শরণার্থী হিসেবে অন্য দেশে গিয়ে ফুটবলার হতে গিয়ে অনেকে হারিয়েও যান। কুয়োলও হারিয়ে যেতে পারতেন। কিন্তু প্রতিভার দ্যুতিতে অস্ট্রেলিয়ার শীর্ষ লিগ যেমন মাতিয়েছেন, তেমনি এ বছরের মে মাসে বার্সেলোনার বিপক্ষে অস্ট্রেলিয়ার অলস্টার দলের হয়েও দুর্দান্ত খেলেন। অস্ট্রেলিয়ার এ লিগের অলস্টার দল সে ম্যাচে ৩-২ গোলে হারলেও কুয়োলের খেলা নজর কেড়েছিল। সম্ভবত কোচ গ্রাহাম আর্নল্ডও ভুলতে পারেননি। নইলে কি আর গত সেপ্টেম্বরেই জাতীয় দলে ডাকেন কিংবা দেশের হয়ে মাত্র ১ ম্যাচ খেলা কুয়োলকে বিশ্বকাপ দলে বিবেচনা করেন!

গ্যারাং কুয়োলের বড় ভাই আলু কুয়োলও ফুটবলার। জার্মান ক্লাব স্টুটগার্টে খেলছেন গত বছর থেকে। তবে ছোট ভাইয়ের মতো অত প্রতিভা তাঁর নেই। নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে গত সেপ্টেম্বরে প্রীতি ম্যাচে গ্যারাংয়ের অভিষেকের সময় থেকেই তাঁকে হ্যারি কিউল, টিম কাহিলদের উত্তরসূরি ভাবা হচ্ছে। সে ম্যাচে ১৮ বছর ১০ দিন বয়সে অভিষেক ঘটিয়ে কিউলকে মনেও করিয়ে দেন গ্যারাং। ১৯৯৬ সালে হ্যারি কিউলের পর অস্ট্রেলিয়ার সর্বকনিষ্ঠ খেলোয়াড় হিসেবে অভিষেক ঘটেছিল তাঁর।

গ্যারাংয়ের পরিবার সুদানের খার্তুমে বসবাস করতেন। দেশে গৃহযুদ্ধের কারণে মিসরে পালিয়ে যান তাঁরা। ২০০৪ সালে সেখানেই জন্ম গ্যারাংয়ের। ছয় বছর বয়সে পরিবারের সঙ্গে অস্ট্রেলিয়ায় পাড়ি জমান। ফুটবলের সঙ্গে মিতালি তখন থেকেই দুই ভাইয়ের।

অস্ট্রেলিয়া জাতীয় দলের বিশ্বকাপ পারফরম্যান্সের ভিডিও দেখে সারা দিন পার করতেন দুই ভাই। আলু কুয়োলের ভাষায়, ‘আমরা প্রায় প্রতিদিন একই ভিডিও দেখতাম। ব্যাপারটা অসুস্থতার পর্যায়ে চলে গিয়েছিল।’ ভিডিও দেখে বাগানে ফুটবল অনুশীলন করতেন তাঁরা। অস্ট্রেলিয়ার আধা পেশাদার দল গুলবার্ন ভ্যালি সানে সুযোগ পাওয়ার পর মাত্র ১৫ বছর বয়সেই দলটির সিনিয়র স্কোয়াডে ঢুকে পড়েন। তাঁর সে সময়ের কোচ ক্রেগ কার্লির ভাষায়, ‘ফুটবল থেকে কেবল অবসর নিয়েছেন, এমন সিনিয়র খেলোয়াড়দের গ্যারাং স্রেফ ছিঁড়েখুঁড়ে ফেলেছে। দেখতে দুর্দান্ত লাগত।’

গত বছর মেরিনার্সের হয়ে অভিষেকের ৫ মিনিটের মাথায়ই গোল করেন গ্যারাং। মেরিনার্স কোচ নিক মন্টগোমারির চোখে ‘বিশেষ প্রতিভা’র গ্যারাং গত অস্ট্রেলিয়ান লিগে বেঞ্চ থেকে নেমে ম্যাপ্রতি গড়ে ৪৭ মিনিট পর একটি করে গোল করায় অলস্টার একাদশেও সুযোগ পেয়ে যান। বার্সার বিপক্ষে সেই ম্যাচের শেষ ৩০ মিনিটে গ্যারাংয়ের ঝলকে কেঁপেছে কাতালান ক্লাবটির রক্ষণ।

দুবার তো একাই রক্ষণ ছিঁড়েখুঁড়ে গোল করার খুব কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছিলেন। পরদিন অস্ট্রেলিয়ার সংবাদমাধ্যমে হইচই পড়ে যায় গ্যারাংকে নিয়ে। এরপর নিউক্যাসলের ক্রীড়া পরিচালক ড্যান অ্যাশওয়ার্থ ৩ লাখ পাউন্ডে গ্যারাং কুয়োলকে দলে টানেন। জানুয়ারিতে নিবন্ধিত হবেন নিউক্যাসলে। অথচ অস্ট্রেলিয়ার এ লিগে গ্যারাং কখনো একাদশের হয়েই মাঠে নামার সুযোগ পাননি!

ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ‘গার্ডিয়ান’ জানিয়েছে, গ্যারাংকে বেঞ্চ থেকে ‘ইমপ্যাক্ট’ খেলোয়াড় হিসেবে মাঠে নামাতে চান কোচ গ্রাহাম আর্নল্ড। কারণ, মাঠে নেমে ম্যাচের গতিপথ পাল্টে দেওয়ার অভ্যাস আছে তাঁর। আর্নল্ড বলেছেন, ‘সে এমন এক খেলোয়াড়, যার কোনো ভয়ডর নেই। মাঠে নেমে বিনোদন দিতে ভালোবাসে। সে শুধু নিজের খেলাটা খেললেই চলবে।’

গ্যারাং কুয়োল থাকলেও অস্ট্রেলিয়ার ২৯ বছর বয়সী মিডফিল্ডার পরীক্ষিত টমি রজিককে দলে নেওয়া হয়নি। বাদ পড়েছেন অস্ট্রেলিয়ার হয়ে ১৬ ম্যাচে ৬ গোল করা স্ট্রাইকার অ্যাডাম ট্যাগার্টও। গ্যারাং কুয়োল ছাড়াও সুদানি বংশোদ্ভূত আরও দুজন খেলোয়াড় আছেন অস্ট্রেলিয়ার বিশ্বকাপ দলে—ডিফেন্ডার টমাস ডেং ও ফরোয়ার্ড আওয়ার মাবিল। তবে দুজনেই জন্মেছেন কেনিয়ায়। কাতার বিশ্বকাপে ‘ডি’ গ্রুপে ফ্রান্স, তিউনিসিয়া ও ডেনমার্কের মুখোমুখি হবে অস্ট্রেলিয়া। ২০ নভেম্বর থেকে শুরু হবে কাতার বিশ্বকাপ

অস্ট্রেলিয়ার বিশ্বকাপ দল

গোলকিপার: ম্যাথু রায়ান, অ্যান্ড্রু রেডমেইন, ড্যানি ভুকোভিচ।

ডিফেন্ডার: আজিজ বেহিচ, মিলোস ডেগেনেক, টমাস ডেং, জোয়েল কিং, নাথানিয়েল অ্যাটকিনসন, ফ্রাঙ্ক কারাচিচ, হ্যারি সুটার, কাই রোলেস ও ক্রেগ গুডউইন।

মিডফিল্ডার: অ্যারন মুয়ি, জ্যাকসন আরভিন, আইদিন রাস্টিচ, বেইলি রাইট, ক্যামেরন ডেভলিন, রাইলি ম্যাকগ্রি, কিয়ানু বাক্কাস।

ফরোয়ার্ড: আওয়ার মাবিল, ম্যাথু লেকি, মার্টিন বয়েল, জেমি ম্যাকলারেন, জেসন কামিংস, মিচেল ডিউক ও গ্যারাং কুয়োল।