২০১৮ বিশ্বকাপ
এমবাপ্পের উত্থানের মঞ্চে মেসিকে ঘিরে বিচ্ছেদ আর পদক প্রত্যাখ্যান
১৯৩০ সালে মন্টেভিডিওর সেই ধূসর বিকেলে বিশ্বকাপ নামে যে মহাযাত্রার শুরু হয়েছিল, তা আজ শতবর্ষের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে। এই যাত্রার কোথাও পেলে-গারিঞ্চার সাম্বার ছন্দ, কোথাও ম্যারাডোনার ঈশ্বরপ্রদত্ত জাদুকরি ছোঁয়া, আবার কোথাও জিনেদিন জিদান কিংবা লিওনেল মেসির অমরত্বের পথে হেঁটে যাওয়া—সব মিলিয়েই তো এই ফুটবল-পুরাণ। ইতিহাসের ধুলো ঝেড়ে বিশ্বকাপের সব রোমাঞ্চকর স্মৃতি ফেরানোর আয়োজন—ফিরে দেখা বিশ্বকাপ।
বিশ্বকাপ এর আগে মাত্র একবার যৌথভাবে দুটি দেশে অনুষ্ঠিত হয়েছিল (২০০২ সালে দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপান)। কিন্তু এর আগে কখনোই একটি আসর দুটি মহাদেশজুড়ে হয়নি। ২০১৮ সালে তা-ই হয়েছে রাশিয়া আয়োজক হওয়ার মাধ্যমে। ইউরোপের একটি বিশাল অংশ এবং এশিয়ার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ জুড়ে বিস্তৃত এই দেশে বিশ্বকাপ হয়েছিল মোট ১২টি স্টেডিয়ামে (১১টি ইউরোপীয়, ১টি এশীয়)।
এই বিশ্বকাপে ফুটবলের নতুন তারকা হিসেবে আবির্ভূত হন কিলিয়ান এমবাপ্পে, তাঁর দল ফ্রান্স জেতে নিজেদের দ্বিতীয় বিশ্বকাপ। আর দুটি বিশ্বকাপের সঙ্গেই জড়িয়ে থাকা দিদিয়ের দেশম নাম লেখান খেলোয়াড় ও কোচ হিসেবে শিরোপাজয়ের ছোট তালিকায় (এই কীর্তি আর আছে ব্রাজিলের মারিও জাগালো ও জার্মানির ফ্রাঞ্জ বেকেনবাওয়ারের)। এই আসরে ফাইনাল খেলার মধ্য দিয়ে বড় শক্তি হিসেবে জানান দেয় ক্রোয়েশিয়াও।
প্রযুক্তির আগমন
এ আসরেই প্রথমবারের মতো বহুল আলোচিত ও বিতর্কিত ভিএআর (ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি) প্রযুক্তি ব্যবহার শুরু করা হয়। এর প্রথম প্রয়োগ দেখা যায় ১৬ জুন ফ্রান্স-অস্ট্রেলিয়া ম্যাচে। রেফারি আন্দ্রেস কুনিয়া ভিডিও দেখে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে পেনাল্টি দেন, যা থেকে গোল করেন অঁতোয়ান গ্রিজমান। এটিই ছিল বিশ্বকাপ ইতিহাসে ভিএআরের সহায়তায় দেওয়া প্রথম পেনাল্টি।
ভিএআর চালুর প্রভাবও ছিল স্পষ্ট। পুরো টুর্নামেন্টে রেকর্ড ২৯টি পেনাল্টি হয়, যা আগের রেকর্ডের চেয়ে ১১টি বেশি।
‘ফেয়ার প্লে’র শক্তি
জাপান বিশ্বকাপ ইতিহাসে প্রথম দল হিসেবে ‘ফেয়ার প্লে’ টাইব্রেকারে নকআউট পর্বে ওঠে। ‘এইচ’ গ্রুপে জাপান ও সেনেগালের পয়েন্ট, গোলসংখ্যা, গোল ব্যবধান এবং নিজেদের ম্যাচের ফল—সবই সমান ছিল। শেষ পর্যন্ত দুটি কম হলুদ কার্ড পাওয়ায় জাপান দ্বিতীয় পর্বে জায়গা করে নেয়।
অলৌকিক গোল এবং এক কৌতূহলী দিদিমা
একটি বিতর্কিত ‘অলৌকিক গোল’ এবং এক দিদিমার অদ্ভুত কাণ্ড মিলে পানামার ইতিহাসের প্রথম বিশ্বকাপ-যাত্রার গল্প রীতিমতো কিংবদন্তিতে পরিণত হয়।
কনক্যাকাফ বাছাইপর্বের শেষ ম্যাচে কোস্টারিকার বিপক্ষে ১-০ গোলে পিছিয়ে ছিল পানামা। ম্যাচের ৫৩ মিনিটে কর্নার থেকে তৈরি হওয়া এক আক্রমণে বলটি গোললাইন পেরোয়নি, বরং কোস্টারিকার ডিফেন্ডার রোনাল্ড মাতারিতা লাইন থেকেই তা ফিরিয়ে দেন। কিন্তু লাইন্সম্যানের ইশারায় বিভ্রান্ত হয়ে গুয়াতেমালার রেফারি ওয়াল্টার লোপেজ গোলের সিদ্ধান্ত দেন। পরে রিপ্লেতে দেখা যায়, এটি আসলে কোনো গোলই ছিল না।
তবে সেই বিতর্কিত গোলও পানামার জন্য যথেষ্ট ছিল না। একই সময়ে ত্রিনিদাদ ও টোবাগোর কাছে যুক্তরাষ্ট্র হেরে গেলেও বিশ্বকাপে জায়গা নিশ্চিত করতে পানামার দরকার ছিল জয়। অবশেষে ৮৮ মিনিটে রোমান তোরেসের জোরালো শটে আসে কাঙ্ক্ষিত গোল। আর তাতেই প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের টিকিট নিশ্চিত হয় দেশটির।
কিন্তু নাটক তখনো শেষ হয়নি। অতিরিক্ত সময়ে পানামা সিটির রোমেল ফার্নান্দেজ স্টেডিয়ামে হাজির হন আরেক চরিত্র। নাম এলিদা দে মিচেল, যিনি প্রতিবেশীদের কাছে ‘লা ফুলা’ নামে পরিচিত ছিলেন। তিনি নিরাপত্তাবেষ্টনী পেরিয়ে মাঠে ঢুকে পড়েন এবং ম্যাচের গতি থামিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেন।
পুলিশ তাঁকে সরাতে এলে তিনি ঘোষণা করেন, ‘আমাকে মাঠ থেকে বের করে দিলে আমরা বিশ্বকাপে যেতে পারব না!’ এরপর তিনি মাঠেই অজ্ঞান হওয়ার ভান করেন। দর্শকেরা উল্লাসে ফেটে পড়েন আর পরিস্থিতি কিছুটা বিশৃঙ্খল হয়ে ওঠে।
শেষ পর্যন্ত কোস্টারিকার খেলোয়াড়দেরও ফলাফল নিয়ে বিশেষ মাথাব্যথা না থাকায় রেফারি ম্যাচের শেষ বাঁশি বাজান। আর সেই বাঁশির সঙ্গে সঙ্গেই নিশ্চিত হয় পানামার ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে স্মরণীয় অর্জন—প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপে খেলার সুযোগ।
বিশ্বাসঘাতকতা এবং শাস্তি
বিশ্বকাপ শুরুর ঠিক আগে স্পেন জাতীয় দলের কোচ হুলেন লোপেতেগির ভবিষ্যৎ নিরাপদ বলেই মনে হচ্ছিল। তিনি ২০২০ সাল পর্যন্ত জাতীয় দলের সঙ্গে চুক্তিও নবায়ন করেন; কিন্তু বিশ্বকাপের সবচেয়ে আলোচিত নাটকগুলোর একটি তখনো বাকি।
পর্তুগালের বিপক্ষে স্পেনের বিশ্বকাপ অভিষেকের ঠিক দুই দিন আগে রয়্যাল স্প্যানিশ ফেডারেশনের সভাপতি লুইস রুবিয়ালেস লোপেতেগিকে বরখাস্তের ঘোষণা দেন। এই অদ্ভুত ঘটনার কারণ ছিল, স্পেন দল রাশিয়ায় রওনা হওয়ার মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে রিয়াল মাদ্রিদ ঘোষণা করে, বিশ্বকাপ শেষ হওয়ার পর লোপেতেগি তাদের কোচের দায়িত্ব নেবেন।
বিশ্বকাপের মতো গুরুত্বপূর্ণ সময়ে কোচ অন্যত্র চলে যাওয়ার আলোচনা চালিয়েছেন—বিষয়টি মানতে পারেননি রুবিয়ালেস। দল নিয়ে বিশ্বকাপে গেলেও রাশিয়ার ক্রাসনোদার শহর থেকে ফিরে যেতে হয় লোপেতেগিকে।
স্পেন বিশ্বকাপে ভালো করতে পারেনি। দ্বিতীয় রাউন্ডে স্বাগতিক রাশিয়ার কাছে টাইব্রেকারে হেরে বিদায় নেয়। অন্যদিকে লোপেতেগির রিয়াল মাদ্রিদ অধ্যায়ও সুখকর হয়নি। দায়িত্ব নেওয়ার মাত্র চার মাসের মধ্যে তিনি চাকরি হারান। তাঁর অধীনে রিয়াল টানা ৪৮১ মিনিট গোল করতে পারেনি, ১৬ ম্যাচে হেরে যায় ৬টিতে। শেষ আঘাত আসে লিওনেল মেসিবিহীন বার্সেলোনার কাছে ৫-১ গোলে বিধ্বস্ত হলে। বিশ্বকাপের আগে জাতীয় দল থেকে বিতর্কিত বিদায় এবং কয়েক মাস পর রিয়াল মাদ্রিদ থেকে বরখাস্ত হওয়া—২০১৮ সাল লোপেতেগির জন্য শেষ পর্যন্ত এক কঠিন শিক্ষা হয়ে দাঁড়ায়।
বিতর্কিত পুরস্কার
উরুগুয়ের কাছে ১-০ গোলে হারলেও মিসরের গোলকিপার মোহাম্মদ এল-শেনাউই ম্যাচসেরা হন। কিন্তু পুরস্কার তুলে দেওয়ার সময় তিনি সেটি নিতে অস্বীকৃতি জানান। কারণ, ম্যাচসেরার পুরস্কারের স্পনসর ছিল আমেরিকান বিয়ার কোম্পানি বাডওয়াইজার। ধর্মীয় বিশ্বাসের কারণে এল-শেনাউই বিয়ার কোম্পানির নামযুক্ত ট্রফি হাতে ছবি তুলতে চাননি। তাই তিনি বিনয়ের সঙ্গে পুরস্কারটি প্রত্যাখ্যান করেন।
ঘটনাটি ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। পরে ফিফা নিয়ম পরিবর্তন করে জানায়, কোনো খেলোয়াড় চাইলে এই পুরস্কার গ্রহণ না-ও করতে পারেন। এরপর মরক্কোর আমিন হারিত, সেনেগালের এমবায়ে নিয়াং এবং মিসরের মোহাম্মদ সালাহ ম্যাচসেরা হলে টেলিভিশন সম্প্রচারে বাডওয়াইজারের নাম সরিয়ে দেওয়া হয়।
মেসিকে ঘিরে বিবাহবিচ্ছেদ
রাশিয়া বিশ্বকাপ চলাকালে এক অদ্ভুত ব্যক্তিগত ঘটনার খবর প্রকাশ করেছিল মস্কোর সংবাদপত্র আর্গুমেন্টি ই ফাকটি। ফুটবলকে কেন্দ্র করে তর্কবিতর্কের জেরে ভেঙে যায় আর্সেন ও লুদমিলা নামের এক দম্পতির ১৪ বছরের সংসার।
আর্সেন ছিলেন লিওনেল মেসির অন্ধভক্ত। বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচে আইসল্যান্ডের বিপক্ষে মেসি পেনাল্টি মিস করলে তাঁর স্ত্রী লুদমিলা বিষয়টি নিয়ে তাঁকে খোঁচা দিতে শুরু করেন। এরপর দ্বিতীয় ম্যাচে আর্জেন্টিনা যখন ক্রোয়েশিয়ার কাছে ৩-০ গোলে হারে, তখন সেই ঠাট্টা-তামাশা আরও বেড়ে যায়।
তবে গ্রুপের শেষ ম্যাচে আর্জেন্টিনা নাইজেরিয়াকে হারিয়ে শেষ ষোলো নিশ্চিত করলে পরিস্থিতি পাল্টে যায়। এবার আর্সেনই স্ত্রীর আগের মন্তব্যগুলোর জবাব দিতে গিয়ে উত্তেজিত হয়ে পড়েন। কথার লড়াই দ্রুত তীব্র ঝগড়ায় রূপ নেয়।
শেষ পর্যন্ত আর্সেন নিজের দরকারি জিনিসপত্র গুছিয়ে বাড়ি ছেড়ে চলে যান। ঘটনাটি সেখানেই থেমে থাকেনি। পরদিন তিনি সিভিল রেজিস্ট্রি অফিসে গিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে বিবাহবিচ্ছেদের আবেদন করেন।
পদক প্রত্যাখ্যান
রাশিয়া বিশ্বকাপের অন্যতম আলোচিত ঘটনা ছিল ক্রোয়েশিয়ার স্ট্রাইকার নিকোলা কালিনিচকে ঘিরে। নাইজেরিয়ার বিপক্ষে প্রথম ম্যাচে কোচ জ্লাতকো দালিচ তাঁকে বদলি হিসেবে মাঠে নামতে বললে কালিনিচ তা প্রত্যাখ্যান করেন। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে দালিচ তাঁকে সঙ্গে সঙ্গে জাতীয় দলের ক্যাম্প থেকে বহিষ্কার করে দেশে ফেরত পাঠান।
এরপর ক্রোয়েশিয়া বাকি পুরো টুর্নামেন্ট একজন খেলোয়াড় কম নিয়েই খেলে এবং ইতিহাসে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপ ফাইনালে ওঠে। যদিও ফ্রান্সের কাছে হেরে রানার্সআপ হয়।
ফাইনালের পর কালিনিচের জন্য বরাদ্দ রৌপ্যপদক পাঠানো হলে তিনি সেটি গ্রহণ করেননি। তাঁর যুক্তি ছিল, টুর্নামেন্টে তিনি কোনো অবদান রাখেননি, তাই এই অর্জনের অংশীদার হওয়ার অধিকার তাঁর নেই। এরপর আর কখনোই তাঁকে ক্রোয়েশিয়া জাতীয় দলে ডাকা হয়নি।