চেলসির দায়িত্ব নিয়েই ইতিহাসের অংশ, কে এই ‘উদ্ভাবক’ নতুন কোচ

চেলসির নতুন লিয়াম রোজনিয়রইনস্টাগ্রাম

এনজো মারেসকাকে সরিয়ে লিয়াম রোজনিয়রকে নতুন কোচ হিসেবে নিয়োগ দিয়েছে চেলসি। পান থেকে চুন খসলেই কোচ বদলানোটা বলা যায় অভ্যাস চেলসির। তবে ‘উদ্ভাবক’ হিসেবে পরিচিত চেলসির নতুন কোচ রোজনিয়রকে নিয়ে এরই মধ্যে তৈরি হয়েছে বেশ আগ্রহ।

চেলসির সঙ্গে সাড়ে পাঁচ বছরের চুক্তি করেই কয়েকটি মাইলফলকের জন্ম দিয়েছেন রোজনিয়র। রুদ খুলিতের পর তিনি এখন চেলসির দায়িত্ব নেওয়া দ্বিতীয় কৃষ্ণাঙ্গ কোচ। পাশাপাশি ৪১ বছর বয়সী এরোজনিয়র প্রিমিয়ার লিগের শীর্ষ ছয় ক্লাবের কোনো একটিতে কাজ করতে যাওয়া প্রথম ব্রিটিশ কৃষ্ণাঙ্গ কোচও। ফলে তাঁকে নিয়ে আগ্রহের পারদটা স্বাভাবিকভাবেই এখন ঊর্ধ্বমুখী। যদিও রোজনিয়রের শুরুটা হয়েছে সতর্কবার্তা দিয়ে। দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রথম ম্যাচে স্ট্যান্ডে বসে চেলসিকে ২–১ গোলে ফুলহামের কাছে হারতে দেখেছেন তিনি। ফলে নিশ্চিতভাবে অনেক কিছু বদলাতে হবে তাঁকে।

রোজনিয়রের চেলসিতে যোগ দেওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে চেলসির প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ ফুটবলার পল ক্যানোভিল বলেছেন, ‘লিয়াম রোজনিয়র একজন মানসম্মত কোচ। খেলাটাকে তিনি ভেতর থেকে জানেন, আর সেটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। আমি তাঁর ও তাঁর স্টাফদের জন্য শুভকামনা জানাই। তবে চেলসির প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ খেলোয়াড় হিসেবে এটা অস্বীকার করা ঠিক হবে না যে আমি আবেগ অনুভব করছি।’

১৯৮২ সালের এপ্রিলে সেলহার্স্ট পার্কে ক্রিস্টাল প্যালেসের বিপক্ষে বদলি হিসেবে নেমে চেলসির মূল দলে অভিষেক হয়েছিল ক্যানোভিলের। সেটা ছিল চেলসির ফুটবল ইতিহাসে ঐতিহাসিক এক মুহূর্ত। গত মঙ্গলবার মারেসকার বিদায়ের পর রোজনিয়রকে নতুন কোচ হিসেবে নিয়োগ দেয় চেলসি। এর আগে তিনি ফরাসি ক্লাব স্ত্রাসবুর্গের কোচ ছিলেন। স্ত্রাসবুর্গ ও চেলসি দুটি ক্লাবই টড বোয়েলি ও ক্লিয়ারলেক ক্যাপিটালের মালিকানাধীন ব্লুকো মাল্টি–ক্লাব গ্রুপের অংশ।

আরও পড়ুন

প্রিমিয়ার লিগ শুরু হওয়ার ৩৪ বছরে (অস্থায়ী কোচ বাদে) মাত্র ১২ জন কৃষ্ণাঙ্গ কোচ লিগে দায়িত্ব পালন করেছেন। তাতে সর্বশেষ সংযোজন রোজনিয়র। ক্যানোভিল আরও বলেন, ‘লিয়ামের ব্যাপারে যেটা আমাকে সবচেয়ে বেশি ছুঁয়ে যায়, তা হলো সে এখানেই বড় হয়েছে, এখানকার আশপাশেই খেলেছে। এ এলাকার মানুষ, এই সম্প্রদায়কে সে চেনে। যখন খেলোয়াড়েরা তাদের মতোই কাউকে কোচ হিসেবে পায়, সেটা তাদের খুব শক্তিশালী একটা বার্তা দেয়। তারা বুঝতে পারে, পথটা খোলা আছে।’

১৯৯৬ সালে ডাচ ফুটবল কিংবদন্তি রুদ খুলিত চেলসির কোচ হিসেবে দায়িত্ব নিয়ে প্রিমিয়ার লিগের ইতিহাসে প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ প্রধান কোচ হন। এর ১২ বছর পর, ২০০৮ সালে ব্ল্যাকবার্ন রোভার্সের দায়িত্ব নিয়ে শীর্ষ লিগে প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ ইংলিশ কোচ হিসেবে ইতিহাস গড়েন পল ইনস। বর্তমানে প্রিমিয়ার লিগে অশ্বেতাঙ্গ কোচ হিসেবে আছেন শুধু ওয়েস্ট হামের নুনো এস্পিরিতো সান্তো।

লিয়াম রোজনিয়র এসেই ইতিহাসের অংশ হয়েছেন
এএফপি

ইংলিশ ফুটবলে কৃষ্ণাঙ্গ কোচের সংখ্যা যেমন কম, তেমনি বোর্ডরুম ও শীর্ষ ব্যবস্থাপনায়ও প্রতিনিধিত্বের ঘাটতি স্পষ্ট। ব্ল্যাক ফুটবলার্স পার্টনারশিপের ২০২৩ সালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রিমিয়ার লিগের ৪৩ শতাংশ খেলোয়াড়ই কৃষ্ণাঙ্গ ব্যাকগ্রাউন্ড থেকে আসা। কিক ইট আউটের বিশ্লেষণে দেখা গেছে, প্রিমিয়ার লিগের ২০টি ক্লাবের মধ্যে ১৭টির বোর্ড ও শীর্ষ ব্যবস্থাপনা পর্যায়ে জাতিগতভাবে বৈচিত্র্যময় প্রতিনিধিত্ব মাত্র ৩ দশমিক ২ শতাংশ।

সিনিয়র কোচিংয়ের পর্যায়ে (১১টি ক্লাবের তথ্য অনুযায়ী) এই হার মাত্র ২ শতাংশ। আর সেই ১১টি ক্লাবে সিনিয়র কোচসহ সব ধরনের কোচিংয়ের ভূমিকায় এই হার ৫ শতাংশ।
কিক ইট আউটের প্রধান নির্বাহী স্যামুয়েল ওকাফর বলেন, ‘চেলসির কোচ হিসেবে তাঁর নিয়োগ নিঃসন্দেহে প্রতিবন্ধকতার একটি দেয়াল ভেঙেছে। আমরা এ ধরনের উদাহরণ আরও দেখতে চাই। আমরা জানি, কৃষ্ণাঙ্গ ও কম প্রতিনিধিত্ব পাওয়া কমিউনিটিতে অসংখ্য প্রতিভা রয়েছে। তারা নিজেদের যোগ্যতা প্রমাণের সুযোগ চায়। এই বাধাগুলো ভাঙতে আমাদের কাজ চালিয়ে যেতে হবে।’

আরও পড়ুন

রোজনিয়র বর্তমানে প্রিমিয়ার লিগে চতুর্থ স্থায়ী ইংলিশ কোচ। তাঁর সঙ্গে আছেন শন ডাইচ, এডি হাও ও স্কট পার্কার। জাতীয় প্রতিনিধিত্বের দিক থেকে ইউরোপের অন্য ‘বিগ ফাইভ’ লিগগুলোর তুলনায় এখানেও প্রিমিয়ার লিগ পিছিয়ে।

ইতালির শীর্ষ লিগে ২০ কোচের মধ্যে ১৬ জনই ইতালিয়ান। স্পেনের শীর্ষ লিগে ২০ কোচের মধ্যে ১১ জন স্প্যানিশ, জার্মানির শীর্ষ লিগে ১৮ জনের মধ্যে ১২ জন জার্মান এবং ফ্রান্সের শীর্ষ লিগে ১৮ জনের মধ্যে ১০ জন ফরাসি কোচ দায়িত্ব পালন করছেন।

কৃষ্ণাঙ্গ হওয়ার কারণে আলোচনায় এলেও রোজনিয়র মূলত নিয়োগ পেয়েছেন নিজের মেধা ও প্রতিভার জোরে। চেলসির বর্তমান অন্তর্বর্তী কোচ ক্যালাম ম্যাকফারলেন বলেছেন, ‘তরুণ ইংলিশ একাডেমি কোচদের জন্য এটি সত্যিই অনুপ্রেরণাদায়ক ঘটনা। এমন প্রোফাইলের একজন মানুষ এই দায়িত্ব পেয়েছেন। আমরা আশা করি, তিনি খুব ভালো করবেন।’

লিয়ামের বাবা লেরয় রোজনিয়র ফুলহাম, ওয়েস্ট হাম ও কুইন্স পার্ক রেঞ্জার্সের মতো ক্লাবের হয়ে খেলেছেন। ২০১৯ সালে ফুটবলে বৈষম্য নিরসন ও সমাজে সমতা প্রতিষ্ঠায় অবদানের জন্য তাঁকে নিউ ইয়ার অনার্সে এমবিই দেওয়া হয়।

লিয়াম রোজনিয়র খেলোয়াড়ি জীবনে শেষ দিকে বাবার পথ অনুসরণ করেন। বাবার মতোই নানা ধরনের বৈষম্যের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে ওঠেন তিনি। দ্য গার্ডিয়ানেও কলাম লেখা শুরু করেন। ২০১৭ সালে তিনি ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যমটিতে কৃষ্ণাঙ্গ কোচদের কম প্রতিনিধিত্ব নিয়ে লেখেন। তিনি দাবি করেছিলেন, বর্ণ কোনোভাবেই দক্ষতাকে প্রভাবিত করে না, সুযোগ দেওয়া উচিত মেধার ভিত্তিতে। এরপর বিভিন্ন সময় বর্ণবাদসহ বৈষম্যবিরোধী নানা ইস্যুতে জোরালো ভূমিকা রাখতে দেখা যায় তাঁকে।

আরও পড়ুন

কোচ হিসেবে রোজনিয়র প্রথমে খ্যাতি অর্জন করেছেন হাল সিটিতে, পরে স্ত্রাসবুর্গে। ডার্বি কাউন্টিতে একসঙ্গে কাজ করা ওয়েইন রুনি চলতি সপ্তাহে রোজনিয়রকে নিয়ে বলেছেন, ‘আমি যত কোচের সঙ্গে কাজ করেছি, তার মধ্যে তিনি সবচেয়ে ভালো।’

রোজনিয়রকে নিয়ে চেলসির প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ অধিনায়ক পল এলিয়ট বলেছেন, ‘লিয়াম (রোজনিয়র) অসাধারণ খেলোয়াড় ছিলেন, অনেক বুদ্ধিমান ও স্পষ্টভাষী। প্রধান কোচ বা টেকনিক্যাল ডিরেক্টরের ভূমিকা এখন পর্যন্ত যা করেছেন, তাতে বোঝা যায় তিনি খেলাটিকে গভীরভাবে বোঝেন। আমি জানতাম, তিনি সফল হবেন।’

তিনি আরও যোগ করেন, ‘ফুটবল ব্যবস্থাপনায় তার (রোজনিয়র) প্রতিশ্রুতি ছিল অনবদ্য। কথা বলার ধরন এতটাই শিক্ষণীয়, শোনার পরই মনে হয় অনেক কিছু শিখছি। এটি বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য শক্তিশালী ও ইতিবাচক বার্তা দেয়। লিয়ামের মতো মানুষেরা শীর্ষ পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে এবং ফুটবল ব্যবস্থাপনায় নেতৃত্ব দিতে পারে। আর ভুলে যাবেন না, তিনি মেধার ভিত্তিতে এখানে আছেন, তাঁর প্রতিভা ও যোগ্যতার কারণে।’

রোজনিয়র কি পারবেন চেলসিকে সাফল্য এনে দিতে
এক্স/চেলসি

স্ত্রাসবুর্গে রোজনিয়র নিজেকে ইউরোপের সবচেয়ে সম্ভাবনাময় তরুণ কোচদের একজন হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। কাজও করেন তরুণদের নিয়ে। ফরাসি এই ক্লাবটিতে রোজনিয়র ইউরোপের শীর্ষ পাঁচ লিগের মধ্যে সবচেয়ে কম বয়সী দল পরিচালনা করেছেন, খেলোয়াড়দের গড় বয়স ছিল ২১.৪৭ বছর।

চেলসির এ সহযোগী ক্লাবে ১৮ মাসের কোচিংয়ে তিনি প্রতিভার ঝলকও দেখান। রোজনিয়রকে চেলসি কর্তৃপক্ষ ‘ইনোভেটর’ বা ‘উদ্ভাবক’ হিসেবে পরিচিত করিয়ে দিয়েছে। এখন স্টামফোর্ড ব্রিজের ক্লাবটির ডাগআউটে রোজনিয়রের সেই উদ্ভাবনী ক্ষমতা দেখারই অপেক্ষা।