বিশ্বকাপ জয়ের মতো বড় অর্জন উপকার এবং অপকার দুটিই করতে পারে। একটি সাফল্য আরও অনেক সাফল্যকে টেনে নিয়ে আসতে পারে। বিশ্বকাপ জয়ের মতো ঘটনা আগুয়ান প্রজন্মকেও দারুণভাবে উৎসাহিত করতে পারে। আবার ঘটতে পারে উল্টোটাও। সাফল্য অনেক সময় ক্লান্তিও নিয়ে আসতে পারে।

৩৬ বছরের অপেক্ষা ঘুচে যাওয়ায় স্বাভাবিকভাবেই আর্জেন্টাইনদের মন এখন তৃপ্ত। কাঙ্ক্ষিত অর্জন যে আত্মতুষ্টির জন্ম দেয়, তা পরবর্তী প্রজন্মের সামনে এগিয়ে যাওয়ার পথকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে না। সম্ভাব্য এ দুটি পথকে খোলা রেখে বিশ্ব ফুটবলে আর্জেন্টিনার ভবিষ্যতে আলো ফেলে দেখা যেতে পারে।

কাতার বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনা তো বটেই, পুরো পৃথিবীর চোখ ছিল লিওনেল মেসির ওপর। খুদে জাদুকরের হাতে বিশ্বকাপ দেখতে মুখিয়ে ছিল পৃথিবীর কোটি মানুষ। শেষ পর্যন্ত সে আশা পূরণও হয়েছে। দোহায় বিশ্বকাপ ট্রফি হাতে নেওয়ার পর মেসি এখন শাশ্বত। তবে বিশ্বকাপ জেতার পর আর্জেন্টাইন ফুটবলে ঘটে যাওয়া নীরব বিপ্লব কিছুটা হলেও ঢাকা পড়েছে।

মেসি-দি মারিয়াদের সঙ্গে আর্জেন্টিনার বিশ্বকাপ জয়ে বড় ভূমিকা রেখেছেন হুলিয়ান আলভারেজ, অ্যালেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টার, এনজো ফার্নান্দেজের মতো একদল তরুণ। বিশ্বকাপের আগে তাঁরা অতটা পরিচিত ছিলেন না। যুব ফুটবল দল থেকেই মূলত তাঁদের খুঁজে বের করা হয়েছে। এই তারকাদের খুঁজে আনার কৃতিত্ব স্কালোনির পাশাপাশি আরেকজনকে দিতে হবে, তিনি সাবেক ফুটবলার পাবলো আইমার। স্কালোনির বিশ্বকাপজয়ী দল গড়ে ওঠার পেছনে আইমারের ফুটবলদর্শন দারুণ ভূমিকা পালন করেছে।

তবে ম্যাক অ্যালিস্টার-ফার্নান্দেজদের বাইরে আরও এমন অনেক নাম আছে, যাঁরা ব্যাটনটাকে এগিয়ে নিতে প্রস্তুত হচ্ছেন। আর্জেন্টাইন ফুটবলের এই ভবিষ্যতের সারথিরা যেমন দেশের ফুটবল কাঠামোর ভেতর প্রস্তুত হচ্ছেন, তেমনি ইউরোপের বিভিন্ন ক্লাবেও তাঁদের অঙ্কুরোদ্‌গম হচ্ছে।

বর্তমান সময়ের তারুণ্যের খোঁজ নেওয়ার আগে সাম্প্রতিক অতীতে আর্জেন্টাইন ফুটবলের চিত্রটা কেমন ছিল, তা একটু দেখে নেওয়া যাক। ১৯৯১ সালের যুব বিশ্ব চ্যাম্পয়িনশিপের ম্যাচে গণ্ডগোল বাঁধিয়ে ফিফার নিষেধাজ্ঞায় পড়ে আর্জেন্টিনা। এরপর ১৯৯৪ সালে ম্যারাডোনার ডোপ কেলেঙ্কারি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে।

তবে দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়া পরিস্থিতিতে দলকে জাদুকরি শক্তিতে বদলে দেন হোসে পেকারম্যান। সুনিপুণভাবে ফুটবলার খুঁজে বের করার কাজটি শুরু করেন এই কোচ। তাঁর অধীনে ১৯৯৫ সালে ব্রাজিলকে হারিয়ে যুব চ্যাম্পিয়নশিপ জেতে আর্জেন্টিনা। মজার ব্যাপার হচ্ছে, সেটিও ছিল কাতারে।

দুই বছর পর আবারও চ্যাম্পিয়নশিপের ট্রফি জেতে আর্জেন্টাইন যুবারা। আর এই যুবদল থেকে বেরিয়ে আসেন পাবলো আইমার, এস্তেবান ক্যাম্বিয়াসো, হুয়ান রিকেলমের মতো তারকারা। আর এভাবেই আর্জেন্টিনার নতুন একটি প্রজন্মের ভিত তৈরি হয়। দলটি বিশ্বমঞ্চে হয়তো সেভাবে সাফল্য পায়নি, তবে খেলোয়াড় তৈরির যে ধারা সেটিকে এগিয়ে নিতে সাহায্য করেছে। অন্যদিকে পেকারম্যানের দাঁড় করানো ভিতেই মূলত নানা ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্যে এগিয়ে গেছে আর্জেন্টিনার ফুটবল।

পেকারম্যান নিজেও পরবর্তী সময়ে জাতীয় দলের কোচের দায়িত্ব পান। ২০০৫ সালে লিওনেল মেসির আগমনী বার্তাও কিন্তু এই বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপে পাওয়া গিয়েছিল। ফাইনালে জোড়া গোল করে নাইজেরিয়াকে হারিয়ে পঞ্চম শিরোপা এনে দেন মেসিই। আর সবার প্রিয় সেই ছোট্ট লিও অনেক লম্বা পথ পেরিয়ে এখন বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন। আর মেসির এক সময়ের সতীর্থ হ্যাভিয়ের মাচেরানো এখন যুবদলের কোচ। তাঁর অধীনেই জাতীয় দলের ভবিষ্যতের খেলোয়াড়েরা নিজেদের পথ গড়ে নিচ্ছেন।

২০২১ সালে দায়িত্ব নেওয়ার পর যুবদলকে নিয়ে দারুণ কাজ করছেন সাবেক এই বার্সেলোনা তারকা। তিনি শুধু খেলোয়াড়দের স্কিলেই চোখ রাখছেন না, বরং তাদের ব্যক্তিত্বের বিকাশেও জোর দিচ্ছেন। দায়িত্ব নেওয়ার পর মাঠের খেলায় দক্ষতা বৃদ্ধির পাশাপাশি বেশ কিছু বাহ্যিক নিয়মও আরোপ করেছেন মাচেরানো। যেমন খেলোয়াড়দের ইংরেজি শিখতে হবে, বিমানবন্দরে অবসর সময় পেলে তখন বই পড়ে কাটাতে হবে, নিজেদের বুট নিজেদের পরিস্কার করতে হবে, নিজেদের খাবার নিজেরা নিয়ে খেতে হবে, খাওয়ার পর প্লেট নিজেদের ধুয়ে রেখে আসতে হবে এবং নিজেদের রুম পরিষ্কার রাখতে হবে।

এসব নিয়ম যে খেলোয়াড়দের মানসিক বিকাশ ও আধুনিক ফুটবলে মাঠের বাইরের চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলার জন্য আরোপ করা, তা একরকম স্পষ্ট। শুধু এটুকু নয়, যদি এসব নিয়ম ঠিকঠাক প্রয়োগ করা যায়, তবে লাতিন ফুটবলারদের হুট করে হারিয়ে যাওয়ার যে প্রথা, তা থেকেও এই খুদে ফুটবলারদের রক্ষা করা যাবে।

বর্তমানে আর্জেন্টিনার যুব ফুটবল দলের কাঠামোর ভেতর দিয়ে বের হয়ে আসা তারকাদের সংখ্যা একেবারে কম নয়। অন্তত এক ডজন এমন তরুণ এরই মধ্যে আবিষ্কৃত হয়েছে, যাঁরা আর্জেন্টিনার ফুটবলের সাফল্যের ধারাকে এগিয়ে নিতে সক্ষম। যাঁদের অনেককে টেনে নিতে ইউরোপের জায়ান্ট ক্লাবগুলোর রীতিমতো ঘুম হারাম হয়ে গেছে।

লিওনেল স্কালোনি নিজেও ‘ইউরোপাইবস’দের (ইউরোপে ছড়িয়ে–ছিটিয়ে থাকা আর্জেন্টাইন ফুটবলার) খুঁজে বের করার কাজ তদারক করছেন। যাঁকে দিয়ে স্কালোনি এ কাজটি করাচ্ছেন, তাঁর নাম হুয়ান মার্তিন তাসি। তাসির তথ্যমতে, বিভিন্ন কারণে বিশ্বব্যাপী অন্তত ৪০০ অনূর্ধ্ব-২০ বছর বয়সী আর্জেন্টাইন ফুটবলার ছড়িয়ে–ছিটিয়ে আছেন। যাঁদের কারও বাবা কিংবা মা অথবা দুজনই নিরাপদ ভবিষ্যতের আশায়, সামরিক দুঃশাসন থেকে বাঁচতে দেশ ছেড়েছেন। কেউ কেউ আবার সাবেক ফুটবলারের সন্তান, যাঁরা বিদেশে জন্মেছেন। এ তালিকায় তাঁরাও আছেন, যাঁরা নিজেদের সন্তানদের ইউরোপে খেলানোর জন্য নিয়ে গেছেন।

তেমনই এক আলোচিত ইউরোপাইবস হলেন আলেসান্দ্রো গারনাচো। কদিন আগে ম্যানচেস্টার সিটির বিপক্ষে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের জেতা ম্যাচে দারুণ ‘অ্যাসিস্ট’ করেছিলেন এই ফুটবলার। তাঁর বাবা স্প্যানিশ এবং মা আর্জেন্টাইন। এর মধ্যে আর্জেন্টিনা জাতীয় দলে ডাকও পেয়েছেন গারনাচো।

মাতিয়াস সুলের নামও উঠে আসবে। বর্তমানে ১৯ বছর বয়সী এই আর্জেন্টাইন খেলছেন জুভেন্টাসের হয়ে। ২০২০-২১ মৌসুমে জুভদের যুবদলের হয়ে খেলেন এই ফরোয়ার্ড। আর ২০২১ সাল থেকে এখন পর্যন্ত ১০ ম্যাচে মাঠেও নেমেছেন, খেলেছেন আর্জেন্টিনার বয়সভিত্তিক দলে।

ফুটবলার ডিয়েগো রোমেরোর ছেলে লুকা রোমেরোও আছেন এ তালিকায়। ২০০৪ সালে যাঁর জন্ম মেক্সিকোতে। ৩ বছর বয়সে পরিবারের সঙ্গে পাড়ি জমান মেক্সিকোতে। স্প্যানিশ ক্লাব মায়োর্কার যুবদল ও মূল দলে খেলে বর্তমানে আছেন ইতালিয়ান ক্লাব লাৎসিওতে। জাতীয় দলের রাডারে আছেন এই অ্যাটাকিং মিডফিল্ডার।

আরেক সাবেক ফুটবলার পাবলো পাজের ছেলে নিকো পাজ। তাঁর জন্ম স্পেনে। প্রস্তুত হচ্ছেন রিয়াল মাদ্রিদের যুবদলে। ১৮ বছর বয়সী এই মিডফিল্ডার আলোয় আসার আগেই বেশ আলোচনায় আছেন। ভবিষ্যতের সারথি হওয়ার সম্ভাব্য তালিকায় আছেন এই তরুণ।

এ ছাড়া অন্যদের মধ্যে দুই ভাই ফ্রাঙ্গো (১৮), ভ্যালেন্টিন (১৭), আর্জেন্টাইন বাবা ও জাপানি মায়ের সন্তান নিকো তাকাশাহি, থিয়াগো গেরালিংক, পাবলো ক্রিমাশ্চি, ম্যাক্সিমো কারিজোম এবং নিকোলো থ্রেসোলিডির নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

তবে আর্জেন্টিনার নিজ ভূমিতে তৈরি হতে থাকা উদীয়মান ফুটবলারেরও অভাব নেই। যদিও এদের অনেকে নিজেদের মুখটাকে ইউরোপের দিকে ঘুরিয়ে রেখেছেন। এই তো কদিন আগে প্রকাশিত এক সংবাদে জানা গেল, ভেলেজ-সার্সফিল্ডের ২০ বছর বয়সী সেন্টার মিডফিল্ডার ম্যাক্সিমো পেরোনেকে দলে পেতে ম্যানচেস্টার সিটি কোচ পেপ গার্দিওলা নাকি তিনবার কল করেছেন। আবার এই পেরোনোর ১৬ বছর বয়সী আর্জেন্টাইন সতীর্থ জিয়ানলুকা প্রেসতিয়ান্নিকে দলে টানতে মুখিয়ে আছে বার্সেলোনা।

এরই মধ্যে বার্সা অবশ্য ১৮ বছর বয়সী আর্জেন্টাইন ফুটবলার লুকাস রোমানকে ফেরো কারিল ওয়েস্তে থেকে নিয়ে এসেছে। এমনকি তাঁর জন্য দেওয়া রিলিজ ক্লজের দিকে তাকালে চোখ ছানাবড়া হতে বাধ্য। বাংলাদেশি টাকায় অঙ্কটি ৪ হাজার ৬১৯ কোটি। এই তথ্যটুকুই সম্ভবত আর্জেন্টিনার ফুটবলের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে আশাব্যঞ্জক ধারণা দেয়।

এ ছাড়া সামনের দিনে চোখ রাখা যেতে পারে এমন আরও কয়েকজনের নাম এখানে নেওয়া যেতে পারে। সেই নামগুলো হলো ক্রিস্টিয়ান মেদিনা, হুলিয়ান ফার্নান্দেজ, সান্তিয়াগো সিমন, আলেহো ভেলিজ, লুকা লানগোনি, ভ্যালেন্তিন গোমেজ, এজকুয়েল জেবালোস, জুয়ান সাফরোজা এবং এজকুয়েল ফার্নান্দেজ। মেসি-মারিয়ারা তাঁদের কাজ শেষ করেছেন। আর এখন সেই ধারাকে অব্যাহত রেখে চতুর্থ তারার খোঁজে এগিয়ে আসতে হবে এই তরুণদের। কিছুদিনের মধ্যে যাঁদের কাঁধে চড়বে আর্জেন্টিনার ফুটবলের ভবিষ্যৎ।