সামনের দিনগুলোতে তিনি আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নতুন কোনো বিতর্কের জন্ম দেন, তবে এই বয়কটের আওয়াজ আরও জোরেশোরে ছড়িয়ে পড়তে পারে।
কেন বিশ্বকাপ বয়কটের কথা উঠছে
ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের প্রথম বছর থেকেই এই গুঞ্জনটা ডালপালা মেলছিল। বিশেষ করে তাঁর অভিবাসন নীতি আর অগণতান্ত্রিক কর্মকাণ্ডে নাখোশ ফুটবলপ্রেমীরা চাইছিলেন না এমন দেশে বিশ্বকাপের আসর বসুক। এর মধ্যেই আগুনে ঘি ঢেলেছে ডেনমার্কের নিয়ন্ত্রণে থাকা গ্রিনল্যান্ড দখলের জন্য ট্রাম্পের জেদ।
ট্রাম্প সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, গ্রিনল্যান্ডকে তিনি আমেরিকার অংশ হিসেবেই দেখতে চান। এমনকি এর জন্য সামরিক হস্তক্ষেপ বা ইউরোপীয় দেশগুলোর ওপর চড়া শুল্ক আরোপের হুমকিও দিয়ে রেখেছেন। যদিও পরে কিছুটা সুর নরম করেছেন, কিন্তু ন্যাটোর মিত্রদেশগুলো বিষয়টিকে মোটেই ভালোভাবে নেয়নি। অনেকে তো বলেই দিয়েছেন, ট্রাম্পের প্রিয় এই ফুটবল আসর বয়কট করেই তাঁকে মোক্ষম জবাব দেওয়া উচিত। কারণ, ট্রাম্প বিশ্বকাপকে দেখছেন নিজের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করার একটা মঞ্চ হিসেবে।
কারা বিশ্বকাপ বয়কটের কথা বলছেন
কিছু ফুটবলপ্রেমী ও ফুটবল-রাজনীতি বিশ্লেষকদের বাইরে জার্মানি ও ফ্রান্সে কয়েকজনের মুখে মৃদু প্রতিবাদের কথা শোনা গেছে। জার্মান ক্লাব সেন্ট পাওলির সভাপতি ও জার্মান ফুটবল ফেডারেশনের সহসভাপতি ওকে গটলিশ যেমন স্থানীয় এক পত্রিকায় সরাসরিই বলেছেন, ‘সময় এসেছে বিশ্বকাপ বয়কটের বিষয়ে গুরুত্ব দিয়ে ভাবার।’ এই সপ্তাহে দ্য অ্যাথলেটিককে দেওয়া সাক্ষাৎকারেও তিনি আবারও একই কথা বলেছেন।
কিন্তু জার্মান ফুটবল ফেডারেশনের সভাপতি বেয়ার্ন্ড নয়েনডর্ফ দ্রুতই বিষয়টি নাকচ করে দিয়েছেন। তাঁর কথা, ‘আমি একে বড় কোনো বিতর্কই মনে করি না। ফেডারেশনের ভেতরে আমাদের প্রায় সবাই একমত—এই আলোচনা এ মুহূর্তে পুরোপুরি ভুল পথে আছে।’ তাঁর কথা, গটলিশের মন্তব্য ‘একজনের ব্যক্তিগত মত’, যিনি ‘খুব বেশি দিন হয়নি আমাদের সঙ্গে আছেন।’
ফ্রান্সের বিশ্বকাপ বয়কটের ভাবনাও বাতিল করে দিয়েছেন ক্রীড়ামন্ত্রী ও ফুটবল ফেডারেশনের সভাপতি। ক্রীড়ামন্ত্রী মারিনা ফেরারি বলেছেন, ‘এই পর্যায়ে আমাদের আলোচনায় এই বড় প্রতিযোগিতা বয়কটের কোনো ইচ্ছা নেই।’ ফরাসি ফুটবল ফেডারেশনের সভাপতি ফিলিপ দিয়ালো আরএমসি স্পোর্টকে বলেছেন, ‘আমি আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির দিকে নজর রাখছি। কিন্তু এ মুহূর্তে ফরাসি দলের বিশ্বকাপ বয়কটের প্রশ্নই ওঠে না।’
ইংল্যান্ড ও স্কটল্যান্ডে এ নিয়ে তেমন কেউ কথা বলেননি। স্পেনেও বাস্তব কোনো আলোচনা নেই বলে জানিয়েছেন দেশটির ফুটবল ফেডারেশনের একটি সূত্র। অস্ট্রিয়ায় ফেডারেশনের সভাপতি বলেছেন, তিনি ‘রাজনীতি ও খেলাকে আলাদা রাখতে চান’।
বিশ্বকাপ বয়কট বাস্তবায়ন করা কীভাবে সম্ভব
২০২৬ বিশ্বকাপ পুরোপুরি বয়কট করতে হলে সেটা নিশ্চিতভাবেই একাধিক দেশের সরকারপ্রধানদের সমন্বিত উদ্যোগে হতে হবে।
খেলোয়াড়দের বেশির ভাগই খেলতে চাইবেন। ফুটবল ফেডারেশনগুলো এবং যেসব প্রতিষ্ঠান বিশ্বকাপের সঙ্গে আর্থিকভাবে জড়িত, তারাও অংশ নিতে আগ্রহী থাকবে। বয়কট সংগঠিত ও কার্যকর করার ক্ষমতা আসলে শুধু বিশ্বের প্রভাবশালী রাজনীতিবিদদেরই আছে। বিশেষ করে রাষ্ট্রপ্রধানদের। যদি ইউরোপের বড় দেশগুলো একজোট হয়ে ট্রাম্পের ওপর চাপ তৈরি করতে বিশ্বকাপকে ‘রাজনৈতিক কৌশল’ হিসেবে ব্যবহার করেন, তবেই শুধু দৃশ্যপট বদলে যেতে পারে।
আসলে আধুনিক ক্রীড়া ইতিহাসে বড় কোনো আয়োজন বয়কট করার সবচেয়ে বড় ঘটনা (১৯৮০ সালের মস্কো অলিম্পিক) এমনভাবেই ঘটেছিল। সেবার তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের আফগানিস্তান আক্রমণের প্রতিবাদে আমেরিকার চাপে প্রায় ৬০টি দেশ অলিম্পিক বর্জন করেছিল। (যেটির পাল্টা হিসেবে ১৯৮৪ লস অ্যাঞ্জেলস অলিম্পিকেও বয়কটের ঘটনা অবশ্য দ্য অ্যাথলেটিকের প্রতিবেদনে নেই)।
১৯৮০ সালের মস্কো অলিম্পিক বর্জনের মতো প্রচারণা চালাতে হলে ইউরোপের ন্যাটো দেশগুলোকেই এগিয়ে আসতে হবে। যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডাকে বাদ দিলে ন্যাটোর নয়টি দেশ ইতিমধ্যে ২০২৬ বিশ্বকাপে জায়গা নিশ্চিত করেছে। মার্চে আরও চারটি যোগ হতে পারে। এই তালিকায় স্পেন, ফ্রান্স, ইংল্যান্ড, জার্মানি, নেদারল্যান্ডস, পর্তুগাল ও বেলজিয়ামের মতো বড় দল আছে। যাদের বেশির ভাগই ফিফা র্যাঙ্কিংয়ের শীর্ষ দশের মধ্যে বা আশপাশে। এদের ছাড়া বিশ্বকাপ হলে সেটিকে গ্রহণযোগ্য হবে না।
সাবেক মার্কিন কূটনীতিক ও জেটর গ্লোবাল স্পোর্টস অ্যান্ড এন্টারটেইনমেন্টের প্রধান নির্বাহী ট্রাভিস মারফি বলেছেন, ‘ওরা (এই দেশগুলো) যদি একসঙ্গে বয়কট করে বা বয়কটের হুমকি দেয়, তাহলে ট্রাম্প প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষণ হবেই। কারণ, ট্রাম্প প্রশাসন বিশ্বকাপকে কতটা গুরুত্ব দিচ্ছে, সেটা সবাই জানে।’
বিশ্বকাপে কি কখনো বয়কট হয়েছে
অনেক সময় কিছু দেশ নানা কারণে বিশ্বকাপে অংশ নেয়নি বা বাছাইপর্বে নাম লেখায়নি।
ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, ১৯৩৪ সালে উরুগুয়ে ইতালিতে খেলতে যায়নি অভিমান থেকে। ১৯৬৬ বিশ্বকাপের আগে আফ্রিকার দেশগুলো প্রতিবাদ জানিয়েছিল ফিফার কোটা বণ্টনের বিরুদ্ধে।
সমর্থকদের অবস্থান কী
পুরো দেশ বয়কট না করলেও অনেক সমর্থক গোষ্ঠী কিন্তু কিছু প্রতিবাদী কর্মসূচি নিয়েছে। যেমন ইংল্যান্ডের এলজিবিটিকিউ সমর্থক গোষ্ঠী ‘থ্রি লায়নস প্রাইড’ জানিয়ে দিয়েছে, আমেরিকার কঠোর পুলিশি ব্যবস্থা আর বাক্স্বাধীনতা নিয়ে উদ্বেগের কারণে তারা মাঠে যাবে না। সাবেক ফিফা বস সেপ ব্ল্যাটারও বলেছেন, ফুটবল–সমর্থকদের উচিত ‘যুক্তরাষ্ট্র থেকে দূরে থাকা, টেলিভিশনে বিশ্বকাপ দেখা’।
শেষ পর্যন্ত কী হতে পারে
সত্যি বলতে, ২০২৬ বিশ্বকাপ বর্জনের আশঙ্কা বর্তমানে খুবই ক্ষীণ। ট্রাম্প গ্রিনল্যান্ড ইস্যুতে আপাতত পিছু হটেছেন এবং ন্যাটোর সঙ্গে সমঝোতার ইঙ্গিত দিয়েছেন। কিন্তু ট্রাম্প খুব অননুমেয়, তাঁর মতিগতি বোঝা সত্যিই মুশকিল। যদি তিনি কোনো ন্যাটো সদস্যদেশ আক্রমণ করেন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ–পরবর্তী বিশ্বব্যবস্থার ভিত্তি চুক্তি ভেঙে ফেলেন, তাহলে ইউরোপের প্রতিক্রিয়াও হতে পারে নজিরবিহীন। তখন ইউরোপীয় দেশগুলো হয়তো শেষ অস্ত্র হিসেবে বিশ্বকাপ বয়কটের কৌশল নিতেও পারে।