‘দ্য কিং’ পেলের উত্থান এবং ব্রাজিলের প্রথম মুকুট

১৯৩০ সালে মন্টেভিডিওর সেই ধূসর বিকেলে বিশ্বকাপ নামে যে মহাযাত্রার শুরু হয়েছিল, তা আজ শতবর্ষের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে। এই যাত্রার কোথাও পেলে-গারিঞ্চার সাম্বার ছন্দ, কোথাও ম্যারাডোনার ঈশ্বরপ্রদত্ত জাদুকরি ছোঁয়া, আবার কোথাও জিনেদিন জিদান কিংবা লিওনেল মেসির অমরত্বের পথে হেঁটে যাওয়া—সব মিলিয়েই তো এই ফুটবল-পুরাণ। ইতিহাসের ধুলো ঝেড়ে সেই সব রোমাঞ্চকর স্মৃতি ফেরানোর আয়োজন—ফিরে দেখা বিশ্বকাপ।

অভিশপ্ত সেই ‘মারাকানাজো’র ট্র্যাজেডি তখনো তাড়া করে বেড়াচ্ছে ব্রাজিলকে। ঘরের মাঠে উরুগুয়ের কাছে বিশ্বকাপ হারানো সেই ক্ষত শুকাতে লেগে গেল দীর্ঘ আটটি বছর। অবশেষে ১৯৫৮ সালে সুইডেনের মাটিতে লাতিন সাম্বার ছন্দে বুঁদ হলো বিশ্ব। বিশ্ব ফুটবল দেখল এক নতুন সূর্যোদয়। আটলান্টিকের এপার থেকে গিয়ে ইউরোপের মাটিতে প্রথম কাপ জেতার গৌরব অর্জন করল ব্রাজিল। এখন পর্যন্ত ব্রাজিলই একমাত্র দল, যারা নিজেদের মহাদেশের বাইরে গিয়ে দুটি বিশ্বকাপ জিতেছে।

নতুন নিয়ম, নতুন চেহারা

এই বিশ্বকাপে আবার বদলে গেল টুর্নামেন্টের ফরম্যাট। চারটি গ্রুপ, প্রতিটিতে চার দল। প্রতি গ্রুপ থেকে সেরা দুই দল উঠবে কোয়ার্টার ফাইনালে। এরপর সরাসরি নকআউট।

আরেকটা নতুন ব্যাপার ঘটল এই বিশ্বকাপে—প্রথমবারের মতো গোলকিপারদের হাতে গ্লাভস। তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের কিংবদন্তি গোলকিপার লেভ ইয়াশিনের হাত ধরেই এই ট্রেন্ড জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। কালো জার্সি, কালো প্যান্ট আর কালো মোজা পরে মাঠে নামতেন বলে তাঁকে ডাকা হতো ‘ব্ল্যাক স্পাইডার’।

এই আসরেই ইতিহাসে প্রথমবার বিশ্বকাপ দেখল গোলশূন্য ম্যাচ। গোটেনবার্গে গ্রুপ পর্বের ম্যাচে মুখোমুখি ব্রাজিল-ইংল্যান্ড ম্যাচে, কোনো গোল করতে পারেনি। বিশ্বকাপের ১১৫ ম্যাচ পর গোলহীন ম্যাচ!

জাস্ট ফন্টেইনের ‘রাইফেল’ জয়

এক টুর্নামেন্টে ১৩ গোল! এক বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ গোলের এক অবিশ্বাস্য রেকর্ড (যা আজও অক্ষত) গড়লেন ফরাসি স্ট্রাইকার জাস্ট ফন্টেইন। অথচ ফন্টেইন কিন্তু মূল স্কোয়াডে সুযোগই পেয়েছিলেন বিকল্প হিসেবে। ফ্রান্সের মূল সেন্ট্রাল ফরোয়ার্ড রেমন্ড ব্লেয়ারের মারাত্মক গোড়ালির চোটের কারণে কপাল খোলে তাঁর। ফ্রান্সের খেলা ছয়টি ম্যাচের প্রতিটিতেই গোল করেছিলেন ফন্টেইন, জার্মানির বিপক্ষেই ৪ গোল। টুর্নামেন্ট শেষে তাঁর এই অনন্য কীর্তির জন্য সুইডেনের একটি পত্রিকা তাঁকে একটি রাইফেল উপহার দিয়েছিল!

এক বিশ্বকাপে সবচেয়ে বেশি গোলের রেকর্ডটা এখনো জাস্ট ফন্টেইনের
এএফপি

চার ব্রিটিশ দল ও ওয়েলসের লটারি-ভাগ্য

সুইডেন বিশ্বকাপই একমাত্র আসর, যেখানে যুক্তরাজ্যের চারটি দেশ—ইংল্যান্ড, স্কটল্যান্ড, ওয়েলস ও উত্তর আয়ারল্যান্ড একসঙ্গে খেলার যোগ্যতা অর্জন করেছিল। এর মধ্যে অন্য দেশগুলো সরাসরি বাছাইপর্বে জিতেই এসেছিল, কিন্তু ওয়েলসের ভাগ্য খুলল এক অদ্ভুত নাটকের পর।

এশিয়া ও আফ্রিকা অঞ্চলের বাছাইপর্বে রাজনৈতিক কারণে তুরস্ক, ইন্দোনেশিয়া এবং সুদান—কেউই ইসরায়েলের মুখোমুখি হতে রাজি হয়নি। ফলে কোনো ম্যাচ না খেলেই ইসরায়েল মূল পর্বের কাছাকাছি চলে যায়। কিন্তু ফিফার নিয়মে স্পষ্ট বলা ছিল, আয়োজক দেশ ও ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন ছাড়া কোনো দল অন্তত একটি ম্যাচ না খেলে মূল পর্বে যেতে পারবে না। বিপাকে পড়ে ফিফা সিদ্ধান্ত নিল, ইউরোপের দলগুলোর মধ্য থেকে লটারির মাধ্যমে একটি দলকে বেছে নেওয়া হবে, যারা ইসরায়েলের মুখোমুখি হবে। ভাগ্যের দেবী হাসলেন ওয়েলসের দিকে চেয়ে। তেল আবিব ও কার্ডিফ—দুই লেগেই ইসরায়েলকে হারিয়ে বিশ্বকাপে চলে গেল ওয়েলস।

আরও পড়ুন

মগজের জায়গায় বোতল

ম্যানুয়েল ফ্রান্সিসকো দস সান্তোস। কেউ চিনবেন, কেউ চিনবেন না। ‘গারিঞ্চা’ বললে সবার মুখে হাসি ফুটবে—‘ও আচ্ছা, সেই কিংবদন্তির কথা বলছেন!’ বিস্ময়কর ব্যাপার হচ্ছে, ইতিহাসের অন্যতম সেরা এই ফুটবলার কিন্তু সুইডেনগামী বিশ্বকাপ দল থেকে প্রায় বাদই পড়ে যাচ্ছিলেন। ব্রাজিল সেবার দলে নিয়েছিল এক মনোবিদ, জোয়াও কার্ভালহাইস। গারিঞ্চার সঙ্গে কথা বলে তাঁর রিপোর্ট—বোতাফোগোর এই স্ট্রাইকারের বুদ্ধিমত্তার মাত্রা এতটাই কম যে তাঁকে দলে রাখা ঠিক হবে না। কোচ ভিসেন্তে ফেওলাকে বললেন, ‘ছেলেটার মাথায় মগজের জায়গায় বোতল ভরা।’

ফ্রান্সের গোলমুখে ফরাসি গোলরক্ষকের সঙ্গে সংঘর্ষ গারিঞ্চার
এএফপি

খবর পেলেন জাতীয় দলে গারিঞ্চার দুই সতীর্থ নিল্টন সান্তোস ও দিদি—তাঁরাও বোতাফোগোর, দলে নেতৃস্থানীয়। মনোবিদের কক্ষে গিয়ে বললেন, ‘ডাক্তার সাহেব, গারিঞ্চা ফুটবল কীভাবে খেলতে হয়, সেটা দুনিয়াতে সবচেয়ে ভালো জানে।’

এক পা অন্যটার চেয়ে ৬ সেন্টিমিটার ছোট ছিল গারিঞ্চার, দুই পা ভেতর দিকে বাঁকানো। জাতীয় দলের হয়ে ৬০ ম্যাচে জিতেছেন ৫২টি, ড্র করেছেন সাতটি, হেরেছেন মাত্র একটিতে।

রোববারের ক্রুসেডার্স

টুর্নামেন্ট শুরুর ঠিক আগে উত্তর আয়ারল্যান্ড ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন ফিফার কাছে এক অদ্ভুত অনুরোধ করে বসল—তারা রোববারে কোনো ম্যাচ খেলবে না। কারণ, দলের ছয়জন ফুটবলার ছিলেন কট্টর খ্রিষ্টান। বাইবেলের নিয়ম মেনে রোববার বিশ্রাম নেওয়াটাকে তাঁরা ভীষণ গুরুত্ব দিতেন। গ্রুপ পর্বের তিনটি ম্যাচের দুটিই (জার্মানি ও চেকোস্লোভাকিয়ার বিপক্ষে) ছিল রোববারে। ফিফা এই অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করলে ওই ছয়জন দেশেই থেকে যান। উত্তর আয়ারল্যান্ড মাত্র ১৬ জনের দল নিয়ে সুইডেন রওনা হয়। হয়তো ঈশ্বরের বিশেষ কৃপা ছিল বলেই রোববারের দুটি ম্যাচের একটিতেও হারেনি তারা।

আরও পড়ুন

কিশোর রাজার অভিষেক

১৯ জুন ১৯৫৮। ওয়েলসের জালে বল পাঠালেন এক কিশোর। বয়স তখন ১৭ বছর ২৩৯ দিন। বিশ্বকাপের ইতিহাসে সর্বকনিষ্ঠ গোলদাতার রেকর্ড সেদিন থেকে ওই ছেলের, এখনো। তারপর সেই ছেলে ব্রাজিলের হয়ে বিশ্ব জয় করলেন। সুইডেনে প্রথমবার। চার বছর পর দ্বিতীয়বার চিলিতে গিয়ে। ১৯৭০ সালে মেক্সিকোতেও। সেই কিশোর একদিন ফুটবলের রাজা হলেন। তিনটি বিশ্বকাপ জেতার অবিনশ্বর রেকর্ড এখনো তাঁর দখলে। এডসন অরান্তেস দো নাসিমেন্তো নামের সেই ছেলে পৃথিবীর ইতিহাসে এখন পরিচিত পেলে নামে। ও রেই, তিনিই রাজা এখনো!

হলুদের লড়াই ও নীল জার্সির জন্ম

সেমিফাইনালের লড়াই শেষ হতেই আয়োজকদের কপালে চিন্তার ভাঁজ। দুই ফাইনালিস্ট—ব্রাজিল ও সুইডেন, উভয়েরই চেনা রূপ হলুদ জার্সিতে। ফাইনালে কারা হলুদ পরে নামবে, তা নির্ধারণে লটারি হলো। ভাগ্যদেবী হাসলেন স্বাগতিক সুইডেনের মুখে। ব্রাজিলকে খেলতে হবে বিকল্প জার্সিতে।

ফাইনালে সুইডেনের বিপক্ষে গোলের পর ভাভার (বাঁয়ে) ব্রাজিল কিংবদন্তি পেলে
এএফপি

কিন্তু বিপত্তি বাধল অন্য জায়গায়। ব্রাজিল দলের অফিশিয়ালরা আবিষ্কার করলেন, তাঁদের কাছে কোনো বিকল্প জার্সিই নেই! তখন তো আর আজকের মতো বড় বড় স্পনসর প্রতিষ্ঠান ছিল না। তড়িঘড়ি করে কিটম্যানকে ডেকে হাতে টাকা দিয়ে পাঠানো হলো নতুন জার্সি কিনতে। তবে শর্ত একটাই—সাদা রঙের জার্সি কোনোভাবেই কেনা যাবে না। ১৯৫০ সালের সেই অভিশপ্ত ‘মারাকানাজো’র বিকেলে সাদার ওপর যে দাগ লেগেছিল, তা আর গায়ে জড়াতে চায়নি সেলেসাওরা।

স্টকহোমের রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে শেষমেশ একটা কাপড়ের দোকানে ২০টি নীল পোলো শার্ট খুঁজে পেলেন সেই কিট-ম্যান। এরপর টানা দুদিন দিনরাত এক করে ‘চার হাতে’ কাজ চলল। শার্টগুলোর পেছনে সেলাই করা হলো নম্বর, আর বুকে বসানো হলো ব্রাজিলিয়ান কনফেডারেশনের লোগো।

ওদিকে নিজেদের হলুদ জার্সি ধরে রাখতে পেরে সুইডিশ অফিশিয়ালরা তো আহ্লাদে আটখানা। এক ম্যানেজার সংবাদমাধ্যমকে বলেই বসলেন, ‘এটা আমাদের জন্য একটা বাড়তি মানসিক সুবিধা দেবে। নিজেদের চেনা রঙে খেলার একটা আলাদা জোর আছে। তা ছাড়া প্রতিপক্ষের খেলোয়াড়েরা ভুল করে আমাদের খেলোয়াড়দের বল পাস দিয়ে দেওয়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না!’ তবে ব্রাজিলের কোচ ভিসেন্তে ফিওলা এসব মনস্তাত্ত্বিক কথায় কান দেননি। শান্ত গলায় জবাব দিয়েছিলেন, ‘আমার ছেলেরা ফুটবলটা ভালোই বোঝে, ওরা এই ভুল করবে না।’ ৫-২ গোলে ম্যাচ জিতে কোচের কথার সত্যতা প্রমাণ করেছিলেন পেলে-গারিঞ্চারা।

আরও পড়ুন

উপহারের বন্যা

সোভিয়েত ইউনিয়নের বিপক্ষে দুর্দান্ত জয়ের পর সুইডিশ কোম্পানি ‘মোনার্ক’-এর পক্ষ থেকে ব্রাজিলের সব খেলোয়াড়কে একটি করে সাইকেল উপহার দেওয়া হয়েছিল। আর চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পর রিও ডি জেনিরোর একটি টেলিভিশন কোম্পানি দলের ২৩ জন ফুটবলার এবং কোচ ফিওলাকে একটি করে টেলিভিশন উপহার দেয়। এখানেই শেষ নয়, শিরোপা জয়ের মাত্র ২৪ ঘণ্টার মধ্যে রিওর গ্যাজেটা স্পোর্টিভা পত্রিকা তাদের পাঠকদের কাছ থেকে চ্যাম্পিয়নদের পুরস্কৃত করার জন্য পাঁচ লাখ ক্রুজেইরো সংগ্রহ করে। বীরেরা যখন দেশে ফিরলেন, ততক্ষণে সেই তহবিলের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১০ লাখে! ফুটবলারদের এই ঐতিহাসিক অর্জনকে আজীবন সম্মান জানাতে ব্রাজিলের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জুসেলিনো কুবিটশেক ডি অলিভেইরা একটি অধ্যাদেশ জারি করেন, যার মাধ্যমে খেলোয়াড় ও তাঁদের পরিবারের জন্য আজীবন পেনশন মঞ্জুর করা হয়।

আরও পড়ুন