কারা হবেন এনরিকের মূল অস্ত্র

গোলরক্ষক উনাই সিমন হবেন পোস্টের নিচে এনরিকের প্রথম পছন্দ। তবে গোলরক্ষকের পজিশনে দুর্দান্ত সব বিকল্প আছে স্পেন কোচের হাতে। রবার্ত সানচেজ ও দাভিদ রায়ারও প্রয়োজনে নিজেদের ভূমিকা রাখার সামর্থ্য আছে।

রক্ষণেও দারুণ শক্তিশালী স্পেন। সিজার আজপিলিকেতা, পাউ তোরেস, এরিক গার্সিয়া ও জর্দি আলবারা যেকোনো পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে দারুণ কার্যকর। মিডফিল্ডে সার্জিও বুসকেটসের সঙ্গে একটু সামনে থাকবেন পেদ্রি ও কোকে।

১৯ বছর বয়সী তরুণ পেদ্রিকে তো এবারের বিশ্বকাপে অন্যতম চমক ভাবা হচ্ছে। চোখ থাকবে রদ্রির দিকেও। দারুণ পাসিং–ক্ষমতাসম্পন্ন এই ম্যানচেস্টার সিটি তারকাকে এনরিকে কীভাবে কাজে লাগান, সেটিও স্পেনের খেলার গতিপথ তৈরিতে ভূমিকা রাখতে পারে।

আর ফরোয়ার্ড লাইনে এনরিকের আস্থা থাকবে ফেরান তোরেস, পাবলো সারাবিয়া ও মোরাতার ওপর। পজিশন বদলেও তাঁদের একাধিক ভূমিকায় দেখা যেতে পারে। এ ছাড়া একাদশে জায়গা না পেলেও বেঞ্চ থেকে বিকল্প হিসেবে সুযোগের অপেক্ষায় থাকবেন দানি অলমো, আনসু ফাতি, গাভি কিংবা নিকো গঞ্জালেসের মতো তারকারা।

বলা যায়, ঈর্ষণীয় সব বিকল্প আছে এনরিকের হাতে, যা একাদশ সাজাতে মধুর সমস্যায় ফেলতে পারে এই কোচকে। সব মিলিয়ে স্পেন দলে তারুণ্যের সঙ্গে অভিজ্ঞতার মিশেলটাও বেশ দারুণ।

বৈচিত্র্যময় আক্রমণভাগ

বলের সঙ্গে অদ্ভুত এক প্রেম নিয়ে মাঠে নামে স্পেন। মাঠে যেসব দল বল পায়ে রেখে খেলা তৈরি করে স্পেন তাঁর অন্যতম। এনরিকের দল মূলত স্প্যানিশ ফুটবলের চিরায়ত ঐতিহ্যকেই এগিয়ে নিচ্ছে, যারা নিজেদের পায়ে বল রেখে খেলতে পছন্দ করে। আক্রমণে ডুয়েল জিতে প্রতিপক্ষের ডি-বক্সে ঢুকে পড়তেও দারুণ কার্যকর স্প্যানিশ ফরোয়ার্ডরা।

তবে স্পেন যে স্টাইল ধরে রেখে খেলা তৈরি করে, তাতে যে ধরনের গোল স্কোরিং দক্ষতার প্রয়োজন, তা তারা এখনো দেখাতে পারেনি। কাতারে এ সমস্যার সমাধান বের না হলে বিপদে পড়তে হতে পারে এনরিকেকে।

কোচ হিসেবে এনরিকে তাঁর দলকে মূলত পজেশন-ভিত্তিক ফুটবল খেলাতেই পছন্দ করেন। গোলরক্ষক থেকেই তিনি মূলত খেলাটা শুরু করেন, যেখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকে সদা চঞ্চল মিডফিল্ডেরও। যাঁরা পাসিংয়ের ঝড় তুলে প্রতিপক্ষকে কাঁদিয়ে ছাড়তে পারেন।

আক্রমণ তৈরির সময় এনরিকের কৌশলের কারণে স্প্যানিশ মিডফিল্ডাররা সেন্টার-ব্যাকের কাছাকাছি জায়গায় থাকেন, যা প্রতিপক্ষ খেলোয়াড়দেরও নিচের দিকে নেমে আসতে অনেকটা বাধ্য করে।

কোকে এর অন্যতম বড় উদাহরণ। এই আতলেতিকো মাদ্রিদ তারকা অনেক বেশি ওয়াইডে (উইংয়ে) খেলতে পারেন। সঙ্গে নিচে নেমে এসে সেন্টার ব্যাকের সঙ্গে যোগ দিয়ে ব্যাক-থ্রি তৈরি করতে পারেন কিংবা পিভটের (ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার) ভূমিকায় থাকা খেলোয়াড়ের সঙ্গে নিজের জায়গা বদল করে নিতে পারেন। বিল্ডআপের সময় নিচের দিকে স্পেন নিজেদের মধ্যে প্রচুর ওয়ান-টাচ পাস খেলে থাকে। এ সময় ব্যাক লাইনের খেলোয়াড়দের অংশগ্রহণও থাকে চোখে পড়ার মতোই।

স্পেনের আক্রমণে ইনভার্টেড উইঙ্গাররাও (শক্তিশালী পা অনুযায়ী কোনো একটি নির্দিষ্ট পাশে খেলেন। যেমন ডান পায়ের খেলোয়াড়েরা খেলেন বাঁ পাশে। আর বাঁ পায়ের খেলোয়াড় খেলেন ডান পাশে।) দারুণ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। কৌশলগত জায়গা থেকে দারুণ ক্ষমতাসম্পন্ন। তাঁরা মাঝে এসেও খেলতে পারেন এবং মাঝমাঠের খেলায় নিজেদের প্রভাব রাখতে পারেন।

উইঙ্গাররা যখন বল দখলে নিতে নিচে নেমে আসেন, তখন মোরাতার ভূমিকাটা বেশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। বল ছাড়াও তিনি দারুণ গতিময় ফুটবলার। পাশাপাশি নিজের তাৎক্ষণিক বিচক্ষণতা কাজে লাগিয়ে তিনি সতীর্থদের জন্যও জায়গা বের করতে পারেন। তাই বিল্ডআপেও মোরাতাকে প্রয়োজন হবে লুইস এনরিকের। মার্কারকে আটকে রাখার সঙ্গে দুর্দান্ত রক্ষণচেরা পাসগুলোর জন্যও তাঁর দিকে তাকিয়ে থাকবে দল। নিচে নেমে এসে সেন্টার ব্যাক থেকে পাস নিয়ে সামনের দিকে বাড়ানোর কাজও করতে হতে পারে তাঁকে।

আর বল যখন মিডল থার্ডে পৌঁছাবে, তখন স্পেন দ্রুত পাস খেলার মাধ্যমে দ্রুত ফাইনাল থার্ডে পৌঁছানোর চেষ্টা করে। স্পেনের বল সামনে বাড়ানোর এবং গোলের সুযোগ তৈরির আরেকটি উপায় হচ্ছে ডিফেন্সিভ মিডফল্ডার কিছুটা উইংয়ের দিকে সরে গিয়ে ফুলব্যাককে সামনে এগিয়ে আনবেন। এরপর তাঁকে বল বাড়িয়ে দেওয়া হবে। এরপর সেই খেলোয়াড় ইনভার্টেড উইঙ্গারকে মাঝমাঠে খুঁজে নেবে। লুইস এনরিকে এ প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়েই তাঁর বেশির ভাগ গোলের সুযোগ তৈরি করে নেন এবং গোল আদায়ও করে নেন।

সব মিলিয়ে স্পেনের আক্রমণ শানানোর উপায় হতে পারে ২-৩-৫ ফরমেশনে, যেখানে আগ্রাসী এবং পজেশন–নির্ভর দল হিসেবে ফুলব্যাক সামনের দিকে উঠে আসবেন এবং উইঙ্গাররা ইনভার্টেড দায়িত্ব পালন করবেন।

রক্ষণে হাতিয়ার কাউন্টার প্রেসিং

রক্ষণে প্রেসিং ও কাউন্টার প্রেসিংকেই কৌশল হিসেবে ব্যবহার করবে স্পেন, যেখানে তাদের লক্ষ্য থাকবে দ্রুত প্রতিপক্ষের পা থেকে বল পুনরুদ্ধার করে তাদের আক্রমণগুলো নষ্ট করে দেওয়া। প্রেসের ক্ষেত্রে স্পেন দলের প্রথম কাজই হবে বল হোল্ডারকে চাপ দিয়ে অস্বস্তিতে ফেলা এবং মাঝমাঠ দিয়ে বল বাড়াতে বাধ্য করা, যেখানে বলকে আটকানোর জন্য রদ্রি, কোকে কিংবা পেদ্রি আগে থেকেই প্রস্তুত থাকবেন, যাঁরা ট্যাকলিং এবং প্রেসিং সামলানোর ক্ষেত্রেও দারুণ কার্যকর।

পাসিং আটকে দেওয়ার পাশাপাশি প্রতিপক্ষের বল ক্যারি করা খেলোয়াড়টির জন্য জায়গা সংকুচিত করে দেওয়ার কাজটিও তাঁরা ভালো করতে পারেন। প্রায় সব ম্যাচেই স্পেন গতিময় ফুটবল খেলতে চাইবে, যেখানে হাই-প্রেসিংয়ে নিচ থেকে খেলা তৈরি করে আক্রমণে যাওয়ার চেষ্টা করবে। বল হারালে দ্রুত কাউন্টার প্রেস করে বল কেড়ে নেওয়ার চেষ্টাও করবে স্পেনের রক্ষণ।

অ্যাটাকিং থার্ডে স্পেন বরাবরই বিপজ্জনক। সেখানে বল হারালে অবশ্য পাল্টা চাপে পড়ার সম্ভাবনা আছে। তবে স্প্যানিশ দলে এমন খেলোয়াড় আছেন, যাঁরা দ্রুত বল পুনরুদ্ধার করতে পারেন এবং নিজেদের রক্ষণাঞ্চলকে সুরক্ষিত রাখতে পারেন। স্পেন যে সুবিধা সবচেয়ে বেশি পাবে, তা হলো দারুণ কিছু প্রাণবন্ত ও তরুণ খেলোয়াড় তাদের দলে আছে, যাঁরা রক্ষণচেরা পাস দিতে এবং বল পায়ে রাখতে পারেন। শারীরিক সক্ষমতাতেও তাঁরা দারুণ। পাশাপাশি মার্কারদের বিভ্রান্ত করে দ্রুত আক্রমণের পথ পাল্টে দেওয়ার সামর্থ্যও তাঁদের আছে।

শেষ কথা

রক্ষণ ও মিডফিল্ডে স্পেন কারিকুরিতে দারুণ। তবে এটাই আবার তাদের মাথাব্যথার কারণ হতে পারে। দল নিয়ে স্প্যানিশ সমর্থকদের মূল দুশ্চিন্তার জায়গা গোল রূপান্তরে কার্যকারিতার অভাব। অ্যাটাকিং থার্ডে অতিরিক্ত পাস খেলতে গিয়ে বল হারানোর আশঙ্কাও রয়েছে। গত এক বছরে স্পেন যত ম্যাচ খেলেছে, শুধু একটিতেই তারা দুইয়ের বেশি গোলের দেখা পেয়েছে।

যেসব ম্যাচ তারা জিতেছে, ফল দেখলে মনে হয় খুবই হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হয়েছে। অথচ প্রায় সব ম্যাচেই বল দখলে প্রতিপক্ষের চেয়ে অনেক বেশি এগিয়ে ছিল এনরিকের দল। তবে স্কোরিংয়ে এমন দাপুটে ফুটবলের প্রতিফলন নেই। বিশ্বকাপে বড় ম্যাচে স্কোরিং সমস্যার সমাধান না হলে ভুগতে হতে পারে স্পেনকে।