এমবাপ্পের চোখে হার প্রাপ্য ছিল রিয়ালের, বেনফিকার চোখে, ট্রাবিনের জায়গা ল্যুভরে

যোগ করা সময়ে হেডে গোল করার পর বেনফিকা গোলকিপার আনাতোলি ট্রাবিনের উদ্‌যাপনএএফপি

লিসবনে শেষ বাঁশি বাজার পর দুই দলের প্রতিক্রিয়া অনেকটাই বীজগণিতের ‘কমন’ নেওয়ার মতো। দুই দল থেকেই ভেসে এসেছে একই কথা, ‘এটা প্রাপ্য ছিল।’

তবে বক্তব্য প্রায় একই হলেও কথার অর্থ ভিন্ন।

বেনফিকার কাছে ৪-২ গোলে হারের পর রিয়াল মাদ্রিদ তারকা কিলিয়ান এমবাপ্পের প্রতিক্রিয়া, ‘আজ (গতকাল রাতে) এই পরিস্থিতিতে পড়াটা আমাদের প্রাপ্য ছিল।’

এমন দুর্দান্ত জয়ের পর বেনফিকা কোচ জোসে মরিনিও বলেছেন, ‘এটা সত্যি সত্যিই প্রাপ্য ছিল...রিয়াল মাদ্রিদকে হারানো বেনফিকার জন্য অবিশ্বাস্য সম্মানের বিষয়।’

মরিনিওর সামনে কী ছিল, সেটা তিনি জানতেন। শেষ ষোলোয় উঠতে প্লে–অফে খেলার আশা টিকিয়ে রাখতে জিততে হবে। রিয়াল জিতলে কিংবা ড্র করলেই সরাসরি উঠবে শেষ ষোলোয়। এমন সমীকরণের ম্যাচে লেখা হলো ৬ গোলের থ্রিলার, যেখানে দ্বিতীয়ার্ধে যোগ করা সময়ে রাউল আসেনসিও ও রদ্রিগোর লাল কার্ড দেখা, বেনফিকার ৩-১ গোলে এগিয়ে যাওয়া এবং এমবাপ্পের জোড়া গোল ছাপিয়ে আলোচনায় বেনফিকার গোলকিপার আনাতোলি ট্রাবিন। ম্যাচটা দেখে থাকলে কারণ আপনার জানা। ফুটবল ম্যাচে গোলকিপাররা তো আর প্রতিদিন গোল করেন না!

দ্বিতীয়ার্ধ যোগ করা সময়ের ৮ মিনিটে ট্রাবিনের সে গোলের আগেই অবশ্য ৩-২ ব্যবধানে এগিয়ে ছিল পর্তুগিজ ক্লাবটি। একদম শেষ মুহূর্তে মরিনিওই হাতের ইশারায় ট্রাবিনকে রিয়ালের বক্সে ঢুকতে বলেন। ফ্রি কিক থেকে ট্রাবিনের বুলেটের গতিতে করা হেড রিয়ালের জাল ছুঁতেই দা লুজ স্টেডিয়ামের গ্যালারিতে সে কী উল্লাস!

মরিনিওর চোখে জয়ের হাসি
এএফপি

মরিনিও যে বলেছেন এই জয়টি ‘ঐতিহাসিক’—সেই কথাতেও ভুল নেই। ১৯৬২ ইউরোপিয়ান কাপের ফাইনালে রিয়ালের বিপক্ষে জিতেছিল ইউসোবিওর বেনফিকা। ’৬৫ কোয়ার্টার ফাইনালে সেই ইউসোবিওর বেনফিকাই হেরেছিল রিয়ালের কাছে। তারপর এই জয়ের ধাক্কায় ওলট-পালট হলো হিসাবের খাতাও—এই ম্যাচের আগে রিয়াল ছিল পয়েন্ট তালিকার তিনে। ড্র করলেই শীর্ষ আট দলের একটি হিসেবে উঠত শেষ ষোলোয়। কিন্তু হারে ছিটকে পড়ল শীর্ষ আটের বাইরে। এখন প্লে–অফ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে উঠতে হবে শেষ ষোলোয়, যেখানে তাদের আবারও বেনফিকার মুখোমুখি হওয়ার সম্ভাবনা আছে। আর বেনফিকা?

লিগ পর্বে প্রথম চার ম্যাচ হারের পরও মরিনিও বুঝিয়ে দিলেন এভাবেও ঘুরে দাঁড়ানো যায়, সেটাও তাঁর সাবেক ক্লাবের বিপক্ষে যেখানকার ডাগআউটে দাঁড়িয়ে ছিলেন এমন একজন, যাঁকে মরিনিও সন্তানের মতো ভালোবাসেন—রিয়ালের কোচ আলভারো আরবেলোয়া। ফুটবল সত্যিই নির্মম, আর মরিনিওর মতো কোচের কারণে সেটা কারও কারও কাছে আসলে ভয়ংকর সুন্দর!

আরও পড়ুন

ট্রাবিন হতে পারেন গতকাল রাতে সেই সৌন্দর্যের শীর্ষবিন্দু। বেনফিকার এক্স হ্যান্ডলে ঠিক এ কারণেই একটি ছবি শোভা পাচ্ছে। ট্রাবিন সতীর্থদের কাঁধে চড়ে উল্লাস করছেন—এমন একটি ছবি পোস্ট করে ক্যাপশনে লেখা হয়েছে, ‘(ছবিটি) ল্যুভরে ঝুলিয়ে রাখুন।’

কারণ? চ্যাম্পিয়নস লিগের ইতিহাসে গোলকিপারের গোল করার দৃশ্য খুব বেশি দেখা যায়নি। হ্যান্স-জর্জ বাট (২০০০, ২০০২, ২০০৯), সিনান বোলাত (২০০৯), ভিনসেন্ট এনেয়েমা (২০১০) ও ইভান প্রোভেদেলের (২০২৩) পর পঞ্চম গোলকিপার হিসেবে গোল করলেন ট্রাবিন। হেডে গোল করা বিবেচনায় নিলে বোলাত ও প্রোভেদেলের পর ট্রাবিন এই তালিকায় তৃতীয়।

মরিনিও যেহেতু রিয়ালের সাবেক কোচ, তাই খুব ভালোভাবেই জানতেন চ্যাম্পিয়নস লিগে এই দলের বিপক্ষে ৩-২ গোলে এগিয়ে থেকে এবং সেটা যদি ম্যাচের শেষ মুহূর্তও হয়, তবু স্বস্তি পাওয়ার উপায় নেই। কীভাবে ঘুরে দাঁড়াতে হয় সেটা ১৫বারের চ্যাম্পিয়নরা খুব ভালোভাবেই জানে। সম্ভবত এ কারণেই একদম শেষ মুহূর্তে ফ্রি কিক পাওয়ায় মরিনিও ট্রাবিনকে রিয়ালের বক্সে ঢোকার নির্দেশ দেন।

ফলটা পাওয়ার পর ম্যাচ শেষে মরিনিও বলেছেন, ‘আমি জানতাম ৩-২ গোলে এগিয়ে থাকাতে সব নিশ্চিত হয়ে যায়নি। আমরা ভাগ্যবান যে তখন সেটপিস পেয়েছি। আমাদের গোলকিপার ট্রাবিন দুই মিটার লম্বা, সে বক্সে ঢুকে গোল করেছে। অবিশ্বাস্য। মনে হচ্ছিল গোটা স্টেডিয়াম ভেঙে পড়বে!’

আরও পড়ুন

পয়েন্ট তালিকায় নয়ে নেমে যাওয়া রিয়ালকে প্লে–অফে বোডো/গ্লিমট অথবা বেনফিকার মুখোমুখি হতে হবে আগামী ফেব্রুয়ারিতে। নতুন কোচ আরবেলোয়ার অধীন সর্বশেষ তিন ম্যাচ জেতার পর লিসবনে বেনফিকা তাদের বাস্তবতা দেখিয়ে দেওয়ার পর সেটাই মুখ ফুটে বলেছেন রিয়াল ফরোয়ার্ড এমবাপ্পে, ‘সমস্যা হলো আমরা নিজেদের খেলায় ধারাবাহিক নই। এটা ঠিক করতে হবে। একদিন ভালো খেলে আরেকটি খারাপ খেলতে পারেন না—চ্যাম্পিয়ন দল এটা করে না।’

বিফলে গেল জোড়া গোল। হতাশায় মাটি চাপড়ালেন এমবাপ্পে। লিসবনে গতকাল রাতে ম্যাচ শেষে
এএফপি

এমবাপ্পের হতাশার শেষ নয় এখানেই, ‘আজ এই পরিস্থিতিতে পড়াটা আমাদের প্রাপ্য ছিল। বেনফিকা আমাদের চেয়ে ভালো খেলেছে। এখন প্লে–অফে আমাদের দুটি ম্যাচ খেলতে হবে। এগুলো খেলতে কষ্ট লাগে, কারণ আমরা চেয়েছিলাম, ফেব্রুয়ারিতে নিজেদের খেলা নিয়ে কাজ করব।’ রিয়াল কোচ আরবেলোয়া বলেছেন, ‘অবশ্যই আমরা সুখী নই। ম্যাচে কী করতে হবে আমরা জানতাম, কিন্তু সে অনুযায়ী খেলতে পারিনি...নিজেদের খেলাটা থেকে আমরা অনেক দূরে ছিলাম।’

শুক্রবারের ড্রয়ে জানা যাবে প্লে–অফে বেনফিকা রিয়াল নাকি ইন্টার মিলানের মুখোমুখি হবে। ইন্টারের কোচ হিসেবে ২০১০ সালে চ্যাম্পিয়নস লিগ জয়ের স্মৃতি আছে মরিনিওর। এ নিয়ে পর্তুগিজ বলেছেন, ‘আমি এটা নয় ওটা পছন্দ করি, তা বলতে পারব না। কারণ, মাদ্রিদে যেতে ভালো লাগবে; ওখানে অনেক দিন যাই না। মিলানে যেতেও ভালো লাগবে, কারণ ওখানেও অনেক দিন যাই না।’